সরকারবিরোধী ভূমিকা নিয়ে রাজনীতিতে ‘স্বতন্ত্র’ অবস্থান তৈরি করতে চায় জাপা। দলটিকে সেই সুযোগ দিতে আস্থা পাচ্ছে না সরকার।
সরকারবিরোধী ভূমিকা নিয়ে রাজনীতিতে একটু ‘ভিন্ন’ অবস্থান গড়তে বেশ কিছুদিন ধরে তৎপর জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জাপা)। এর লক্ষ্য মূলত ভোটের রাজনীতিতে বিএনপির জনসমর্থনে ভাগ বসানো। একই সঙ্গে রাজনীতিতে জাপার একটি ‘স্বতন্ত্র’ অবস্থান তৈরি করা। কিন্তু নানা ‘সংশয়-সন্দেহে’ জাপাকে সে ভূমিকায় যেতে দিতে চায় না সরকার।
জাতীয় পার্টির একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনেও জাপা শর্তহীনভাবে সরকারের সঙ্গে থাকবে—এটাই চায় সরকারের উচ্চ মহল। কিন্তু জাপার শীর্ষ নেতৃত্ব তাতে পুরোপুরি সম্মত নয়। কারণ, দলের অধিকাংশ নেতা মনে করছেন, দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়, সরকারের জনসমর্থনও কমেছে। এর মধ্যে আগামী জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি ঘোষণার পর সরকারের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো এখনো সরকারের সঙ্গে প্রকাশ্যে তাল মিলিয়ে চলা জাপার জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করবে।
একদিকে সরকারবিরোধী প্রকট জনমত, অন্যদিকে বহির্বিশ্বের চাপ—এ অবস্থায় আগের মতো গায়ে পড়ে সমর্থন দিতে রাজি নয় জাপা। দলটি মনে করছে, বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় একটা কৌশলী অবস্থান নিতে না পারলে জাপা অস্তিত্ব সংকটেও পড়ে যেতে পারে।
রাজনীতিতে জাপা তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছিল। এখন সেটাকে নানাভাবে দমিয়ে রাখার অপচেষ্টা চলছে বলে মনে হচ্ছে।জি এম কাদের, চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টি
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাপার শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাই বিএনপির বিকল্প হিসেবে দাঁড়াতে। আমরা যদি এক পার্সেন্ট ভোটও পাই, সেটি তো বিএনপির ভোট। তা আওয়ামী লীগ বুঝল না। তারা যেভাবে চায়, সেভাবে আমরা চাই না। আমরা বলেছি, শর্তহীনভাবে সমর্থন দিতে পারব না।’
সরকার জি এম কাদেরের চেয়ে রওশন এরশাদকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। সম্প্রতি জাপার সংসদীয় দল ও প্রেসিডিয়াম সদস্যরা রওশন এরশাদের জায়গায় জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদের স্পিকার বরাবর আবেদন করলেও সেটি কার্যকর করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারের ভাবমূর্তি এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বেশ কিছুদিন থেকে বক্তৃতা-বিবৃতিতে সরকারের সমালোচনায় মুখর হন জাপার শীর্ষ নেতৃত্ব। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কার্যত দুটি কৌশল থেকে জাপা এই ভূমিকা নেয়। এর একটি সরকারের সঙ্গে দূরত্ব দেখানো, আর অন্যটি হচ্ছে জাপাকে সত্যিকারের বিরোধী দল হিসেবে আস্থায় নেওয়ার চেষ্টা। জাপার এই কৌশল ও ভূমিকায় দলটির দেশি-বিদেশি শুভাকাঙ্ক্ষীদেরও সম্মতি রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুরুর দিকে এতে সরকারের দিক থেকেও সায় ছিল। কিন্তু সম্প্রতি নানা ভুলত্রুটি ধরে সরকারের ‘কট্টর’ সমালোচনা, বিশেষ করে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের বিরুদ্ধে কিছু বক্তব্যের কারণে জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের সঙ্গে সরকারের কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়। কিছুদিন ধরে জি এম কাদের দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা, সরকারের দুর্নীতি, লুটপাট, বিশেষ করে নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য সরকারকে দায়ী করে কঠোর ভাষায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন।
এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয় বলেও বক্তব্য দিয়েছেন জাপার চেয়ারম্যান। এসব কারণে জি এম কাদের সম্পর্কে সরকারের ভেতরে এমন সন্দেহের সৃষ্টি হয় যে তিনি কি মুখে মুখে সরকারবিরোধিতা করছেন, না কি ভেতরে-ভেতরে অন্য কিছু আছে। এর মধ্যে বিএনপির সঙ্গে তাঁর কোনো গোপন যোগাযোগ হয়েছে কি না, সে সন্দেহও করছিলেন সরকারের কেউ কেউ।
জাপার নেতারা বলছেন, তাঁদের দুই শীর্ষ নেতাকে ঘিরে যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে, তাতে রাজনীতিতে ‘স্বতন্ত্র’ অবস্থান নিতে গিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে হোঁচট খাচ্ছে জাপা।
জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজনীতিতে জাপা তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছিল। জনগণের মধ্যে একটা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করেছি। এখন সেটাকে নানাভাবে দমিয়ে রাখার অপচেষ্টা চলছে বলে মনে হচ্ছে।’
