মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক
মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক

বিশেষ সাক্ষাৎকার: মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক

চরম বৈষম্য আর কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি অস্থিরতা তৈরি করতে বাধ্য

ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান। সম্প্রতি ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, উন্নয়ন ও জননীতি নিয়ে প্রথম আলো তাঁর সঙ্গে কথা বলেছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সহুল আহমদ।

প্রশ্ন

সরকার ক্ষমতায় আসার প্রায় সাত মাস পর দেশের অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল বলে মনে হচ্ছে?

মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক: অর্থনীতির কিছু জায়গায় উন্নতি হয়েছে, তবে স্থিতিশীলতার ভিত্তি এখনো দুর্বল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, বিনিময় হার তুলনামূলক স্থির হয়েছে এবং রেমিট্যান্স-প্রবাহ বহিস্থ খাতের প্রবাহের চাপ সামলাতে সহায়তা করছে। এসব ইতিবাচক পরিবর্তনের স্বীকৃতিও পাওয়া যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরে মুডিস বাংলাদেশের ঋণমানের আউটলুক ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করেছে। অর্থাৎ কিছু ঝুঁকি কমেছে, কিন্তু অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো রয়ে গেছে।

দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সঞ্চয় কমেছে। দুর্বল রয়ে গেছে বিনিয়োগ পরিস্থিতিও। এডিবি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করেছে। ব্যাংক খাতের চাপ ও জ্বালানির সংকট অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বড় বাধা হিসেবে থাকছে।

সামগ্রিক সঞ্চয়ের পরিসংখ্যানেও উদ্বেগ ধরা পড়ে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে দেশজ সঞ্চয় জিডিপির প্রায় ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে, আর জাতীয় সঞ্চয় প্রায় ৩০ শতাংশ থেকে ২৬ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে আয় ব্যয়ের সঙ্গে তাল রাখতে না পারলে পরিবারগুলোর পক্ষে সঞ্চয় ধরে রাখাও কঠিন হয়।

সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাবেও চাপ রয়েছে। রাজস্ব আহরণ ব্যয়ের প্রয়োজন মেটাতে পারছে না বলে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অক্টোবর-ডিসেম্বরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যাংকে পর্যাপ্ত তারল্য ও বেসরকারি ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকলে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত হতে পারে। কিন্তু এই নির্ভরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে সুদ ব্যয় বাড়বে, প্রয়োজনীয় জনসেবায় ব্যয়ের সুযোগ কমবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ফিরতে শুরু করলে তার অর্থায়নেও চাপ পড়তে পারে।

অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির বাড়তি দাম এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা আমদানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে স্থিতিশীলতা ফেরানোর কাজ কঠিন করেছে।

ছয় মাসে দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তবে সংস্কারের দিকনির্দেশনা ও বাস্তব অগ্রগতি এই সময়েও মূল্যায়ন করা যায়। বিশেষ করে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশের পাশাপাশি ঋণ আদায়, মূলধন ঘাটতি মোকাবিলা ও দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠনে অগ্রগতি প্রয়োজন। কঠোর যাচাইয়ে আগে আড়ালে থাকা খেলাপি ঋণ বেরিয়ে আসা সংস্কারেরই অংশ; এরপর সেগুলোর নিষ্পত্তি কতটা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আমার মূল্যায়ন হলো, কিছু কিছুটা উন্নতি হয়েছে; সেটিকে টেকসই স্থিতিশীলতায় রূপ দিতে এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ এবং ব্যাংক সংস্কারে দৃশ্যমান ফল প্রয়োজন।

প্রশ্ন

এই যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাণিজ্যনীতির কী রকম প্রভাব পড়ছে?

