
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দায়ের করা দুটি রিটকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলেছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও আইনজীবী শিশির মনির।
তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, তাড়াহুড়ো করে দুইজন আইনজীবীর মাধ্যমে এই রিট পিটিশন দায়েরের পেছনে সরকারের ইন্ধন রয়েছে। আদালতে আইনজীবীদের মধ্যে সরকারের ইন্ধন দেখা যাচ্ছে। সরকারের কিছু ব্যক্তি এই বিষয়টাকে আদালতে ‘সাবজুডিস ম্যাটার’ বলে সংসদকে যেন কোনোভাবে বাধিত করা না যায়, সে জন্যই এই কৌশল অবলম্বন করেছেন।
সোমবার রাতে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে শিশির মনির এ কথা বলেন।
শিশির মনির বলেন, ‘আজকে (সোমবার) দুইটা রিট পিটিশন শুনানি হয়েছে। একটা রিট পিটিশনে পিটিশনাররা চেয়েছেন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এবং সাংবিধানিক সংস্কার সভা গঠন এবং সংসদ সদস্য হিসেবে সংবিধান সংস্কার সভার শপথকে কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না এই মর্মে একটি রুল চেয়েছেন এবং যত দিন পর্যন্ত রুল নিষ্পত্তি না হয়েছে, তত দিন পর্যন্ত একটা নিষেধাজ্ঞার আদেশ চেয়েছে।’
শিশির মনির বলেন, ‘আরেকটি রিট পিটিশনে গণভোট অধ্যাদেশের ধারা ৩ অর্থাৎ যেখানে প্রশ্নটা দেওয়া হয়েছে, সেই প্রশ্ন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, এই মর্মে আরেকটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। এই রিট পিটিশনে আইন মন্ত্রণালয়, সেক্রেটারিয়েট, ক্যাবিনেট ডিভিশন, সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সেক্রেটারিয়েট প্রধানমন্ত্রীর অফিস, তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে, যেন এই বিষয়সংক্রান্ত কোনো ফারদার কার্যক্রম গ্রহণ করা না হয়।’
জামায়াতের এই কর্মপরিষদ সদস্য বলেন, গণভোটের প্রশ্নকে চ্যালেঞ্জ করার কথা বলা হলেও গণভোট ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং জনগণ তাদের মতামত দিয়েছে। তাই এখন প্রশ্ন নয়, গণভোটের ফলাফলকেই চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে অসাংবিধানিক বলার পেছনে ‘তাড়াহুড়ো’ ও ‘ভিন্ন উদ্দেশ্য’ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
শিশির মনির প্রশ্ন তোলেন, আদেশটি নভেম্বর মাসে জারি হলেও ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে রিট করা হয়নি কেন। সংসদ অধিবেশন বসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলে কী সমস্যা হতো, এ প্রশ্নও রাখেন তিনি।
জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে এবং একই ব্যালটে অনুষ্ঠিত হলেও কেবল গণভোট অংশকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে—এ প্রসঙ্গ টেনে শিশির মনির বলেন, যদি গণভোট অধ্যাদেশের ধারা ৩ চ্যালেঞ্জ করা হয়, তবে জাতীয় নির্বাচনকেও চ্যালেঞ্জ করা উচিত ছিল। জাতীয় নির্বাচন ঠিক থাকবে, কিন্তু গণভোট ঠিক থাকবে না—এ ধরনের অবস্থানকে তিনি ‘ক্যালকুলেটিভ ও পলিটিক্যালি মোটিভেটেড’ আখ্যা দেন।
শিশির মনির বলেন, অতীতে আদালতকে ব্যবহার করে যেসব রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করা হয়েছে, সবগুলো ‘বুমেরাং’ হয়েছে। রাজনৈতিক দল আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে গেলেও আলোচনার ভিত্তিতেই সরতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিপ্লবের চেতনাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে আদালতের কাঁধে দায় চাপিয়ে সংসদকে পাশ কাটানোর মানসিকতা দেখা যাচ্ছে। জুলাই সনদকে অপ্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা হলে তা রাজনৈতিক ও আইনগত ভুল হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া ঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন এই আইনজীবী।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ১২ মার্চ সংসদ অধিবেশন বসবে। অধিবেশনে এসব বিষয়ে জাতীয় সংসদের সদস্যরা আলোচনা করবেন। এখন বিষয়টিকে আদালতের কাঁধে রেখে উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যাঁরা চেষ্টা করছেন, তাঁরা ঠিক কাজ করছেন না।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, অতীতে যেটি জাতীয় সংসদের বিষয় অথবা রাজনৈতিক বিষয়, আদালতের কাঁধে ভর করে এসব বিষয় যখন নিয়ে যাওয়া হয়েছে আদালতে, তখন সংকট তৈরি হয়েছে এবং জাতীয়ভাবে বিভিন্ন বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। জামায়াত আর কোনো বিপর্যয় দেখতে চায় না।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কারা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত জানতে চান সাংবাদিকেরা। জবাবে শিশির মনির বলেন, যাঁরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি, তাঁরা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত।
আরেক প্রশ্নের জবাবে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আদালতের রায় দেখেই রাজনৈতিক কর্মসূচির বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান।