
আসন্ন গণভোটে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নেটওয়ার্ক ফর পিপলস্ অ্যাকশনের (এনপিএ) অবস্থান ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে। তবে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলেও এই মেয়াদে সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন করার পক্ষে নয় প্ল্যাটফর্মটি। প্রার্থীদের নামের তালিকা প্রকাশসহ আনুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আগামী নির্বাচনের পর উচ্চকক্ষ গঠনের দাবি জানিয়েছে এনপিএ।
আজ সোমবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক উত্তরণ’ শিরোনামে এক সংবাদ সম্মেলনে ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট ও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন এনপিএর প্রতিনিধিরা।
জুলাই সনদ অনুসারে সংবিধান সংশোধনে গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে আরও কিছু পরিবর্তনের সঙ্গে সংসদে বর্তমান ৩০০ আসনের বাইরে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।
এনপিএর সংবাদ সম্মেলনে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্য নির্বাচনের আগেই উচ্চকক্ষের ১০০ প্রার্থীর পর্যায়ক্রমিক তালিকা প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার বিধান রাখার দাবি জানানো হয়। তারা বলছে, উচ্চকক্ষ নির্বাচনের জন্য অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দলের প্রতীকসংবলিত পৃথক ব্যালটের ব্যবস্থা রেখে উচ্চকক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এনপিএর মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী বলেন, সরকারের তরফ থেকে নিরপেক্ষভাবে গণভোটের বিষয়গুলো জনগণের সামনে তুলে ধরার পরিবর্তে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। গালভরা প্রচারণার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াকে জনবিচ্ছিন্ন করে তোলা হয়েছে। গণভোটের ব্যালটে চারটি ধারা উপস্থাপিত হলেও বাস্তবে প্রতিটি ধারার ভেতরে একাধিক মৌলিক সাংবিধানিক প্রশ্ন, ক্ষমতার কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস ও ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব উপপ্রশ্নের ওপর জনগণের কাছ থেকে কোনো পৃথক ও স্পষ্ট সম্মতি নেওয়া হচ্ছে না। ফলে ভোটাররা প্রকৃত অর্থে চারটি প্রশ্নে নয়, বরং বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে একটি প্যাকেজ সম্মতি দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টি পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের পর কার্যকর করার দাবি জানিয়ে এনপিএর মুখপাত্র বলেন, গণভোটের ব্যালটে আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষের বিধান থাকলেও নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলো ১০০ প্রার্থীর কোনো তালিকা জনগণের সামনে প্রকাশ করেনি। ফলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে কীভাবে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে, তা নিয়ে জনমনে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। যেসব দল ৩০০ আসনের সব কটিতে প্রার্থী দেয়নি, সেসব দলের পক্ষে ১০০ শতাংশ ভোটার উচ্চকক্ষের জন্য কার্যকরভাবে ভোট দিতে পারবেন না। এটা সমান ভোটাধিকার নীতির লঙ্ঘন।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের বদলে উচ্চকক্ষ বড় দলনির্ভর একটি কাঠামোতে পরিণত হবে।
এনপিএর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য অনিক রায় বলেন, গণতন্ত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য রাখতে হলে উচ্চকক্ষ দরকার। এবার ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হলে যদি উচ্চকক্ষ গঠন করা হয়, তাহলে তা আরেকটি ‘সংরক্ষিত আসন’ হয়ে উঠতে পারে। এসব আসন রাজনৈতিক দলগুলোর কেনাবেচার বিষয় হয়ে উঠলে উচ্চকক্ষ গঠনের উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা হারাবে। যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পর পরবর্তী নির্বাচন থেকে তা কার্যকর করা হোক।
এনপিএ প্রতিনিধিরা নির্বাচনপরবর্তী সময়ে সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করে রাজনৈতিক দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানান। মুঠোফোন নিয়ে ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের যেতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনেরও আহ্বান জানান নির্বাচন কমিশনের প্রতি।
তবে সার্বিকভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে এনপিএর অবস্থান তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবে সীমাবদ্ধতা থাকলেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হলেও রাজনৈতিক দলগুলো পরবর্তী সময়ে সংস্কার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করতে পারে বা পুরো প্রক্রিয়াটি আইনি বৈধতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে ‘না’ জয়যুক্ত হলে সংস্কার প্রশ্নটিকেই ক্ষমতাসীনেরা কার্যত বাতিল করে দেবে। এই আশঙ্কাতেই এনপিএ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন এনপিএর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য কাউসার শাকিল, কৌশিক আহমাদ, মীর হুযাইফা আল মামদূহ, শামীম আরা নীপা ও বাকি বিল্লাহ।