
এবার মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল।
রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়।
মোট ৬৪৫টি আপিল নির্বাচন কমিশনে জমা পড়ে।
পোস্টাল ব্যালটে পক্ষপাতের অভিযোগসহ তিনটি ইস্যু নিয়ে গতকাল রোববার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সামনে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। আগের দিন পক্ষপাত করে বা কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের পার করে দেওয়ার চেষ্টা করলে ইসির বিরুদ্ধে ‘অ্যাকশনে’ যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রার্থীদের আপিল শুনানি শেষ করে ইসি।
১০ জানুয়ারি শুরু হওয়া আপিল শুনানির শেষ দিন ছিল গতকাল। এদিন ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি ও রায়ের দিন ধার্য ছিল। শেষ দিন আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন ২১ জন। আর প্রার্থিতা হারিয়েছেন বিএনপির দুজন। এর মধ্যে ঋণখেলাপি হওয়ায় চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির সারোয়ার আলমগীর এবং দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল গফুর ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করে ইসি। এর আগে গত শনিবার কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল করেছিল ইসি। রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে তাঁদের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছিল।
এর বাইরে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে বেশ কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে আপিল হলেও সবার মনোনয়নপত্র বহাল রেখেছে ইসি। আপিল শুনানি শেষে গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন বলেছেন, ইসি কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করে সিদ্ধান্ত দেয়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এবার মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের (মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাতিলের) বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করার সুযোগ ছিল। নির্ধারিত সময়ে মোট ৬৪৫টি আপিল ইসিতে জমা পড়ে।
ইসিতে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন মোট ৪১৭ জন। আর রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে বৈধ হলেও আপিলে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে ৬ জনের। আগামীকাল ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। এরপর আগামী নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা জানা যাবে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ১১ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল ২৯ ডিসেম্বর। আর আপিল নিষ্পত্তির শেষ দিন ছিল গতকাল। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হবে।
আপিলে ইসি কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করে সিদ্ধান্ত দেয়নি। ইসি সবার অংশগ্রহণে একটি সুন্দর নির্বাচন চায়। এ জন্য রাজনৈতিক দলসহ সব অংশীজনের সহায়তা দরকার।এ এম এম নাসির উদ্দীন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার
গত শনিবার রাতে এনসিপি সংবাদ সম্মেলন করে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল, আপিল শুনানির শেষ দিনটি ইসির জন্য ‘রেডলাইন’। ইসির কার্যক্রম দেখে তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। অন্যদিকে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে পক্ষপাতের অভিযোগসহ তিন ইস্যুতে গতকাল বেলা ১১টা থেকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সামনে অবস্থান নেন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। উত্তেজনাকর অবস্থায় কড়া নিরাপত্তার মধ্যে নির্বাচন ভবনের মিলনায়তনে সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় শেষ দিনের আপিল শুনানি। কার্যক্রম শেষ হয় রাত ৮টার দিকে।
মাগরিবের নামাজের বিরতির পর দ্বৈত নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত আপিলগুলোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। এর আগে বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচন কর্মকর্তাদের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীনের সঙ্গে বৈঠক করে।
সংবিধান অনুযায়ী, কেউ দ্বৈত নাগরিক হলে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন। বাছাইয়ে বৈধ হলেও বেশ কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগে প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে ইসিতে আপিল হয়েছিল। ইসি এ ধরনের আপিলগুলোর সিদ্ধান্ত দেয় গতকাল। এ ক্ষেত্রে ইসির মূল বিবেচ্য ছিল, সংশ্লিষ্ট প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনের আগে (২৯ ডিসেম্বরের আগে) বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করার জন্য আবেদন করেছেন কি না, প্রয়োজনীয় ‘ফি’ জমা দিয়েছেন কি না। এর পাশাপাশি প্রার্থীদের কাছ থেকে একটি হলফনামাও জমা নেয় ইসি। যাঁরা এ কাজগুলো সম্পন্ন করেছেন বলে প্রমাণ করতে পেরেছেন, তাঁদের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়।
এমন বিবেচনায় ফেনী-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টু, মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খানম, দিনাজপুর-৫ আসনে এ কে এম কামরুজ্জামান, ঢাকা-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ নজরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজনের মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিরুদ্ধে করা আপিল নামঞ্জুর করে ইসি। ফলে তাঁদের প্রার্থিতা বহাল থাকল। সিলেট-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী এহতেশামুল হকের মনোনয়নপত্রও বৈধ ঘোষণা করে ইসি। অন্যদিকে কুমিল্লা–৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের বিরুদ্ধে করা আপিলের সিদ্ধান্ত গতকাল পর্যন্ত দেয়নি ইসি। সূত্র জানায়, এ বিষয়ে আজ সোমবার সিদ্ধান্ত দেওয়া হতে পারে।
এর বাইরে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগে ফরিদপুর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী শামা ওবায়েদ, সুনামগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী তাহের রায়হান চৌধুরীসহ কয়েকজন প্রার্থীকে নিজ থেকে নোটিশ দিয়েছিল ইসি। শুনানি শেষে তাঁদের প্রার্থিতাও বহাল রাখে ইসি।
ঋণখেলাপি হওয়ার অভিযোগে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিরুদ্ধে একাধিক আপিল হয়েছিল। গতকাল ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও যমুনা ব্যাংক তাঁর বিরুদ্ধে শুনানিতে অংশ নেয়। শুনানি শেষে তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে ইসি।
সবগুলো আপিলের শুনানি শেষে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীন বলেন, আপিলে ইসি কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করে সিদ্ধান্ত দেয়নি। ইসি সবার অংশগ্রহণে একটি সুন্দর নির্বাচন চায়। এ জন্য রাজনৈতিক দলসহ সব অংশীজনের সহায়তা দরকার।
সিইসি বলেন, ‘আপনারা হয়তো আমাদের সমালোচনা করতে পারেন অনেকেই। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের বিষয়টা আমরা কীভাবে ছেড়ে দিয়েছি, আপনারা দেখেছেন। বিকজ উই ওয়ান্ট দ্য ইলেকশন টু বি পার্টিসিপেটেড (কারণ আমরা চাই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হোক)। আমরা চাই যে সবার অংশগ্রহণে একটা সুন্দর নির্বাচন হোক। আপনারা সহযোগিতা না করলে কিন্তু হবে না।’
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে পক্ষপাতের অভিযোগসহ তিন ইস্যুতে আজও ইসির প্রধান কার্যালয় ঘেরাওয়ের ঘোষণা দিয়েছে ছাত্রদল।
গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ইসির সঙ্গে আলোচনা শেষে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম এই ঘোষণা দেন। এর আগে বিকেল পাঁচটার দিকে ছাত্রদলের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ইসির সঙ্গে বৈঠক করে।
বৈঠক শেষে রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের কাছে তিনটি ইস্যু নিয়ে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরেছি। কমিশন সেই বক্তব্য শুনেছে। বিষয়গুলো তারা যৌক্তিকভাবে বিবেচনা করবে বলে আশ্বস্ত করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আজকের মতো অবস্থান কর্মসূচি শেষ করছি। তবে দাবি আদায় না হওয়ায় আগামীকাল (আজ) বেলা ১১টা থেকে আবারও নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করা হবে।’
এর আগে বেলা ১১টা থেকে ইসি কার্যালয়ের সামনে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। ছাত্রদলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার নেতা-কর্মী এ কর্মসূচিতে অংশ নেন। এতে ইসির সামনের সড়ক দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় ইসি কর্মকর্তাদের কার্যালয় থেকে বের হতে না দেওয়ার ঘোষণা দেন ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা। কর্মসূচি চলাকালে বিকেল পাঁচটার দিকে ইসির একজন কর্মকর্তা কার্যালয় থেকে বের হতে চাইলে ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা বাধা দেন। নতুন কর্মসূচি ঘোষণা হলে রাত আটটার দিকে তাঁরা সেখান থেকে চলে যান।
ছাত্রদলের তিনটি ইস্যু হচ্ছে—
১. পোস্টাল ব্যালট–সংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট ও প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা নির্বাচনপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর সংশয় সৃষ্টি করেছে।
২. বিশেষ একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চাপের মুখে দায়িত্বশীল ও যৌক্তিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে হঠকারী ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে ইসি, যা কমিশনের স্বাধীনতা ও পেশাদারত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
৩. বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও হস্তক্ষেপে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন বিষয়ে ইসি নজিরবিহীন ও বিতর্কিত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য অশনিসংকেত।