আব্দুর রাজ্জাক: ইরান যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের যে পরিমাণ দাম বেড়েছে এবং জ্বালানির বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেটা কিন্তু আমাদের যে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস বা প্রচেষ্টা, সেটাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জ্বালানি তেলের যে মূল্য অ্যাডজাস্ট করা হয়েছে, এর একটা কশাঘাত সাধারণ মূল্যস্ফীতির ওপর পড়বে।

আমরা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইলেও বিশ্ববাজারের বর্তমান পরিস্থিতি এবং দেশের বিদ্যমান সংকট সার্বিক পরিবেশ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শীতকালে দেশে জ্বালানির চাহিদা গরমের তুলনায় কম হলেও ইউরোপের বাড়তি চাহিদার কারণে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশকে প্রধান ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।

যুদ্ধ ও মার্কিন বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দুই দিক থেকে চাপে ফেলছে। একদিকে আমদানি ও উৎপাদনের ব্যয় বাড়ছে; অন্যদিকে রপ্তানি আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির নিরন্তর পরিবর্তন ও তার উদ্বেগজনক গতিধারা বাংলাদেশকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ট্রাম্পের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল নীতি সারা বিশ্বে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে এবং এটা ব্যবসা ও রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর।

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হচ্ছে। কোভিড-পরবর্তী অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমলে পোশাক কেনার ব্যয় সংকুচিত হয়, যার প্রভাব পড়ে তৈরি পোশাকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। প্রধান দুটি বাজারের আমদানির চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১০২ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছিল, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে মাত্র ১০৪ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি ১০০ বিলিয়ন থেকে কমে ৮৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ একটি বাজারে আমদানি প্রায় স্থবির, অন্যটিতে সংকুচিত হয়েছে। বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ তৈরি পোশাকনির্ভর হওয়ায় এই পরিস্থিতিতে রপ্তানি আয় বাড়ানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঘন ঘন বাণিজ্যনীতি পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা। দেশের ভেতরেও গ্যাস-বিদ্যুতের অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত সরবরাহ এবং দীর্ঘদিনের অবকাঠামো ও পরিবহনসংক্রান্ত সমস্যা উৎপাদন ও সময়মতো পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা ব্যাহত করছে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়ানো জরুরি হলেও বৈদেশিক চাহিদার দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা একসঙ্গে সেই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তিতে মার্কিন পণ্য কেনা বাড়ানোর অঙ্গীকারও রয়েছে। নির্দিষ্ট উৎস থেকে কেনার এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রতিযোগিতামূলক দাম নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় সাশ্রয়ী সরবরাহকারী বেছে নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। বাইরের এসব চাপের মধ্যেও দেশের উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা ধরে রাখা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ।

প্রশ্ন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিটিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

আব্দুর রাজ্জাক: প্রথমত, চুক্তিটির প্রক্রিয়া ছিল অস্বচ্ছ। সাধারণত এ ধরনের আলোচনায় গোপনীয়তার শর্ত থাকে বলে সব তথ্য প্রকাশ্যে আনা যায় না। তবে সে ক্ষেত্রেও নেগোসিয়েশন টিমে বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করার একটি চর্চা রয়েছে, যাতে তাঁরা দর-কষাকষির প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন। সরকার এই চুক্তির ক্ষেত্রে সেই উদ্যোগও নেয়নি।

দ্বিতীয়ত, আমরা এখানে একটি অসম দর-কষাকষি দেখছি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করার সময় যদি তা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তবে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সীমিত পরিসরে হলেও পরামর্শ করা আবশ্যক ছিল, যাতে তাঁদের উদ্বেগের জায়গাগুলো বোঝা যেত। দুর্ভাগ্যবশত তা করা হয়নি; করা হলে দর-কষাকষির মান আরও অনেক উন্নত ও কার্যকর হতে পারত।

এটা ঠিক যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার হারানোর ভয়ে বেসরকারি খাত থেকেও দ্রুত চুক্তি করার একটি চাপ ছিল। ভূরাজনৈতিক সংকটের এমন সময়ে বেসরকারি খাত সব সময়ই বাজারসুবিধা বাড়ানোর কথা ভাববে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে—এমন সঠিক কৌশল নির্ধারণ করা সরকারের দায়িত্ব ছিল। তৎকালীন সরকার বিষয়টির গুরুত্ব যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারেনি।

প্রশ্ন

বিদেশে কর্মী যাওয়া কমে যাচ্ছে বলে সংবাদ এসেছে, এর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?

আব্দুর রাজ্জাক: বিদেশে কর্মী যাওয়া কমে গেলে রেমিট্যান্সে তাৎক্ষণিক ধাক্কা টের পাওয়া যাবে না। দুই বছর পর হয়তো এর প্রভাব বোঝা যাবে। তবে এই মুহূর্তে রেমিট্যান্সে কতটা ধাক্কা আসবে, তা নির্ভর করবে প্রবাসীদের কর্মঘণ্টা কিংবা আয় কমে যাচ্ছে কি না বা তাঁদের চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না, তার ওপর।

দেশে রেমিট্যান্সের ওপর ভিত্তি করেই বহু পরিবার দৈনন্দিন খরচ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে নানা বিনিয়োগ চালিয়ে থাকে, যা গ্রাম ও মফস্‌সল এলাকার অর্থনীতিকে সক্রিয় (মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট) রাখে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জাতীয় সঞ্চয়ের হার এমনিতেই ৩ শতাংশের বেশি কমেছে; এই পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্সের প্রবাহ আরও কমলে সঞ্চয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটা সামগ্রিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলবে।

মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক
প্রশ্ন

সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ নানা ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রভাব ও সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?

আব্দুর রাজ্জাক: বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে এই সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীকে আরও প্রসারিত ও শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমেছে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০২২ সালের খানা জরিপ অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ। তবে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং তার তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় দারিদ্র্য বৃদ্ধির স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। এ ধরনের বাস্তবতায় সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী খাতকে বিস্তৃত করার কোনো বিকল্প নেই।

দ্বিতীয়ত, গত এক দশকে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল বাস্তবায়নের মূল লক্ষ্য দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানো হলেও প্রকৃত দরিদ্র, অতিদরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ বহু পরিবার এখনো এই সহায়তার বাইরেই রয়ে গেছে। বিবিএসের খানা জরিপ অনুযায়ী, দেশের হতদরিদ্র মানুষের প্রায় ৪৮ শতাংশই কোনো সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পায় না। অন্যদিকে এসব সুবিধার মাত্র ২০ শতাংশ পৌঁছায় প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে; বাকি ৮০ শতাংশ সুবিধাভোগীই দারিদ্র্যসীমার ওপরে।

এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে: সঠিক দরিদ্র জনগোষ্ঠী শনাক্ত করতে না পারা (টার্গেটিং এরর), অনিয়ম-দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব। এ ছাড়া সর্বজনীন ভাতা (যেমন বয়স্ক ভাতা বা উপবৃত্তি) দিতে গিয়ে প্রকৃত দরিদ্রদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে।

বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশক থেকে দারিদ্র্য বিমোচনের মূল কৌশল ছিল ‘ট্রিকেল ডাউন ইফেক্ট’। অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলে তার সুফল চুইয়ে চুইয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছাবে; কিন্তু গুণগত ও টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পারায় গত ১০-১৫ বছরে এটা আর যথেষ্ট কার্যকরভাবে কাজ করছে না। অন্যদিকে ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, এর গ্রহীতাদের মাত্র ২৭ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে।

এই পরিস্থিতিতে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র ও দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা সবাইকে সুরক্ষা দেওয়া গেলে তা দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখবে। আমাদের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালের দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা সব পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা গেলে দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ পয়েন্ট কমে ১১ শতাংশে নেমে আসবে। এটি সম্ভাব্য প্রভাবের হিসাব, বাস্তবায়নের পর পাওয়া ফল নয়। তা ছাড়া পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি বেড়েছে বলে দারিদ্র্যের ওপর প্রভাব কম হতে পারে। তাই বর্তমান প্রয়োজন নির্ধারণে হালনাগাদ তথ্য জরুরি। তবে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো প্রকৃত উপকারভোগী সঠিক ও স্বচ্ছভাবে শনাক্ত করা এবং দুর্নীতি রোধ করা।

যদি শুধু দরিদ্র ও দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হয়, তাহলে অতিরিক্ত ব্যয় হবে জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ, যা অর্থনীতির ওপর তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। আসল সংকট তৈরি হবে যদি সরকার পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায় করতে না পারে। রাজস্ব না বাড়লে ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি সরকারের অন্যান্য ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটাতে আবারও অতিরিক্ত ঋণের আশ্রয় নিতে হবে, যা সুদ পরিশোধের চাপ আরও বাড়াবে।

আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যামিলি কার্ড সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা না গেলে, অর্থাৎ প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছানো না গেলে এবং তাঁদের নির্বাচনে বড় ধরনের অনিয়ম বা অসংগতি দেখা দিলে, তা ব্যাপক জন–অসন্তোষের কারণ হতে পারে।

প্রশ্ন

বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে। এর কারণ কী এবং বাড়ানোর উপায় কী?

আব্দুর রাজ্জাক: কর-জিডিপি অনুপাত না বাড়ার একটি বড় কারণ কর প্রশাসন ও আদায়ব্যবস্থার দুর্বলতা। অর্থনীতির আকার বাড়লেও আমরা সেই অনুপাতে করের আওতা বাড়াতে পারিনি। ভ্যাট আদায়েও বড় ঘাটতি রয়েছে। এনবিআর লোকবল সংকট ও আধুনিকায়নের অভাবের কথা বলে। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করার পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধ এবং কর প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের করকাঠামোতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। আমদানি করসহ পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতায় তুলনামূলক কম আয়ের মানুষের ওপর করের বোঝা বেশি পড়ে। আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ কর আদায় বাড়ানোকে তাই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

করদাতাদের আস্থার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। করদাতারা দেখতে চান সরকারের ব্যয়ে স্বচ্ছতা রয়েছে এবং দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কিন্তু যখন দেখা যায় অপচয় হচ্ছে কিংবা দীর্ঘসূত্রতায় মেগা প্রকল্পের ব্যয় অতিরিক্ত বাড়ছে, তখন করদাতারা নিরুৎসাহিত হন।

এ ছাড়া বৈষম্য কমাতে নির্দিষ্ট উচ্চ সীমার বেশি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদের ওপর কর চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জমি ও ফ্ল্যাটের প্রকৃত বাজারমূল্য গোপন করে কম মূল্য দেখানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।

প্রশ্ন

চাকরিজনিত ইস্যুকে কেন্দ্র করে একটা গণ-অভ্যুত্থানও হয়েছে, আবার জবলেস গ্রোথের কথাও বলা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও সেখানে নতুন শঙ্কা তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া যাবে?

আব্দুর রাজ্জাক: চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বৈষম্য ও অসন্তোষেরও এক বিস্ফোরণ। একটা তথ্য দেখা যেতে পারে। বিবিএসের ২০২২ সালের খানা জরিপের তথ্য অনুযায়ী, আয়ের বিচারে শীর্ষ ১০ শতাংশ পরিবারের হাতে রয়েছে মোট পারিবারিক আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ। সম্পদের বৈষম্য আরও প্রকট। আমরা দেখিয়েছি, সবচেয়ে সম্পদশালী ১ শতাংশ পরিবারের হাতে জরিপে পরিমাপ করা মোট সম্পদের ৪৭ শতাংশ পুঞ্জীভূত, আর শীর্ষ ১০ শতাংশের হাতে রয়েছে ৭৬ শতাংশ। এই হিসাবেও প্রকৃত সম্পদবৈষম্য কম প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অতি ধনী পরিবারগুলোর সম্পদ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলে বৈষম্যের চিত্র আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।

এ ধরনের চরম বৈষম্য ও ‘কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি’ সমাজে অস্থিরতা তৈরি করতে বাধ্য। এর সঙ্গে প্রযুক্তির উন্নয়ন ও যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় একই পরিমাণ উৎপাদনের জন্য আগের তুলনায় কম শ্রমিক প্রয়োজন হচ্ছে। তৈরি পোশাকশিল্পের ক্ষেত্রে আমরা এটা আগেই দেখেছি। ২০১০ সালের দিকে পোশাক রপ্তানি ছিল প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার আর প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান ছিল আনুমানিক ৩৫ লাখ। পরবর্তী সময়ে রপ্তানি প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও কর্মসংস্থান সেই অনুপাতে বাড়েনি।

ফলে প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি মোট কর্মসংস্থানও বাড়াতে হলে উৎপাদন ও বাজারের আরও বড় সম্প্রসারণ প্রয়োজন। কিন্তু বৈষম্য বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয়ের ওপর চাপের কারণে দেশীয় বাজারে চাহিদা যথেষ্ট বাড়ছে না। অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত থাকলে শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভর করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের বড় সম্প্রসারণ ঘটানো কঠিন।

তাই বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর প্রকৃত আয় বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা কাজে লাগাতে হবে। পোশাকের বাইরে বড় রপ্তানি খাত গড়ে তুলতে না পারায় সেই সুযোগ আমরা যথেষ্ট নিতে পারিনি। বৈশ্বিক বাজার প্রায় অসীম; তৈরি পোশাকের মতো আরও চার-পাঁচটি বড় রপ্তানি খাত গড়ে তোলা গেলে উৎপাদনের পরিসর অনেক বাড়ানো সম্ভব। প্রতি একক উৎপাদনে শ্রমিকের প্রয়োজন কমলেও এমন ব্যাপক সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যেতে পারে।

শিক্ষিত ও বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা তরুণদের জন্য এআই সৃজনশীল অর্থনীতি, আধুনিক সেবা খাত এবং আরও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশিল্পে নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখনো বহু খাতে উৎপাদন ও সেবার পরিসর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কাজে লাগিয়ে এসব খাত ও নতুন রপ্তানি বাজারে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটাতে পারলে কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।

পরিণত উন্নত অর্থনীতির তুলনায় বাংলাদেশের একটি সম্ভাব্য সুবিধা এখানেই। আমাদের বহু প্রয়োজন এখনো অপূর্ণ, অনেক বাজারও পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। প্রযুক্তির কারণে প্রতি একক উৎপাদনে কম শ্রমিক লাগলেও উৎপাদন ও সেবার মোট পরিসর যথেষ্ট দ্রুত বাড়লে সামগ্রিকভাবে শ্রমিকের চাহিদা বাড়তে পারে। তবে প্রথমে কর্মসংস্থান বাড়বে, পরে প্রযুক্তি মানুষকে প্রতিস্থাপন করবে, এমন নিশ্চিত ক্রম নেই। দুটি প্রক্রিয়া একই সঙ্গে চলতে পারে। আমাদের চেষ্টা হতে হবে উৎপাদন সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন কাজ সৃষ্টির গতি যেন প্রযুক্তির কারণে কাজ কমার গতিকে ছাড়িয়ে যায়।

প্রশ্ন

এলডিসি উত্তরণের প্রভাব বাংলাদেশে কেমন হতে পারে?

আব্দুর রাজ্জাক: বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করেছে। এই তিন বছর সময় পাওয়া গেলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে আরও তিন বছর শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে। তবে সমস্যা হলো বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থায় একধরনের বিশৃঙ্খলা চলছে এবং ডব্লিউটিওর নিয়মকানুনও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে এলডিসি উত্তরণের পাশাপাশি আমাদের সামনে বেশ কিছু নতুন চ্যালেঞ্জ যুক্ত হচ্ছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে একটি স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) তৈরি হয়েছিল। কিছু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তব সংস্কারে আরও দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন। তাই বাড়তি সময় পাওয়া গেলে আমাদের প্রথম কাজ হবে এই কৌশল থেকে সবচেয়ে জরুরি কয়েকটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়নে অধিকতর মনোযোগ দেওয়া।

আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ইউরোপীয় ইউনিয়নে বর্তমানের সমতুল্য বাজারসুবিধা ধরে রাখা। ইইউর নতুন জিএসপি কাঠামোর সুরক্ষামূলক বিধান এবং বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বর্তমান বাজার-অংশ বিবেচনায়, জিএসপি প্লাসের মাধ্যমে তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখার সুযোগ কার্যত থাকছে না। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই আলোচনা অত্যন্ত জটিল হবে। পণ্যের শুল্ক ছাড়াও নিয়ন্ত্রক সংস্কার, পরিবেশ, শ্রম অধিকার, বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতার বিধানসহ অনেক বিষয় আসবে। নিজেদের বাজার উন্মুক্ত করার প্রভাবও মূল্যায়ন করতে হবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া গেলেও তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে সাধারণত ‘ডাবল ট্রান্সফরমেশন’ শর্ত যুক্ত থাকে। সে ক্ষেত্রে সাধারণভাবে দেশে তৈরি কাপড় দিয়ে পোশাক উৎপাদন করতে হবে, যা বাংলাদেশের বস্ত্র খাত ও ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজের সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাই চুক্তির আলোচনায় বাংলাদেশের চেষ্টা হওয়া উচিত এই শর্ত শিথিল করে বর্তমানে আমদানি করা কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করেও শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ বজায় রাখা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে কার্যকর বাজারসুবিধা ধরে রাখতে পারলে শুধু এলডিসি উত্তরণের কারণে রপ্তানিতে সম্ভাব্য ধাক্কা অনেকটাই সীমিত রাখা সম্ভব।

অন্য কয়েকটি বাজারে ইতিবাচক অগ্রগতি রয়েছে। যুক্তরাজ্যে উত্তরণের পরও পোশাকের শুল্কমুক্ত সুবিধা ও সহজ উৎসবিধি বজায় রাখার সুযোগ আছে। জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা কার্যকর হলে বাজারসুবিধা ধরে রাখতে সহায়ক হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও চুক্তির আলোচনা নীতিগত সমঝোতায় পৌঁছেছে। আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসেপ) যোগদানের প্রস্তুতিও নিতে হবে। এসব চুক্তিতে আমরা যেসব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি বা দেব, সেগুলো বাস্তবায়নে আইন, প্রশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে।

তবে ভারতের বাজারকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। ভারত বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। বিকল্প বাণিজ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে এলডিসিভিত্তিক শুল্কমুক্ত সুবিধা হারিয়ে ভারতের বাজারে তৈরি পোশাকসহ কিছু পণ্যের ওপর শুল্কের চাপ অনেক বেড়ে যেতে পারে। এতে ওই বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই বিষয়টি নিয়ে আগাম আলোচনা প্রয়োজন।

রপ্তানি সহায়তার কৌশলও বদলাতে হবে। এলডিসি উত্তরণের পর শিল্পপণ্যে রপ্তানির শর্তে নগদ ভর্তুকি দেওয়ার বিশেষ ছাড় আর থাকবে না। এটি শুধু পোশাক খাতের বিষয় নয়; অন্যান্য শিল্পপণ্যের রপ্তানিতেও প্রযোজ্য। সরকারকে ডব্লিউটিওর বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সহায়তা সাজাতে হবে। অবকাঠামো, দক্ষতা, প্রযুক্তি, মানসনদ ও বাণিজ্যসেবা উন্নয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের উৎপাদন ও রপ্তানির খরচ কমানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

মেধাস্বত্বের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রস্তুতি দরকার ওষুধশিল্পে। এলডিসি হিসেবে ওষুধের পেটেন্টসংক্রান্ত যে বিশেষ ছাড় রয়েছে, উত্তরণের পর তা হারাতে হবে। তখন পেটেন্ট লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা বা পেটেন্ট ইনফ্রিঞ্জমেন্ট লিটিগেশন মোকাবিলার প্রয়োজন হতে পারে। এ জন্য দেশীয় প্রতিষ্ঠান, পেটেন্ট কর্তৃপক্ষ, আইনজীবী ও বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় আন্তর্জাতিক বিধানে যেসব নমনীয়তা রয়েছে, সেগুলো ব্যবহারের প্রস্তুতিও জরুরি।

এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বৃহত্তর অনিশ্চয়তা রয়েছে। একতরফা শুল্ক আরোপ এবং বহুপক্ষীয় বিরোধ নিষ্পত্তির দুর্বলতা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য নিয়মভিত্তিক সুরক্ষা কমিয়ে দিচ্ছে। অসম অর্থনৈতিক শক্তির দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বাজারসুবিধার বিনিময়ে কী দায় নিচ্ছি, তা সতর্কভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক
প্রশ্ন

ট্রাম্পের অনিশ্চিত বাণিজ্যনীতি ও বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কি অর্থনীতিতে কোনো ইতিবাচক বার্তা নিয়ে আসবে?

আব্দুর রাজ্জাক: চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে সেই সুযোগের মূল্যায়ন করতে হবে কতটা উৎপাদনশীল বিনিয়োগ আসছে, নতুন রপ্তানি সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে এবং প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান বাড়ছে, তা দিয়ে। শুধু আমদানি বা ঋণনির্ভর অবকাঠামো প্রকল্প বাড়লে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না। চীনা বিনিয়োগকে রপ্তানিমুখী শিল্প, দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উৎপাদন সংযোগ এবং দক্ষতা হস্তান্তরের দিকে নিয়ে যেতে পারলে বেশি লাভ হবে। চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর বাস্তব বাধাগুলো দূর করাও গুরুত্বপূর্ণ।

চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ—সবাই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাই একক দেশের ওপর নির্ভরতা এড়িয়ে সবার থেকে পরিপূরক সুবিধা নেওয়াই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। বৈশ্বিক শক্তিগুলোর বিরোধের মধ্যেও নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখতে হবে।

বাণিজ্যচুক্তির ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। কোনো চুক্তিতে নির্দিষ্ট উৎস থেকে পণ্য কেনার অঙ্গীকার থাকলে দেখতে হবে, তার ফলে প্রতিযোগিতামূলক দামে আমদানির সুযোগ সীমিত হচ্ছে কি না। দাম, গুণমান, পরিবহন ব্যয় ও অর্থায়নের শর্ত মিলিয়ে যে উৎস বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক, সেটি বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা দরকার। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপের সময়ে ব্যয়বহুল ক্রয়-অঙ্গীকার ভবিষ্যতের দায় আরও বাড়াতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের তীব্র ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার যুগে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পরিচালনায় বাংলাদেশকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোনো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ঘনিষ্ঠতা যেন অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে হুমকি না মনে হয়, সে বিষয়ে সচেতন থেকে এবং স্বচ্ছতা বজায় রেখে বাংলাদেশকে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থেই নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ধরে রাখতে হবে।

এ জন্য বাংলাদেশের একটি সুস্পষ্ট ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা কৌশল প্রয়োজন। বিশেষ করে বন্দর, জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ ও গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত শুধু আর্থিক প্রস্তাব দেখে নেওয়া যায় না; নিরাপত্তা, তথ্যের নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনাগত নির্ভরতা এবং প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখতে হবে। এসব ক্ষেত্রে কোন শর্তে বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ করা হবে, তার স্বচ্ছ ও ধারাবাহিক নীতিমালা থাকা জরুরি। উপযুক্ত প্রকল্পে যৌথ বা বহুপক্ষীয় বিনিয়োগ ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়ার একটি উপায় হতে পারে; তবে তা প্রকল্পের প্রয়োজন ও বাণিজ্যিক যৌক্তিকতা বিচার করেই নির্ধারণ করতে হবে।

সরকারের দরকার বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য আগাম প্রস্তুতি। এ কাজে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, ব্যবসায়ী, গবেষক ও থিঙ্কট্যাংকগুলোর জ্ঞান কাজে লাগানো প্রয়োজন।

প্রশ্ন

আপনাকে ধন্যবাদ।

আব্দুর রাজ্জাক: আপনাকেও ধন্যবাদ।