পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে এবার প্রবাসীসহ সোয়া ১৫ লাখের বেশি ভোটার ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে নিবন্ধন করেছেন। সংখ্যার হিসাবে এটি দেশের মোট ভোটারের মাত্র ১ শতাংশ, তবু আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল নির্ধারণে এই পোস্টাল ভোট কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নির্বাচন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আসনভিত্তিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে পোস্টাল ভোট কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। কারণ, আসনভিত্তিক হিসাবে পোস্টাল ভোট খুব বেশি নয়। তবে কিছু আসনে এই ভোট ফলাফল নির্ধারণের নিয়ামক হয়েও ওঠতে পারে।
আগামী নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ। পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন ১৫ লাখ ২৭ হাজার, এর মধ্যে প্রবাসী ৭ লাখ ৬০ হাজার।
এ ছাড়া এবারের নির্বাচনে ভিন্নতা আছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত গণভোট। পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধিত ভোটারেরা এই ভোট দেওয়ারও সুযোগ পাচ্ছেন। গণভোটের ফলাফল নির্ধারিত হবে ৩০০ আসনের মোট প্রদত্ত ভোটের হিসাবে। তাই পোস্টাল ব্যালটের ভোট গণভোটের চূড়ান্ত ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গণভোটে যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়, তাহলে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হবে। এতে আগামী জাতীয় সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, নিম্নকক্ষ বা সংসদের ৩০০ আসনে একটি দল মোট যত ভোট পাবে, তার অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন পাবে। উচ্চকক্ষের এই আসন বণ্টনের ক্ষেত্রেও পোস্টাল ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যেসব আসনে পোস্টাল ভোট ১০ হাজার বা তার বেশি, সেখানে এই ভোট ফলাফলকে প্রভাবিত করার আশঙ্কা আছে। বিশেষ করে এই ১০ হাজার ভোটের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ যদি একজন প্রার্থী পান, তাহলে তা ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।জেসমিন টুলি, সাবেক অতিরিক্ত সচিব, ইসি
নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি এবং কারাবন্দীদের পাশাপাশি এবারই প্রথম প্রবাসে থাকা বাংলাদেশি ভোটাররা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
আগে আইন থাকলেও সুযোগ ছিল সীমিত। এবার ‘আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটে ভোট’ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ জন্য নির্বাচনী আইনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ৫ জানুয়ারি ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে নিবন্ধন শেষ হয়।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, ৩০০ সংসদীয় আসনে আগামী নির্বাচনের জন্য মোট ১৫ লাখ ২৭ হাজার ১৫৫ জন ভোটারের পোস্টাল ভোট নিবন্ধন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রবাসী ৭ লাখ ৬০ হাজারের কিছু বেশি। বাকিরা দেশ থেকে নিবন্ধন করেছেন। তাঁদের মধ্যে পৌনে ছয় লাখ সরকারি চাকরিজীবী, প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার নির্বাচনী কর্মকর্তা, ১০ হাজার আনসার-ভিডিপির সদস্য এবং ৬ হাজারের কিছু বেশি কারাবন্দী।
আগামী নির্বাচনে দেশের মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। তবে প্রবাসে মোট কত বাংলাদেশি ভোটার আছেন—এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ইসির কাছে নেই।
১৫ লাখের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করলেও তাঁদের সবাই ভোট দেবেন, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন বিকেল সাড়ে চারটার মধ্যে পোস্টাল ব্যালট না পৌঁছালে তা গণনা করা হবে না।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় আসনভিত্তিক। সাধারণত আসনগুলোতে জয়-পরাজয়ে ভোটের ব্যবধান বেশ বড় থাকে। ইসি সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০ হাজার ভোটের কম ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছিল ৩০টি আসনে।
এবার আসনভিত্তিক হিসাবে দেশ-বিদেশ মিলিয়ে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে ১০ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন, এমন আসন আছে ১৮টি। এর মধ্যে একটি ছাড়া সব কটি আসনই চট্টগ্রাম বিভাগে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন হয়েছে ফেনী-৩ আসনে, ১৬ হাজার ৩৮ জন।
