‘নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক সমঝোতার পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সামিনা লুৎফা। শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে
‘নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক সমঝোতার পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সামিনা লুৎফা। শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে

সরকারের পারফরম্যান্স খুবই খারাপ: সামিনা লুৎফা

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ছাড় দেওয়ার সংস্কৃতির না থাকায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের পরিস্থিতি আরও ‘হানাহানিমূলক’ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা। ‘নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক সমঝোতার পথ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সামিনা লুৎফা বলেন, ‘এই মুহূর্তে যে সরকার আছে, সে সরকারের বেশির ভাগ কার্যপ্রণালি থেকে গত ১৩ মাসে আমাদের মনে হয়েছে, যে কথা অন্য নাগরিকেরা বলেছেন যে সরকারটি বেশ দুর্বল বা তারা দুর্বল বলে নিজেদেরকে দেখাতে চায়, এটা আমার ধারণা। এখন এই যে দুর্বল অথবা দুর্বল বলে দেখাতে চায়—এ রকম একটি সরকার, যারা আসলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জননিরাপত্তা—এগুলো নিয়ে তাদের যে পারফরম্যান্স, সেই পারফরম্যান্স যদি আমরা সামাজিক বিজ্ঞানের ইন্ডিকেটর (সূচক) দিয়ে মাপতে যাই, তাহলে দেখব, পারফরম্যান্স খুবই খারাপ।’

এই অধ্যাপক আরও বলেন, এ রকম খারাপ পারফরম্যান্সের একটি সরকার যখন একটি এমন জটিল সময়ে, এমন ট্রাঞ্জিশনাল সময়ের নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে আমাদেরকে, সেই সরকার, সেই নির্বাচনটিকে সুষ্ঠুভাবে, হানাহানিমুক্তভাবে তুলে আনতে পারবে, তার জন্য যে পরিমাণে ট্রাস্ট জনগণের সরকারের ওপর থাকার কথা, এই ট্রাস্ট বা আস্থা জনগণের এই মুহূর্তে সরকারের ওপরে নেই।

পুলিশ বাহিনীর সংস্কার ছাড়া কীভাবে নির্বাচন সম্ভব হবে, এমন প্রশ্ন তুলে সামিনা লুৎফা বলেন, ‘এটা আসলে আমার খুব ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে কুলায় না। কিন্তু সেটা (নির্বাচন) তারা করতে যাচ্ছে। এখন এটা যখন করতে যাচ্ছে, তখন প্রশ্নটা ঘুরে আবার ওখানে আসে যে নির্বাচন করার মতো পরিবেশ–পরিস্থিতি আছে কি না?’

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন ছাড়া সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে সামিনা লুৎফা বলেন, ‘কারণ, আমাদের সময় নেই, আমাদেরকে অবশ্যই ফেব্রুয়ারির মধ্যে ইলেকশন শেষ করতে হবে। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে, এ অনাস্থার জায়গাটাকে যদি আমরা ওভারকাম করতে চাই, তাহলে শুধু রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, যেটার কথা আমরা গত ১৩ মাস ধরে শুনছি, সেই রাজনৈতিক বন্দোবস্ত যে কাজ করছে না—সেটা আমরা বুঝতে পারি।’

সংস্কারপ্রক্রিয়ায় নারীদের না রাখার সমালোচনা করেন সামিনা লুৎফা। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো হানাহানিমূলক অবস্থায় চলে যাবে; এর সবচেয়ে সহজ এবং প্রথম শিকার হব আমরা নাগরিকেরা এবং সেই নাগরিকেরা যেহেতু হানাহানির শিকার হব, সুতরাং আমাদের যথেষ্ট আশঙ্কা করার জায়গা রয়েছে এবং আমরা চাইব না—এ রকম একটি পরিস্থিতির মধ্যে নির্বাচনে চট করে চলে যেতে।’

দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আনতে হবে মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন,  ‘আমরা দেখেছি, আওয়ামী লীগ করলে সব দরজা আগে খোলা থাকত। এখন অন্য কোনো দল করলে সব দরজা খোলা থাকছে। এটা যদি চলতে থাকে, তাহলে আসলে প্রতিষ্ঠানের ওপরে কোনো ধরনের ট্রাস্ট তৈরি হবে না। কারণ, আমরা ধরেই নেব যে আমাকে হয় ওর নৌকায় উঠে যেতে হবে, অথবা ওর নৌকায় উঠে যেতে হবে।’

নানা রকম সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিগত ১৩ মাসে ‘সোশ্যাল ফেব্রিক’ ভয়াবহভাবে নষ্ট করা হয়েছে বলে বক্তব্যে তুলে ধরেন সামিনা লুৎফা। তিনি বলেন, ‘যার বেশির ভাগটাই বিচারবহির্ভূত এবং এখানে এই যে নিজে নিজে বিচারক হয়ে ওঠা, যাকে আমরা “মব” নাম দিয়েছি এবং এই সংঘবদ্ধ সহিংসতাগুলো সারা দেশে হয়েছে, সেগুলো ঠেকাতে যেহেতু এই সরকার সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে, সুতরাং আমরা বুঝতে পেরেছি যে এই সমাজে টিকে থাকতে হলে আমাদেরকে এই “মব” যারা করতে পারেন, তাদের পক্ষে চলে যেতে হবে।’

সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে তার কাজ দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে সময়ক্ষেপণ বাদ দিয়ে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য সহযোগিতা ও আন্তরিকতা দেখানোর পরামর্শ দেন সামিনা লুৎফা।

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ,গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন।

আরও বক্তব্য দেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বেসরকারি সংস্থা পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে আজাদ, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার, ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটির চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. মাহফুজুর রহমান, দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম।

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গোলটেবিল বৈঠক শুরু হয়। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ।