২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদন
২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদন

ফিরে দেখা

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের বিপুল বিজয়, নেপথ্যে কী কী ছিল

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবার হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও ক্ষমতায় ফিরেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের সেই সরকারের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের শাসন নিয়ে আলোচনায় বড় জায়গা করে নেয় সন্ত্রাসের নানা ঘটনা। সেই বাস্তবতার মধ্যে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়েছিল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ চারদলীয় জোট।

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনের ২১৬টিতে জয় পায় চারদলীয় জোট। এর মধ্যে ৪০ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৯৩ আসন পায় বিএনপি। ১০ অক্টোবর তিনি শপথ নিয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনসহ তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন খালেদা জিয়া।

ওই নির্বাচনে বিএনপির জোটসঙ্গী জামায়াত ১৭টি, জাতীয় পার্টি (নাজিউর) ৪টি ও ইসলামী ঐক্যজোট পেয়েছিল ২টি আসন। অন্যদিকে ৪০ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ৬২টি আসনে জয় পায় আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচনে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৪টি আসন পেয়েছিল। ভরাডুবি হয়েছিল বামধারার দলগুলোর।

১৯৯৬ সালের জুনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪৬টি আসন পাওয়া আওয়ামী লীগ ২০০১ সালের নির্বাচনে তার অর্ধেকেরও কম আসন পায়। আর আগের নির্বাচনে ১১৬ আসন পাওয়া বিএনপির আসন বেড়েছিল ৭৭টি। অবশ্য শতাংশের হিসাবে দুই দলেরই ভোট বেড়েছিল। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৩৩ দশমিক ৪০ শতাংশ ও আওয়ামী লীগ ৩৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে।

এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানকে প্রধান উপদেষ্টা করে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন। এর আগে নব্বইয়ের দশকে ব্যাপক আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দেশে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৯৬ সালের জুনে। ২০০১ সালের নির্বাচনটি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন দ্বিতীয় নির্বাচন। এর বাইরে ১৯৯১ সালে বিশেষ পরিস্থিতিতে গঠিত প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীন পঞ্চম সংসদ নির্বাচন হয়।

চারদলীয় জোটের এই বিপুল জয়ের পেছনে আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের অসন্তোষের পাশাপাশি বিএনপির ‘সফল’ জোট গঠন এবং আওয়ামী লীগবিরোধী ভোটের বিভক্তি কমানোকে ফল নির্ধারণের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল বিভিন্ন বিশ্লেষণে।

ওই নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তখনকার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের এই ‘নাটকীয় পরাজয়ের’ নেপথ্যে ছিল আইনশৃঙ্খলাজনিত দুর্বলতা ও বিএনপির অধিক সফল জোট গঠন। এ ছাড়া ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে এক বক্তৃতায় বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বলেছিলেন, ‘২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের রাজনৈতিক জোট পরবর্তী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনী ফলাফলের ওপর বড় ধরনের পরিবর্তনশীল প্রভাব ফেলেছিল। এই জোট দেশে ইসলামপন্থী-ডানপন্থী বনাম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী-বামপন্থী রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও গভীর ও কঠোর করে তুলেছিল।’

২০০১ সালের নির্বাচনের দুই দিন পর ‘আওয়ামী লীগ হারল কেন?’ শিরোনামে প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, নির্বাচনের ফলাফলে দলীয় বিপর্যয়ের জন্য কোনো ষড়যন্ত্র বা কারচুপির সন্দেহ প্রকাশ করলেও দলের কিছু কৌশল ও ভুলত্রুটির মূল্যায়নও শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। এর মধ্যে বেশি আলোচিত হচ্ছে মন্ত্রী-এমপিপুত্রদের সৃষ্ট সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়গুলো। এ ছাড়া নির্বাচন পরিচালনায় দলের প্রভাবশালী নেতা-মন্ত্রীদের সম্পৃক্ত না থাকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

ফেনীতে সাংবাদিককে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেওয়া, নারায়ণগঞ্জে ব্যবসা ও পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে লিখলে কিংবা তাঁদের বিরোধিতা করলে হামলা-হুমকি—এ ধরনের নানা ঘটনা আওয়ামী লীগের মেয়াদের শেষ দিকে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। ২০০১ সালে লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে অভিযান শুরু করলে পালিয়ে যান আওয়ামী লীগের ‘গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত জয়নাল হাজারী, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, শামীম ওসমান, আবু তাহেরসহ সন্ত্রাসীরা।

অবশ্য অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করেছিল। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটেছিল।

‘স্থূল কারচুপির’ অভিযোগ শেখ হাসিনার

সংসদ নির্বাচনের পর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুই দলই নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলেছিল। সেই সময়ের পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক মোজাফফর হোসেন পল্টু নির্বাচনকে ‘দৃশ্যত অবাধ ও শান্তিপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে কোথাও কোথাও সহিংসতা, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব, সংখ্যালঘু ও নারীদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধাদান, জোরপূর্বক পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া ইত্যাদি অনিয়মের অভিযোগ করেন।