দলটির অন্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের মধ্যে যে বিরোধ, সেটির মূলে রয়েছে ওই সংশয়-সন্দেহ। সম্প্রতি জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদেরের দায়িত্ব পালনের ওপর আদালতে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে যে মামলা হয়, সেটির পেছনেও এই ‘সন্দেহ’ কাজ করেছে বলে মনে করেন নেতা-কর্মীরা। জি এম কাদের একটা স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়ে কৌশলে এগোতে চান। আর রওশন চাইছেন প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে সরকারের সঙ্গে থাকতে। যদিও এ ক্ষেত্রে রওশনের দিকেই পাল্লা ভারী। কারণ, বিএনপি নির্বাচনে না গেলে অনেকের সংসদ সদস্য হওয়া সহজ হবে এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাবে।
তারা (রওশনপন্থীরা) যে এগুলো করবে, সেটা আমাদের জানা কথা। আমরা এতে লড়াই করব। নেপথ্যে যারাই থাক, আমরা নতি স্বীকার করব না। চেয়ারম্যান শক্তভাবে পদক্ষেপ নেবেনজাপার মহাসচিব মো. মুজিবুল হক
জাপার নেতারা বলছেন, তাঁদের দুই শীর্ষ নেতাকে ঘিরে যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে, তাতে রাজনীতিতে ‘স্বতন্ত্র’ অবস্থান নিতে গিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে হোঁচট খাচ্ছে জাপা। যার সর্বশেষ প্রকাশ ঘটে ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে। এ আসনে জি এম কাদের সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিকদার আনিছুর রহমানকে মনোনয়ন দিয়েছেন। আর রওশন এরশাদ প্রার্থী করতে চাইছেন তাঁর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক কাজী মামুনুর রশিদকে; যাঁকে জি এম কাদের প্রেসিডিয়াম সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন।
গত বছরের আগস্টে এই মামুনুর রশিদ জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে তাঁর মুঠোফোনে জীবননাশের হুমকিসংবলিত একাধিক বার্তা ও কবরের ছবি পাঠিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় বিরোধীদলীয় উপনেতার সহকারী একান্ত সচিব মো. আবু তৈয়ব উত্তরা পশ্চিম থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছিলেন। রওশন তাঁকেই প্রার্থী করার চেষ্টা করছেন। এর মধ্য দিয়ে জাপার অভ্যন্তরীণ কোন্দল আবারও প্রকাশ্যে এসেছে।
এ বিষয়ে জাপার মহাসচিব মো. মুজিবুল হক গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘তারা (রওশনপন্থীরা) যে এগুলো করবে, সেটা আমাদের জানা কথা। আমরা এতে লড়াই করব। নেপথ্যে যারাই থাক, আমরা নতি স্বীকার করব না। চেয়ারম্যান শক্তভাবে পদক্ষেপ নেবেন।’
অবশ্য দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত এইচ এম এরশাদের সময় থেকেই জাপায় এই বিভাজন চলে আসছে। এরশাদ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। কিন্তু রওশন এরশাদ দলের নেতাদের একটি অংশকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন, পরবর্তী সময়ে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হন। এখনো দলে সেই বিভাজন রয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে সরকার জি এম কাদেরের চেয়ে রওশন এরশাদকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। সম্প্রতি জাপার সংসদীয় দল ও প্রেসিডিয়াম সদস্যরা রওশন এরশাদের জায়গায় জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদের স্পিকার বরাবর আবেদন করলেও সেটি কার্যকর করা হয়নি। এরপর রওশনপন্থী নেতা মসিউর রহমানকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের পদ থেকে সরিয়ে ফখরুল ইমামকে স্থলাভিষিক্ত করার আবেদনও ঝুলে আছে।
জাপার উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ১২ জুন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের মেয়র প্রার্থীর ওপর সরকারি দলের হামলার ঘটনা এবং নির্বাচন বর্জনের ঘোষণার পর জাপার শীর্ষ নেতৃত্বও ঢাকা-১৭ ও চট্টগ্রাম-১০ আসনের উপনির্বাচনসহ এ সরকারের অধীনে আর নির্বাচন করার যৌক্তিকতা নিয়ে ভাবেন। পরদিন দলীয় পর্ষদে এ বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাপা সেদিকে যায়নি। এর মধ্যে ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে পিলখানা হত্যাযজ্ঞে নিহত সাবেক বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের ছেলে রাকিন আহমেদ ভূঁইয়াকে প্রার্থী করার যে আলোচনা ছিল, সেখান থেকেও সরে আসে জাপা।
অবশ্য জাপার চেয়ারম্যানের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোকে দলের ‘ভাবমূর্তি’ বৃদ্ধি করছে বলে মনে করেন কো–চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় পার্টি অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে টিকে আছে। তাদের নিবেদিত নেতা–কর্মীরা দলের মূল স্রোতের বাইরে যাবেন না।