
১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছিলেন প্রার্থীরা।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট নির্বাচন বর্জন করেছিল।
আওয়ামী লীগ ২৪৭টিতে প্রার্থী দিয়ে ২৩৪টি আসন পায়।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন প্রথম আলোর ছাপা পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘ঢাকা-১৮-তে মিনিটে ১৮ ভোট’।
ঢাকা-১৮ আসনের (উত্তরা) একটি কেন্দ্র কাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভোট গ্রহণের দিন সেখানে দিনভর ছিলেন প্রথম আলোর একজন প্রতিবেদক। তিনি লিখেছেন, সারা দিন কেন্দ্রটি ছিল প্রায় ফাঁকা। ভোট গ্রহণ সময়ের শেষ দেড় ঘণ্টায় তিনি শ দেড়েক লোককে কেন্দ্রে যেতে দেখেছেন। কিন্তু শেষ দেড় ঘণ্টায় ভোট গ্রহণ দেখানো হয় ১ হাজার ৫৮৩টি।
ভোটের পরদিন প্রথম আলোর ছাপা পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘জাল ভোট, কলঙ্কিত নির্বাচন’। কলঙ্ক শুধু জাল ভোটের নয়, এই প্রথম বাংলাদেশে একটি নির্বাচন হলো, যেখানে অর্ধেকের বেশি, ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছিলেন প্রার্থীরা।
কলঙ্ক শুধু জাল ভোট ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় নয়, ভোটের দিন ব্যাপক সহিংসতা হয়েছিল, মারা গিয়েছিলেন অন্তত ১৯ জন। প্রথম আলোর খবরে বলা হয়েছিল, ভোটের দিন এত মানুষের প্রাণহানির ঘটনা আগে ঘটেনি। ৩ জানুয়ারি রাত থেকে ভোটের আগের দিন রাত ১০টা পর্যন্ত হিসাবে ১১১ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া হয়, যেগুলোতে ভোটকেন্দ্র করা হয়েছিল। আরও ১০০ কেন্দ্রে হামলা ও ব্যালট ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
কলঙ্কের দিক আরও একটি ছিল। সেটি হলো, ‘আমরা’ আর ‘মামুরা’ ধরনের নির্বাচনটিতে অংশ নিয়েছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের গৃহপালিত দলগুলো। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সেই নির্বাচন বর্জন করেছিল। আসলে আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে বিরোধীদের ভোট থেকে দূরে রাখার কৌশল নিয়েছিল। কারণ, আওয়ামী লীগ সরকারের জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছিল। ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর প্রথম আলোর জনমত জরিপ ধরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এখন নির্বাচন হলে ৫০ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে চান। আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে চান সাড়ে ৩৫ শতাংশ মানুষ।
হেরে যাওয়ার আশঙ্কায় আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পথে হাঁটেনি। একতরফা ও পাতানো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ‘গণতন্ত্রের মুখোশে স্বৈরতন্ত্রের’ যাত্রা শুরু হয়।
গণতন্ত্রের মুখোশে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করার কৌশলটি পুরোনো। সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফেলো আন্দ্রেস শেডলার তাঁর ‘দ্য মেনু অব ম্যানিপুলেশন’ নিবন্ধে (২০০২) দেখিয়েছেন, আধুনিক একনায়ক শাসকেরা সরাসরি গণতন্ত্রকে অস্বীকার করেন না। বরং তাঁরা নির্বাচন আয়োজন করেন; কিন্তু এমনভাবে, যেখানে ফল সব সময় তাঁদের পক্ষে যায়।
একনায়ক শাসকদের ‘ম্যানিপুলেশন’ বা কারসাজির ‘মেনু’র মধ্যে থাকে ভোটারদের ভোট দেওয়া থেকে দূরে রাখা, বিরোধী প্রার্থীদের নির্বাচনের বাইরে রাখা, সুযোগের অসমতা, ভয়ভীতি দেখানো, ভোট চুরি, ফলাফল জালিয়াতি, নির্বাচন-পরবর্তী প্রশাসনিক বাধা ইত্যাদি।
আমরা দেখতে পাই, ২০১৪ সাল ও পরের দুই জাতীয় নির্বাচনে প্রায় সব কটি কৌশল প্রয়োগ করেছিল আওয়ামী লীগ—২০১৪ সালে তারা ১৫৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনতা নিশ্চিত করে ভোটারদের সিদ্ধান্ত নিতে দেয়নি, বিএনপি ও জামায়াতকে নির্বাচনের বাইরে রেখেছিল, নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতি হয়েছিল এবং পরে বিএনপি ও জামায়াতের আন্দোলন দমন করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে। করা হয়েছিল হাজার হাজার মামলা।