একই দিন ঢাকার একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র বলেন, অভিনব পদ্ধতিতে ‘বুথ জ্যামিংসহ’ বিভিন্ন উপায়ে একটি রাজনৈতিক দল ভোট কারচুপি করেছে। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্র দখল, চারদলীয় প্রার্থী-সমর্থক ও পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। একটি দলের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করায় সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি।

নির্বাচনের পরদিন ঢাকার হোটেল শেরাটনে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানান আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে সূক্ষ্ম নয়, অত্যন্ত স্থূল কারচুপি করে নির্বাচনের ফলাফল বদলে দেওয়া হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন একযোগে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করেছে।

একই দিন একই হোটেলে পৃথক সংবাদ সম্মেলনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশ থেকে সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দূর করতে আওয়ামী লীগসহ সব দলের সহযোগিতা চান। নির্বাচনকে ‘শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু পরিবেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন’ বলে আখ্যা দেন তিনি।

আন্দোলনের ঘোষণা, অতঃপর...

পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০০১ সালের ১৫ জুলাই লতিফুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লতিফুর রহমান ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োগ দেন। সেই রাতেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ ২৪ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে বদলি করে দেন। সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কিছু না বলা হলেও ১৬ আগস্ট শেখ হাসিনা গণভবন ছেড়ে নিজ বাড়িতে চলে যান।

নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করতে থাকেন। ৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘শপথ নেব না, সংসদে যাব না, পুনর্নির্বাচন চাই।’ নির্বাচনের ফলাফল বাতিলের দাবিতে ৫ থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বিক্ষোভ ও ১০ অক্টোবর অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি। এর মধ্যে পুনর্নির্বাচনের দাবি না মানা হলে ১১ অক্টোবর থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা। অবশ্য তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, ‘নির্বাচনের ফলাফল বাতিলের প্রশ্নই ওঠে না।’

এর মধ্যে আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। ২০০১ সালের ৫ অক্টোবর প্রথম আলোর প্রধান খবরের শিরোনাম ছিল ‘আন্দোলন নিয়ে আ.লীগে দ্বিধাদ্বন্দ্ব’। সেখানে বলা হয়, দলের ভরাডুবি পর্যালোচনার জন্য ৪ অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী আওয়ামী লীগের সব প্রার্থী ও জেলা পর্যায়ের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের একটি সভা হয়েছে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে। শেখ হাসিনা নির্বাচনের ফলাফল বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের আহ্বান জানালেও দলের জেলা পর্যায়ের নেতারা তাতে তেমন সাড়া দেননি।

নির্বাচনের পর বিএনপি দ্রুত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ ও সরকার গঠন করতে চাইছিল। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করান স্পিকার। তখন স্পিকার ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা আবদুল হামিদ। প্রথমে সম্মত হলেও ৫ অক্টোবর রাতে তিনি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের আশঙ্কা জানিয়ে শপথ পড়াতে অসম্মতি জানান।

এদিন সকালে ধানমন্ডিতে শেখ হাসিনার বাসভবনে তাঁর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ হয়। চার দূত শেখ হাসিনাকে নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে সংসদে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তবে শেখ হাসিনা তাঁদের প্রস্তাবে সাড়া দেননি। সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারও শেখ হাসিনাকে সংসদ বর্জন না করার আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনার অনড় অবস্থান নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল বিএনপির মধ্যে উদ্বেগ ছিল। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা সংসদে যাবেন না—এমন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির দুজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।

এ পরিস্থিতির মধ্যে সংসদ সদস্যদের শপথ পিছিয়ে ৯, ১০ ও ১১ অক্টোবর করার সিদ্ধান্ত হয়। ৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় শেরাটন হোটেলে এক সভায় শেখ হাসিনার উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, ‘সংসদে আসুন। প্রয়োজনে যেকোনো জায়গায় বসে আলোচনা করতে আমার অসুবিধা নেই।’ পরদিন শাহবাগে সাংবাদিকদের কাছে খালেদা জিয়ার আহ্বানের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়ায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘আগে উনি (খালেদা জিয়া) তাঁর গুন্ডা বাহিনী সামাল দেন, তারপর আলোচনার প্রশ্ন।’

এর মধ্যে ৯ অক্টোবর সকালে খালেদা জিয়াসহ ১৯৭ জন সংসদ সদস্য শপথ নেন। এদিনও খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগকে সংসদে আসার আহ্বান জানান। সেদিন বিকেলে হোটেল শেরাটনে সংবাদ সম্মেলন করে ‘নির্বাচনে কারচুপি প্রমাণিত’ বলে দাবি করে শেখ হাসিনা আবারও বলেন, নীলনকশা করে পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগকে হারানো হয়েছে।

খালেদা জিয়ার সরকার গঠন নিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদন

১০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খালেদা জিয়া। তাঁর সঙ্গে শপথ নেয় ৬০ সদস্যের মন্ত্রিসভা। এদিন আওয়ামী লীগের অর্ধদিবস অবরোধ কর্মসূচি থাকলেও সেটি পালিত হয়নি। ১১ অক্টোবর মন্ত্রিসভার দপ্তর বণ্টন হয়। অন্যদিকে শেখ হাসিনা সভা-সমাবেশ ও রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ অব্যাহত রাখেন।

সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে কাজ শুরু করে দিয়েছিল। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন কি না, এ নিয়ে ২২ অক্টোবর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভা বসে। বিকেল চারটা থেকে আটটা পর্যন্ত সভা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। পরদিন আবারও সভা হয়। সেই সভার পর শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভোটারদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং দেশের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে আমরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে এই মুহূর্তে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেব না। আমরা তাদের আচার-আচরণ লক্ষ করে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেব।’

এর পরদিন (২৪ অক্টোবর) আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা শপথ নেন। শপথের পর আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেত্রী নির্বাচিত হন। ২৮ অক্টোবর সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হলেও তাতে যোগ দেয়নি বিরোধী দল। এদিন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাদের সংসদে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। আওয়ামী লীগ অধিবেশনে যোগ দেয় ২০০২ সালের ২৪ জুন।

বিপর্যয়ের পর আবার উত্থান

বিএনপি ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রপতি করেছিল দলের প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে। কিন্তু দলের অভ্যন্তরে চাপ ও সমালোচনার মুখে ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। বিরোধীদলীয় নেত্রীর ওপর হামলা, জেএমবির উত্থান, ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলাসহ নানা ঘটনায় সমালোচিত হয়েছিল বিএনপির সেই শাসনামল।

২০০৪ সালে বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানোর কারণে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন প্রভাবিত করার অভিযোগ ওঠে। বিচারপতি কে এম হাসানের দায়িত্ব নেওয়া নিয়ে বিরোধ, পরে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ এবং নির্বাচন কমিশন ও ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধ দেশকে সংঘাতের দিকে নিয়ে যায়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচন বর্জন করে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা হস্তক্ষেপে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়, নির্বাচন স্থগিত হয়। রাজনীতিতে এটি ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে পরিচিত। ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টা করে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। ওই সরকারের ‘সংস্কার’ ও ‘মাইনাস টু’ উদ্যোগের মধ্যে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দুজনই গ্রেপ্তার হন। সে সময় বিএনপি, আওয়ামী লীগ দুই দলের নেতারাই ভুক্তভোগী হয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানকে (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) নির্যাতনের ঘটনা বেশ আলোচিত হয়েছিল। তাঁকে দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে চলে যেতে হয়েছিল। সংস্কারপন্থীদের উত্থানসহ ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নানা ঘটনায় বিএনপি তখন বেশ বিপর্যস্ত হয়।

ওই সরকারের অধীন ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিএনপিকে আরও বিপর্যয়ে ফেলে। আওয়ামী লীগের ২৩০ আসনের বিপরীতে বিএনপি পায় মাত্র ৩০টি। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর ভর করে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের শাসনকে দীর্ঘায়িত করতে সক্ষম হয়। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগপর্যন্ত—এই সাড়ে ১৫ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। এ সময় বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন নেমে আসে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেও জেলে পাঠায় আওয়ামী লীগ সরকার।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর আবারও ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসে বিএনপি। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে এখন সরকার পরিচালনা করছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে ২০৯ আসন পেয়েছে বিএনপি।

বিএনপির ইতিহাস নিয়ে ‘বিএনপি সময়-অসময়’ নামে বই লিখেছেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা সরকার নিজের পছন্দমতো প্রশাসন সাজিয়েছিল। কিন্তু লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেই ২৪ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে বদলি করে দেয়। এতে শেখ হাসিনা রুষ্ট হয়েছিলেন, তাঁর সাজানো বাগান বুঝি ভেঙে গেল। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি ১৯৯১ সালের পর সবচেয়ে বেশি আসন নিয়ে ক্ষমতায় গেল। এটা সম্ভব হয়েছিল সদ্য সাবেক আওয়ামী লীগ আমলের কুশাসনের কারণে। কিন্তু ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসা বিএনপির মধ্যেও সুশাসন দেওয়ার উপলব্ধিটা দেখা যায়নি।

বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে ম্যানিপুলেট করে পছন্দের লোককে প্রধান উপদেষ্টা বানাতে সংবিধান সংশোধন করে বিচারপতিদের বয়স বাড়ানো, এসব নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক বিরোধ তুঙ্গে ওঠা, রাজপথে মারামারি-কাটাকাটি এবং শেষ পর্যন্ত ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ কথা উল্লেখ করে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ওয়ান-ইলেভেনকে ডেকে এনেছিলেন রাজনীতিবিদেরাই, তাঁরাই এর জন্য দায়ী। আবার সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকারও হয়েছেন রাজনীতিবিদেরাই। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেন থেকে তাঁরা কোনো শিক্ষা নিয়েছেন বলে তাঁদের আচরণ দেখে মনে হয় না।