
আসন্ন নির্বাচনে সংখ্যালঘু, নারীসহ ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়েছে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তিন দিন আগে আজ সোমবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আয়োজিত এক মানববন্ধন থেকে এই দাবি জানানো হয়। ‘নারী, সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধীসহ প্রান্তিক ভোটারদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগের নিশ্চয়তা চাই’ শিরোনামে ‘নাগরিক সমাজ’–এর ব্যানারে এই মানববন্ধন হয়।
মানববন্ধনের পরে সন্ধ্যায় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে দেখা করে। তারা সংখ্যালঘু ও নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের উদ্বেগ ইসির কাছে তুলে ধরে। প্রতিনিধিদলে ছিলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির, আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী প্রমুখ।
ইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে ইফতেখারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তাঁদের উদ্বেগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এর আগে মানববন্ধনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় সুষ্ঠুতার সূচক হবে বিপন্ন জনগোষ্ঠী ও নারীর অংশগ্রহণ, ধর্মীয় সংখ্যালঘুর অংশগ্রহণ, আদিবাসী সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ, শারীরিকভাবে অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের অংশগ্রহণ এবং হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ।’ এই সূচকগুলো অনুসারে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বর্তমান সরকার তার দায়িত্ব কিছুটা পালন করেছে বলে ধরে নেওয়া হবে, বলেন তিনি।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য রাজনৈতিক দলগুলোকে এ প্রসঙ্গে সচেতন থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ততা থেকে বের হতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন তাদের দায়িত্ব ভুলে না যায়, সেটাই আমরা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আজকে এখানে সমবেত হয়েছি।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মানববন্ধনে বলেন, বর্তমানে দেশে পাঁচটি উপাদান রাজনৈতিক এবং নির্বাচনী পুঁজি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেগুলো হলো অর্থ, পেশি, ধর্ম, গরিষ্ঠতন্ত্র ও পিতৃতান্ত্রিকতা। তিনি বলেন, যেসব জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী, জাতিগত ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধীসহ যারা এই পাঁচটি মানদণ্ডের কোনোটাতেই ক্ষমতাবান নয় বা ক্ষমতায়িত নয় তারা প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে আছে।
ঝুঁকিতে থাকা এসব জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিশেষ করে সরকার, নির্বাচন কমিশন, সরকারের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সেনাবাহিনীর যাঁরা দায়িত্ব পেয়েছেন, তাঁদের সবার প্রতি আহ্বান, বিশেষ করে সাধারণ ভোটারদের পাশাপাশি এই প্রান্তিক ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।
মানববন্ধনে বিভিন্ন সংগঠন, সংস্থা, অধিকারকর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা অংশ নেন। তাঁরা ‘গণতন্ত্র নাকি মবতন্ত্র?’, ‘নিরাপত্তা চাই, নীরবতা নয়’, ‘সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা মানেই বাংলাদেশ’ প্রভৃতি স্লোগান–সংবলিত বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।
মানববন্ধনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। তিনি নির্বাচন কমিশন ও সরকারে কাছে কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘু, নারী, প্রতিবন্ধীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপদে ভোট দেওয়া নিশ্চিত করা, নির্বাচনের পর তাঁদের ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রভৃতি।
‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে নারী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিভিন্ন সময়ে দাবি জানানো হলেও কোনো পক্ষ সন্তোষজনক পদক্ষেপ নেয়নি। নির্বাচন যাতে হতে পারে, এই পরিবেশ তৈরিতে নির্বাচন কমিশন ও সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
মানববন্ধনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস জানান, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তীব্র ভয়ের মধ্যে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে উদ্বেগ জানিয়েছেন, ভোট দেওয়ার পরে তাঁরা নিরাপদ থাকবেন কি না। নির্বাচন কমিশন ও সরকারের দায়িত্ব এই ভয় নিরসনে যথাযথ ভূমিকা নেওয়া।
আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম, গত ১৮ মাসে দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা হবে। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের আকাশসম প্রত্যাশা দেখালেও এখন সেই প্রত্যাশা মাটিতে নেমে এসেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যেন নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর কোনো নির্যাতনের ঘটনা না ঘটে, এই প্রত্যাশা নাগরিক সমাজের রইল।’
২০০৭–০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী অভিযোগ করেন, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দল, সব জায়গায় নারীদের দাবিয়ে রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নারী সমাজ এটাকে প্রত্যাখ্যান করছি। তারা যে বক্তব্য দিচ্ছে সেটাকে আমরা মানছি না।’
মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান, আইনজীবী তবারক হোসেন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সদস্য দীপায়ন খীসা, টিআইবির চেয়ারপারসন মনসুর আহমেদ চৌধুরীসহ অনেকে।