অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে ঢাকা ওয়াসা নাগরিক ভোগান্তির সমার্থক হয়ে উঠলেও বিগত কোনো সরকারই সংস্থাটির সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নেয়নি। প্রায় দুই কোটি মানুষের নগরে পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতা নিরসনের মতো জরুরি সেবা প্রদানের সঙ্গে যুক্ত ওয়াসার বিরুদ্ধে নাগরিকদের অভিযোগ ও অসন্তোষের শেষ নেই।
বিগত সময়ে আমরা ওয়াসার শীর্ষ কর্মকর্তা, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও একশ্রেণির ব্যবসায়ীকে নিয়ে একটি গোষ্ঠীতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেতে দেখেছি। ফলে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য ও দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতায় প্রাধান্য পেয়ে আসছে। এ কারণেই আমরা দেখেছি ঢাকা ওয়াসার এমডিসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠলে জবাবদিহির বদলে উল্টো তাঁদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান হয়ে উঠেছিলেন অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার প্রতীক।
ওয়াসার বর্তমান এমডি আবদুস সালাম ব্যাপারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং তাঁর নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকার পরও অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তাঁকে তড়িঘড়ি করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, কানাডার ‘বেগম পাড়ায়’ ওয়াসার এমডির স্ত্রীর নামে বাড়ি রয়েছে। ২০১৮ সালে কেনা বাড়িটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। একজন সরকারি চাকরিজীবীর স্ত্রীর এই বিপুল সম্পদের উৎস কী, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক। ওয়াসার এমডি জানিয়েছেন, কানাডার বাড়ি তাঁর সন্তানেরা কিনেছেন।
সরকারি চাকরিজীবীদের আচরণবিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে, বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মতো সম্পদ অর্জন করতে হলে তা সরকারকে আগে জানিয়ে অনুমোদন নিতে হবে। এমনকি সরকারি চাকরিজীবীর সন্তানেরা যদি বাবার নামে সম্পদ কেনেন, সেটাও আগে জানাতে হয় এবং অর্থের উৎস উল্লেখ করতে হয়।
ওয়াসার এমডি এ–সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেননি; বরং প্রথম আলোর অনলাইনে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওয়াসা থেকে পাঠানো বিবৃতিতে কানাডায় বাড়ির তথ্য ও ছবি বানোয়াট বলে দাবি করেছেন। কানাডার অন্টারিও রাজ্যের সরকারি ওয়েবসাইটে যেখানে বাড়ির মালিকানা ও মালিকানা হস্তান্তরের তথ্যগুলো দেওয়া আছে, সেখানে এই দাবি কতটা যৌক্তিক হতে পারে।
প্রকৌশলী আবদুস সালাম বিগত বছরগুলোতে ওয়াসার তিনটি বড় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসব প্রকল্পে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ কারণে তাঁকে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে সংযুক্ত রাখা হয়।
এমন একজন ব্যক্তিকে ওয়াসার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার এমডি হিসেবে কোন যুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেটা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, গত বছরের নভেম্বর মাসে তাঁকে নিয়োগ দেওয়ার সময় একাধিকবার সংশোধন করা হয়েছিল বিজ্ঞপ্তির শর্ত। নিয়োগের যোগ্য করতে তাঁকে পদোন্নতিও দেওয়া হয়।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান যথার্থই বলেছেন, ওয়াসার এমডির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগে সুনির্দিষ্ট তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। আমরা মনে করি, ওয়াসায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই এমডিকে জবাবদিহির মধ্যে আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁর নিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, তারও তদন্ত হওয়া উচিত।
গোষ্ঠীগত স্বার্থ থেকে বের করে এনে ঢাকা ওয়াসাকে অবশ্যই নাগরিক সেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্য নয়; বরং যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততাই একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত।