ধর্ম-দর্শন

রাষ্ট্রক্ষমতা কি অধিকার, না আমানত

রাষ্ট্রক্ষমতা অনেকের কাছে সম্মান, প্রভাব কিংবা কর্তৃত্বের প্রতীক। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য কি ক্ষমতার প্রদর্শনে, নাকি মানুষের কল্যাণে? 

ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্ব ক্ষমতা ভোগের উপায় নয়; এটি একটি মহান আমানত, কঠিন পরীক্ষা এবং পরকালে জবাবদিহির বিষয়। কারণ, একজন রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কল্যাণকে প্রভাবিত করে।

তাই ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনে উন্নয়নের প্রকৃত লক্ষ্য কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি বৃদ্ধি নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা যেন আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করো।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮)

এই আয়াত রাষ্ট্রক্ষমতার মৌলিক দর্শন স্পষ্ট করে দেয়। ক্ষমতা কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি জনগণের আমানত। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি সিদ্ধান্তে ন্যায়বিচার, সততা ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম দায়িত্ব হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং সব ধরনের অন্যায় থেকে বিরত থাকা (মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩৫, পৃ. ৩৬৪)

ইমাম কুরতুবি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, শাসনক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব জনকল্যাণমূলক দায়িত্ব এই ‘আমানত’-এর অন্তর্ভুক্ত।

ইসলামি অর্থনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যাতে সম্পদ তোমাদের মধ্যকার কেবল ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সুরা হাশর, আয়াত: ৭)

অর্থাৎ অর্থনৈতিক কাঠামো এমন হতে হবে, যাতে সম্পদ ও সুযোগ কেবল একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়; বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষ ন্যায্য অংশীদার হতে পারে।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য নেতৃত্বে জবাবদিহি অপরিহার্য। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। শাসকও একজন দায়িত্বশীল এবং তিনি তাঁর অধীনদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৫৪)

তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। শাসকও একজন দায়িত্বশীল এবং তিনি তাঁর অধীনদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৫৪

একজন শাসক যখন উপলব্ধি করবেন যে প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে, তখন ক্ষমতা ব্যক্তিস্বার্থের নয়, জনসেবার মাধ্যম হয়ে উঠবে।

রাষ্ট্র পরিচালনার আরেকটি মৌলিক নীতি হলো যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন। কোরআনে নবী ইউসুফের ঘটনা এ বিষয়ে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি মিসরের শস্যভান্ডারের দায়িত্ব চেয়ে বলেছিলেন, ‘আমাকে দেশের ভান্ডারের দায়িত্ব দিন; নিশ্চয়ই আমি বিশ্বস্ত ও দক্ষ।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৫)

লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি বংশ, গোত্র বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা বলেননি; বরং নিজের সততা ও দক্ষতার কথা উল্লেখ করেছেন। এখান থেকেই বোঝা যায়, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আত্মীয়তা, দলীয় পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত আনুগত্য নয়; যোগ্যতা, আমানতদারি ও দক্ষতাই হওয়া উচিত প্রধান মানদণ্ড।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও ইসলামি শাসনব্যবস্থার অপরিহার্য ভিত্তি। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তাদের থামাও, নিশ্চয়ই তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত: ২৪)

এই শিক্ষা শুধু পরকালের জবাবদিহির নয়; বরং দুনিয়ার প্রশাসনিক সংস্কৃতিরও ভিত্তি।

ইসলামি সভ্যতায় এই নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল ‘হিসবাহ’ ব্যবস্থার মাধ্যমে। বাজার তদারকি, সরকারি কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, জনস্বার্থ রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে হিসবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

আধুনিক অডিট বা ওমবাডসম্যান (Ombudsman) ব্যবস্থার সঙ্গে এর কিছু সাদৃশ্য থাকলেও হিসবাহর বিশেষত্ব ছিল, এটি কেবল আইনি জবাবদিহির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির নৈতিক চেতনাকেও সমান গুরুত্ব দেয়।

এই জবাবদিহির সংস্কৃতির বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনামলে। এক ব্যক্তি তাঁকে প্রকাশ্যে বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহকে ভয় করুন।’ উপস্থিত একজন এতে আপত্তি করলে ওমর (রা.) তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তাকে বলতে দাও; সে খুবই উত্তম কথা বলেছে।’

এরপর তিনি সেই ঐতিহাসিক উক্তি করেন, ‘তোমাদের মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, যদি তোমরা আমাদের এ কথা না বলো; আর আমাদের মধ্যেও কোনো কল্যাণ নেই, যদি আমরা তোমাদের কাছ থেকে এ কথা গ্রহণ না করি।’ ( ইবনুল জাওযি, আবুল ফারাজ, মানাকিবু আমিরিল মু’মিনিন উমর ইবনিল খাত্তাব, বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১৫৫)

তিনি আরও বলতেন, ‘আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি দয়া করুন, যে আমার কাছে আমার ত্রুটিগুলো উপহার হিসেবে তুলে ধরে।’ (আওয়াইদাহ, মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন মুহাম্মাদ, ফাসলুল খিতাব ফিয্-যুহদি ওয়ার রাকাইক ওয়া আদাব, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৬১)

এই দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় সমালোচনা দমন নয়; বরং গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করাই একজন ন্যায়পরায়ণ শাসকের বৈশিষ্ট্য।

নেতৃত্ব যদি আমানত হিসেবে বিবেচিত হয়, নিয়োগ যদি যোগ্যতার ভিত্তিতে হয় এবং রাষ্ট্র যদি জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ও জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, তবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ ও টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

এ কারণেই রাষ্ট্রের প্রতিটি নিয়োগ, প্রকল্প, রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয় এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে জনগণের কাছে তার হিসাব স্পষ্ট থাকে। 

দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অপচয় কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে কার্যকর নিরীক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।

তবে ইসলামি রাষ্ট্রদর্শন রাষ্ট্রকে প্রতিটি ক্ষুদ্র কাজে হস্তক্ষেপের নির্দেশ দেয় না। বরং রাষ্ট্রের প্রধান ভূমিকা হলো এমন সব কৌশলগত ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করা, যা ব্যক্তি বা বেসরকারি উদ্যোগের পক্ষে এককভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। জাতীয় নিরাপত্তা, অবকাঠামো, খাদ্য ও জ্বালানিনিরাপত্তা, প্রযুক্তি, গবেষণা, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব।

এ প্রসঙ্গে কোরআনের নির্দেশনা হলো, ‘তোমরা তাদের মোকাবিলার জন্য যথাসম্ভব শক্তি প্রস্তুত করো।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৬০)

এই ‘শক্তি’ কেবল সামরিক শক্তি নয়; বরং অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, প্রশাসনিক দক্ষতা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং উৎপাদনশীলতার সমন্বিত রূপ।

সমকালীন ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. আবদুল মুহসিন আত-তুরাইকি উল্লেখ করেছেন, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে উৎপাদন, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। (আল-ইকতিসাদুল ইসলামী: উসুস ওয়া মাবাদিউ ওয়া আহদাফ, পৃ. ৪৮)

আজ যখন বিশ্বের বহু দেশে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্য রাষ্ট্র পরিচালনার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন ইসলামি রাষ্ট্রনীতির এই মৌলিক নীতিগুলো নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। নেতৃত্ব যদি আমানত হিসেবে বিবেচিত হয়, নিয়োগ যদি যোগ্যতার ভিত্তিতে হয় এবং রাষ্ট্র যদি জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ও জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, তবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ ও টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

ইসলামের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত মর্যাদা ক্ষমতা ভোগে নয়; বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকার রক্ষা, সমালোচনা গ্রহণের সাহস এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত।

  • মুফতি আহসানুল ইসলাম : সহকারী প্রধান ও নায়েবে মুফতি: সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিকস স্টাডিজ, ঢাকা