সাড়ে ১২ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন, এমন আসনগুলো হলো চট্টগ্রাম-১৫ (১৪ হাজার ২৭২), কুমিল্লা-১০ (১৩ হাজার ৯৩৮), নোয়াখালী-১ (১৩ হাজার ৫৯২), নোয়াখালী-৩ (১২ হাজার ৭৪৫) এবং ফেনী-২ (১২ হাজার ৫৪১) আসন।
১০ হাজারের বেশি ও সাড়ে ১২ হাজারের কম ভোটার নিবন্ধন করেছেন, এমন আসনগুলো হলো কুমিল্লা-৪, ৫, ৬, ৯ ও ১১, সিলেট-১, চাঁদপুর-৫, নোয়াখালী-৪ ও ৫, ফেনী-১, কক্সবাজার-৩ ও লক্ষ্মীপুর-২ আসন।
এ ছাড়া ৫ হাজার থেকে শুরু করে ১০ হাজারের কম ভোটার নিবন্ধন করেছেন এমন আসন আছে ৯৭টি। বাকি আসনগুলোতে পোস্টাল ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ৫ হাজারের কম। এর মধ্যে সবচেয়ে কম ১ হাজার ৫৪৪ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন বাগেরহাট-৩ আসনে।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি প্রথম আলোকে বলেন, যেসব আসনে পোস্টাল ভোট ১০ হাজার বা তার বেশি, সেখানে এই ভোট ফলাফলকে প্রভাবিত করার আশঙ্কা আছে। বিশেষ করে এই ১০ হাজার ভোটের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ যদি একজন প্রার্থী পান, তাহলে তা ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এমনটা মনে করছেন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচনব্যস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদারও। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কোনো আসনে পোস্টাল ভোট বেশি হলে ফলাফলে তা প্রভাব ফেলতে পারে।
যেভাবে পোস্টাল ব্যালটে ভোট নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাতে কয়েকটি ধাপ আছে। এটা অনেকটা ব্ল্যাক বক্সের মতো। এখানে কিছুটা স্বচ্ছতার ঘাটতি ও কারসাজির অভিযোগ ওঠার ঝুঁকিও আছে। প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ব্যালট পাঠানো হয়েছে। কেউ কেউ প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ভোট দিয়ে দিচ্ছেন, এমনটাও শোনা যাচ্ছে।বদিউল আলম মজুমদার, নির্বাচনব্যস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান
ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শেষ পর্যন্ত পোস্টাল ব্যালটে কত ভোট পড়ে, তা দেখতে ভোটের ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, ১৫ লাখের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করলেও তাঁদের সবাই ভোট দেবেন, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন বিকেল সাড়ে চারটার মধ্যে পোস্টাল ব্যালট না পৌঁছালে তা গণনা করা হবে না। পোস্টাল ভোট নষ্ট হওয়ার হারও বেশি।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এক অনুষ্ঠানে পোস্টাল ব্যালটের কিছু চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বৈশ্বিকভাবে পোস্টাল ব্যালটের ওয়েস্টেজ বা নষ্ট হওয়ার হার ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় প্রতি চারটির একটি পোস্টাল ব্যালট গন্তব্যে পৌঁছায় না।
গত বছর নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও পোস্টাল ব্যালট কার্যকর করার সুপারিশ করেছিল। তবে তারা যে সুপারিশ করেছিল, ইসি সেটি গ্রহণ করেনি। ইসি এরই মধ্যে নিবন্ধিত প্রবাসীদের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠিয়ে দিয়েছে। তাঁরা ভোট দিয়ে তা ফেরত পাঠাবেন।
ইসির আউট অব কান্ট্রি ভোটিং সিস্টেম অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন (ওসিভি-এসডিআই) প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান এর আগে জানিয়েছিলেন, আগে হাতে পাওয়া এই ব্যালটের গোপনীয়তা রক্ষা করা ভোটারের দায়িত্ব। কেউ গোপনীয়তা লঙ্ঘন করলে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্লক করা হতে পারে।
বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, যেভাবে পোস্টাল ব্যালটে ভোট নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাতে কয়েকটি ধাপ আছে। এটা অনেকটা ব্ল্যাক বক্সের মতো। এখানে কিছুটা স্বচ্ছতার ঘাটতি ও কারসাজির অভিযোগ ওঠার ঝুঁকিও আছে। প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ব্যালট পাঠানো হয়েছে। কেউ কেউ প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ভোট দিয়ে দিচ্ছেন, এমনটাও শোনা যাচ্ছে।
কোনো আসনে পোস্টাল ভোটের কারণে জয়–পরাজয় নির্ধারণ হলে তখনো অভিযোগ উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তবে তিনি আশা করছেন, ঝুঁকি থাকলেও পোস্টাল ব্যালটে ভোটের ক্ষেত্রে ইসি তার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে পারবে।