ভোটের আগে
আন্দ্রেস শেডলারের ‘দ্য মেনু অব ম্যানিপুলেশন’ নিবন্ধে যে ‘সুযোগের অসমতা’ কৌশলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার প্রয়োগ আওয়ামী লীগ শুরু করে ২০১৪ সালের নির্বাচনের অনেক আগে। বড় কৌশল ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল।
বাংলাদেশে যে কয়টা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে, তা হয়েছে নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের অধীন। ২০০৯ সালের ৭ জানুয়ারি দায়িত্ব নেওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের ঠিক এক বছরের মাথায় ২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। এরপর একই বছরের ২১ জুলাই তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির কাজ যখন শেষের দিকে, তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আপিল বিভাগ একটি সংক্ষিপ্ত ও বিভক্ত আদেশ দেন। তাতে বলা হয়েছিল, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী প্রসপেক্টিভলি অর্থাৎ ভবিষ্যতের জন্য বাতিল ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলো। তাতে আরও বলা হয়েছিল, দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রেখেই সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ তৈরি করেছিল। তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে একটি বৈঠকের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাদ দিয়ে এবং নির্বাচনের সময় সংসদ বহাল রাখার বিধান প্রস্তাব করে সুপারিশ চূড়ান্ত করে বিশেষ সংসদীয় কমিটি। এটি নিয়ে কমিটির সদস্যদের কারও কারও অসন্তোষ ছিল।
২০১২ সালে আপিল বিভাগের বিস্তারিত রায় প্রকাশ করা হয়। তবে এর আগে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাস হয়, যার মাধ্যমে বাতিল হয়ে যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। যদিও চূড়ান্ত রায়ে পরের দুই সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন করার কথা আর বলেননি আদালত।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন চালাতে থাকে। দুই প্রধান দলের বিপরীতমুখী অবস্থানের মধ্যে ২০১৩ সালের শেষ দিকে মধ্যস্থতায় যুক্ত হয় জাতিসংঘ। সংস্থাটির রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো তখন ঢাকায় এসেছিলেন এবং তাঁর মধ্যস্থতায় সমঝোতার বৈঠক হয়েছিল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আওয়ামী লীগের তখনকার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে দল দুটির নেতাদের মধ্যে। সমঝোতা অবশ্য হয়নি।
দুই দলের মধ্যে যখন আলোচনা চলছে, তখন একতরফা নির্বাচনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এতে স্পষ্ট হয়ে যায়, রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়ে তাদের আগ্রহ নেই। যেমন তারানকোর সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের পরদিন ১২ ডিসেম্বর (২০১৩) জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদকে ‘আটক’ করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যায় র্যাব। কারণ, এরশাদ নির্বাচনে যেতে চাইছিলেন না।
এর আগে অনেক নাটক হয়েছে। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়াই প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদ ২৫ নভেম্বর (২০১৩) তফসিল ঘোষণা করেন। জাতীয় পার্টি ২৪৮ আসনে প্রার্থী দেয়। তবে ৩ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টি জানায়, তারা নির্বাচন করবে না। তখন ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে আসেন, তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার পাশাপাশি এরশাদের বাসায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন। এরশাদ ৪ ডিসেম্বর ব্রিফিংয়ে বলেন, সুজাতা সিং তাঁকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করেছেন এবং বলেছেন, শেখ হাসিনা অনেক ভালো কাজ করছেন।
এরশাদ এও জানান, নির্বাচনে অংশ নেবেন না। গ্রেপ্তারের চেষ্টা হলে আত্মহত্যা করবেন। পরে র্যাব এরশাদকে সিএমএইচে নিয়ে যায়। নেপথ্যে ছিল প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা পরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) কয়েক জন কর্মকর্তা। অন্যদিকে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নেয় জাতীয় পার্টির একাংশ। বাকি অংশ মনোনয়ন প্রত্যাহারের আবেদন করেছিল, তবে তা গৃহীত হয়নি। ফলে নির্বাচনে রয়ে যায় জাতীয় পার্টি।
তখনকার সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা একসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করেছিলেন। তিনিই এ প্রশ্নে নিজের অবস্থান পুরোপুরি বিপরীত করে ফেলেন। তিনি ১৯৯৬ সালের ১ জানুয়ারি বলেছিলেন, ‘সব দল যাতে একটি অর্থবহ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে, সে জন্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে।’ ২০১৪ সালের ২ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি বলেন, ‘একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কোনো অনির্বাচিত ব্যক্তির অধীনে নয়।’
ভোটের দিন
৫ জানুয়ারি ২০১৪। ১৪৭টি আসনে ভোটের দিন। ভোট দিতে পারবেন ৪ কোটি ৩৯ লাখের মতো ভোটার। বাকি ৪ কোটি ৮০ লাখের ভোট দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, তাঁদের ভোট ছাড়াই প্রার্থী জয়ী হয়ে গেছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ভোটের সুযোগহীন ভোটারদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও শেখ হাসিনা।
ভোটের উৎসব নেই। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কার্যত গৃহবন্দী। গুলশানে তাঁর বাসা ঘেরাও করে রাখা হয়েছে বালুর ট্রাক দিয়ে। এরশাদ মূলত আটক। দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা হচ্ছে। তফসিল ঘোষণার পর ৪০ দিনে নিহতের সংখ্যা অন্তত ১২৩ ছাড়িয়েছে। নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৪০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে মাত্র ১২টি।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি চলছে। দূরপাল্লার যানবাহন চলে না বললেই চলে। এর মধ্যে নির্বাচনের খবর সংগ্রহের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম ঝিনাইদহে, ৩ জানুয়ারি রাতে, উত্তরা ইউনিক পরিবহনের একটি বাসে। মনে আতঙ্ক, বাসে আগুন দেওয়ার ভয়। পাশে সহযাত্রী ছিলেন গরু ব্যবসায়ী আনসার আলী। তাঁর কাছে জানতে চাইলাম ভোট দিতে যাবেন কি না। উত্তরে তিনি জানতে চাইলেন, ‘ভোট জানি কবে?’
ভোটের দিন আমি ছিলাম ঝিনাইদহ-৩ আসনে (মহেশপুর-কোটচাঁদপুর)। ব্যাপক সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের মধ্যে সেখানে ১৪৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ২০টির ভোট গ্রহণ স্থগিত হয়। ভোটার উপস্থিতি খুবই কম ছিল। যদিও দিন শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকে জানানো হয়, আসনটিতে ভোট পড়েছে ১৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
ঝিনাইদহ-৩ আসনের মতো অনেক আসনে সহিংসতা হয়। পরদিন প্রথম আলোর খবরে বলা হয়, ভোটের দিন নিহত হয়েছেন ১৯ জন। ১৫ জনই মারা গেছেন পুলিশের গুলিতে। সহিংসতার কারণে দেশজুড়ে ৫৩৯টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত হয়। বিএনপি তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেছিল, প্রহসনের নির্বাচন জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটি অবরোধ কর্মসূচির মধ্যেই দুই দিনের হরতাল ডাকে।
নেসার আমিন সম্পাদিত বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ও ফলাফল বই অনুযায়ী, ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৪৭ আসনে প্রার্থী দিয়ে ২৩৪টি ও জাতীয় পার্টি ৮৬ আসনে প্রার্থী দিয়ে ৩৪টি আসন পেয়েছিল। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পাটি ৬, জাসদ ৫, বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন ২, জাতীয় পার্টি (জেপি) ২ ও বিএনএফ ১টি আসন পেয়েছিল। স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন ১৬টি আসনে, যাঁদের বেশির ভাগ আওয়ামী লীগ নেতা।
১৪৭ আসনে ভোট পড়েছিল গড়ে ৪০ শতাংশ। উল্লেখ্য, ওই বছর মোট ভোটার ছিলেন ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষ। তাঁদের মাত্র ১ কোটি ৭৪ লাখ ভোট দিয়েছিলেন, যা মোট ভোটারের ২০ শতাংশ। আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৫৭ হাজার ভোট, যা মোট ভোটারের ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মধ্যে ছিল প্রচুর জাল ভোট।
ভোটের পরে
ভোটের পরদিন ৬ জানুয়ারি গণভবনে শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেখানে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘আগামী নির্বাচন নিয়ে আপনি আলোচনার কথা বলেছেন, তাহলে কি খুব শিগগির মধ্যবর্তী নির্বাচন আয়োজনের কথা বলছেন?’ জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি বলেছি, আগামী নির্বাচন। আগামী যখনই আসবে, নির্বাচন হবে।...তারপরও আমরা জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে সবার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। তবে এটা নির্ভর করে বিএনপির নেত্রীর ওপর।’
রাজনীতিতে আলোচনা আছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে জাতিসংঘ ও পশ্চিমাদের আওয়ামী লীগ কথা দিয়েছিল, দ্রুত আরেকটি নির্বাচন আয়োজন করা হবে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ২০১৪ সালের ৬ জানুয়ারি ‘সহিংসতা বন্ধ হলে নতুন নির্বাচনের ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আওয়ামী লীগ নেতারাও স্বীকার করছেন, জনগণের ‘ম্যান্ডেট’ পেতে আরেকটি ভোট আয়োজন করা জরুরি।
সরকার গঠনে আওয়ামী লীগ বিস্ময়কর ঘটনা ঘটায়। জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল বানায়, আবার সরকারেও অংশ করে নেয়। এরশাদকে করা হয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত, তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদ হন বিরোধীদলীয় নেতা এবং এরশাদের দলের তিনজন নেতা হন মন্ত্রী (আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু ও মসিউর রহমান রাঙ্গা)। এ নিয়ে ১৩ জানুয়ারি প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘থাকল না গণতন্ত্রের পাহারাদার’। প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মতামত নেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘বিরোধী দল যদি সরকারে ঢুকে যায় তাহলে গণতন্ত্র পাহারা দেবে কে?’
নির্বাচনের পর জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও কমনওয়েলথ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং এশিয়ান হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন সংগঠন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে ভারত বলেছিল, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল আবশ্যক।
২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি ইউরোপীয় পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সব রাজনৈতিক দল একমত হলে আগামী নির্বাচনসহ সব ধরনের বিকল্প বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
১০ বছর পর
অবশ্য সরকার দেশি-বিদেশি আপত্তি আমলে নেয়নি। ভোটের পর সরকারের দমন-পীড়নের মুখে বিএনপি ও জামায়াতের আন্দোলন আর জোরদার থাকেনি। এরপর ২০১৮ সালে ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালে ‘ডামি নির্বাচন’ করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকেছে।
গণতন্ত্রের মুখোশ পরা স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতন কীভাবে হয়, তা-ও ব্যাখ্যা করেছেন গবেষক আন্দ্রেস শেডলার। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে কারচুপি করা শাসকগোষ্ঠী ততক্ষণই টিকে থাকে যতক্ষণ তারা জনগণকে এটি বিশ্বাস করাতে পারে যে ‘প্রতিবাদ করে লাভ নেই’। যখন কোনো একটি আন্দোলনের মাধ্যমে এই ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ ভেঙে যায়, তখন একটি ‘ক্যাসকেড ইফেক্ট’ তৈরি হয়, অর্থাৎ যারা আগে ভয়ে ঘরে বসে ছিল, তারা রাস্তায় নেমে আসে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সেটাই দেখা গেছে এবং এই শিক্ষা সবার জন্য।