
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে পদত্যাগ করেছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।
মিরপুরের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা যখন ঘটে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তখন জাতিসংঘে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গৌরবের বার্তা দিয়ে দেশে ফিরেই তাঁকে মুখোমুখি হতে হয় দলের কিছু নেতা-কর্মীর সামাজিক অপরাধের বিব্রতকর ঘটনায়। রাড্ডার ঘটনা ছিল এর অন্যতম। শেষ পর্যন্ত শক্ত অবস্থান নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তারই ধারাবাহিকতায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেছেন। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার এবং কমিটিও বাতিল করা হয়।
গত বুধবার রাতেই জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। গতকাল বেলা পৌনে দুইটার দিকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ফেরদৌসী আহমেদ পদত্যাগপত্র জমা দেন। গতকালই তাঁর আসনটি শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়।
চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, মাদক, জুয়াসহ যেকোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকবে, তাদের দলীয় পরিচয় যা–ই হোক, কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
রাড্ডার ঘটনা অবশ্য বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচনা চলে আসছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি করতে পারেনি। বর্তমান বিএনপি সরকারের সাড়ে সাত মাসেও সেই অস্বস্তি কাটেনি। বরং রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দখল, চাঁদাবাজি, হামলা, ভাঙচুর ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে আসছে।
বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে একের পর এক অপরাধের ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে জায়গা দখলের উদ্দেশ্যে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ- এফপি সেন্টারের স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং লুটপাট করা হয়। মা ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানটিতে হামলার ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এ নিয়ে তুমুল সমালোচনার মধ্যেই ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর ইসিবি এলাকায় নিউগিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে হামলা এবং সেখানে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর–লুটপাট করা হয়। একই দিন ভোরে রাজধানীর আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে একটি বহুতল ভবন দখলের চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। সেদিনই মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে কয়েক শ লোক একটি প্লটে ঢুকে ভাঙচুর করে টাকা ও যন্ত্রপাতি লুট করে। এসব ঘটনায় সরকারি দলের স্থানীয় কিছু নেতা-কর্মীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে—সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট কঠোর কি না।
এ বাস্তবতায় রাড্ডার ঘটনায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের আলাদা তাৎপর্য তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এটি শুধু একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া নয়; নিজ দলের নেতা-কর্মীদের জন্যও প্রধানমন্ত্রীর একটি স্পষ্ট বার্তা—অপরাধ বা অনিয়মে রাজনৈতিক পরিচয় ঢাল হবে না। রাড্ডার ঘটনায় দলীয় সংসদ সদস্যের পদত্যাগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বহিষ্কার ও কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা সেই বার্তাকেই সামনে এনেছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদের পদত্যাগের আগেই বুধবার রাতে বিএনপি ও যুবদলের ঢাকা মহানগর উত্তর এবং ছাত্রদলের মহানগর পশ্চিম কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সঙ্গে বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর সম্পৃক্ততার আলোচনার মধ্যেই এসব সিদ্ধান্ত আসে। যদিও রাড্ডা–কাণ্ডে প্রভাবশালী স্থানীয় নেতাদের আরও কারও কারও সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা আছে।
এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রথম আলোকে বলেন, ‘যারা নানাভাবে নানা সুযোগে দলে ঢুকেছে, অথবা দল করেছে—অর্থাৎ, যারাই দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে অনৈতিক ও গর্হিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবে, তাদের কেউই ছাড় পাবে না।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষে দেশে ফিরেই প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর খোঁজখবর নেন এবং তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন। বিশেষ করে রাড্ডার ঘটনায় কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে গত মঙ্গল ও বুধবার একাধিক উপদেষ্টার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেন তিনি। স্বরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গেও কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে মতামত দেওয়া দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, তাঁরা রাড্ডার ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, দেশে একটি সরকার বিদ্যমান থাকা অবস্থায় একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা লজ্জাজনক। তাঁর ভাষায়, এ ঘটনার পর মুখ দেখানোর জো নেই।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি সূত্র বলছে, একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া, লুটপাট ও জমি দখলের অভিযোগে দলের নেতা-কর্মীদের নাম আসায় সরকার বিব্রত। ঘটনার সঙ্গে ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসার পর তাঁর ভূমিকা ও রাজনৈতিক দায়ও আলোচনায় আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর বিষয়েও কঠোর সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় দলীয় এই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বলে গত বুধবার জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে। কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে ছাড় দেওয়া হবে না।
সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, মাদক, জুয়াসহ যেকোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকবে, তাদের দলীয় পরিচয় যা–ই হোক, কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিশেষ কোনো অভিযান পরিচালনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সাধারণত কোনো অভিযানে পুলিশ, এসআরবি, এসবি, ডিবি প্রয়োজন অনুযায়ী একে অপরের সহযোগিতা নেয়। আজকেই (বৃহস্পতিবার) আমরা সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠন করেছি। সব দিক থেকে প্রস্তুতি নিয়ে সামগ্রিকভাবে অপরাধ দমন এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চলমান আছে।’
তবে এখানেই সরকারের জন্য একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে জমে থাকা অস্বস্তি শুধু রাড্ডার একটি ঘটনায় ব্যবস্থা নিয়ে কাটবে কি না। সারা দেশে সংঘটিত আরও ঘটনার ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়, প্রভাব কিংবা ক্ষমতার ছায়ায় অপরাধের অভিযোগ উঠলে একই কঠোরতা প্রয়োগ করা হবে কি না, সেটি দেখার বিষয় হয়ে উঠবে। একই ধরনের কঠোরতা অব্যাহত থাকলেই সরকারের আইনশৃঙ্খলা নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা পাবে, মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে।
সরকার তেমনই অবস্থান নিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এবং বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুধু রাড্ডার ঘটনাই নয়, যেখানে অপরাধমূলক ঘটনা ঘটবে, সেখানেই অ্যাকশন হবে। অপরাধীদের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করার কোনো সুযোগ নেই। সে দলের হোক, আর দলের বাইরে হোক। ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধেই অ্যাকশন হবে। সে বার্তাই দেওয়া হয়েছে।’
সরকারের নেওয়া পদক্ষেপকে দেশের ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় পরিবর্তন’ বলে মনে করেন জাতীয় অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহবুব উল্লাহ। এ জন্য তিনি সরকারকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে বিএনপির নেতা-কর্মীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নজরদারির জন্য একটি কমিটি গঠনের পরামর্শ দেন তিনি।
অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক দলের লোকেরা কোনো অন্যায়-অপকর্ম করলে দলের যে সুনামহানি ও ক্ষতি হয়, সেটা সহজে জোড়া লাগানো যায় না। তাই দলের লোকেরা কে কোথায় কী করছে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। এ জন্য সৎ ও ন্যায়পরায়ণ লোকদের দিয়ে একটি কমিটি করা হলে তাতে জন–আস্থা তৈরি হবে।