সিরাত

তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে নবীজির কালজয়ী ৭ পদক্ষেপ

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যায়, ইসলামের প্রথম যুগের বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তরুণ সাহাবিরাই পালন করেছেন। আলী ইবনে আবি তালিব, মুসআব ইবনে উমাইর, ওসামা ইবনে জায়েদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর মতো তরুণেরা নবীজির হাতে গড়ে উঠেছিলেন।

তাঁদের কেউ ছিলেন আলেম, কেউ প্রচারক, কেউ প্রশাসক, কেউ সেনাপতি। তাঁদের যোগ্যতা এক ছিল না। দায়িত্বও এক ছিল না। কিন্তু প্রত্যেকের মধ্যে রাসুল (সা.) এমন কিছু দেখেছিলেন, যা অন্যরা হয়তো তখনো দেখতে পায়নি।

তরুণদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাই মহানবীর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত বাস্তবমুখী। তিনি উপদেশ দিয়েছেন, আবার দায়িত্বও দিয়েছেন। ভুল শুধরে দিয়েছেন, আবার আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছেন। ইমান তৈরি করেছেন, আবার সেই ইমানের বাস্তব প্রয়োগের সুযোগও দিয়েছেন।

১. ভালোবাসার মাধ্যমে তরুণের হৃদয় জয় করা

কোনো মানুষকে সংশোধন করতে হলে আগে তার হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হয়। রাসুল (সা.)  তরুণদের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, যাতে তারা নির্ভয়ে তাঁর কাছে নিজেদের কথা বলতে পারত। এর একটি অসাধারণ উদাহরণ সেই যুবক, যে নবীজির কাছে এসে ব্যভিচারের অনুমতি চেয়েছিল।

সাহাবিরা তার কথায় ক্ষুব্ধ হলেন। কিন্তু নবীজি (সা.) তাকে ধমক দিলেন না। বললেন, ‘তাকে আমার কাছে আসতে দাও।’ এরপর তাকে কাছে বসিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি তোমার মায়ের জন্য এমনটা পছন্দ করবে?’

যুবক বলল, ‘না, আল্লাহর কসম।’ তিনি বললেন, ‘মানুষও তাদের মায়ের জন্য তা পছন্দ করে না।’ এরপর কন্যা, বোন, ফুফু ও খালার কথা উল্লেখ করলেন। প্রতিবার যুবক একই উত্তর দিল। শেষে রাসুল (সা.)  তার জন্য দোয়া করলেন।

বর্ণনাকারী আবু উমামাহ (রা.) বলেন, এরপর ওই যুবকের কাছে ব্যভিচারের চেয়ে অধিক ঘৃণিত আর কিছু ছিল না। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২২২১১)

সুল (সা.) তরুণদের সবাইকে একই ছাঁচে গড়ে তোলেননি। তিনি প্রত্যেকের স্বতন্ত্র যোগ্যতা চিনেছেন এবং সেই অনুযায়ী তাদের তৈরি করেছেন।

২. প্রতিভা খুঁজে বের করে তাকে বিকশিত করা

প্রত্যেক মানুষ একই ধরনের যোগ্যতা নিয়ে জন্মায় না। কেউ জ্ঞান অর্জনে এগিয়ে, কেউ নেতৃত্বে, কেউ ভাষা ও লেখায়, কেউ দাওয়াতের কাজে। রাসুল (সা.) তরুণদের সবাইকে একই ছাঁচে গড়ে তোলেননি। তিনি প্রত্যেকের স্বতন্ত্র যোগ্যতা চিনেছেন এবং সেই অনুযায়ী তাদের তৈরি করেছেন।

জায়েদ ইবনে সাবিত ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী তরুণ। রাসুল (সা.) তাঁর শেখার ক্ষমতা লক্ষ করেছিলেন। তাই তাঁকে ইহুদিদের ভাষা শেখার নির্দেশ দেন। জায়েদ (রা.) বলেন, তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ভাষা শিখে ফেলেন। এরপর ইহুদিদের চিঠি নবীজির কাছে পড়ে শোনাতেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে তাদের চিঠি লিখতেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭১৫)

পরবর্তী সময়ে তিনি ওহি লেখকদের অন্যতম হন। কোরআন সংকলনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন। ফরায়েজ শাস্ত্রেও তিনি বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মধ্যেও তিনি জ্ঞানের বিশেষ যোগ্যতা দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, তাঁকে ধর্মের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং তাঁকে কোরআনের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৩)

পরে ইবনে আব্বাস (রা.) উম্মতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ও মুফাসসির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

৩. আত্মবিশ্বাস তৈরি করা

তরুণ বয়সে আত্মবিশ্বাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন তরুণ যদি মনে করে, ‘আমি পারি না’, তাহলে তার অনেক যোগ্যতাই অপ্রকাশিত থেকে যায়। রাসুল (সা.)  তাই প্রয়োজনমতো তরুণদের ভালো গুণের প্রশংসা করতেন।

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘আবদুল্লাহ কতই না উত্তম মানুষ, যদি সে রাতে নামাজ পড়ত!’ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘এর পর থেকে তিনি খুব কমই রাতের নামাজ ছেড়েছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১২২)

এখানে নবীজি (সা.) সরাসরি ‘তুমি তাহাজ্জুদ পোড়ো না’ বলে ভর্ৎসনা করেননি। আগে তার ভালো দিকটি উল্লেখ করেছেন। তারপর উন্নতির একটি পথ দেখিয়েছেন। এ ধরনের প্রশংসা মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগায়। আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

রাসুল (সা.) তরুণদের শুধু ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে প্রস্তুত করেননি; যোগ্যতা দেখলে তাদের বর্তমানেই দায়িত্ব দিয়েছেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ওসামা ইবনে জায়েদ (রা.)।

৪. তরুণদের হাতে বাস্তব দায়িত্ব তুলে দেওয়া

রাসুল (সা.) তরুণদের শুধু ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে প্রস্তুত করেননি; যোগ্যতা দেখলে তাদের বর্তমানেই দায়িত্ব দিয়েছেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ওসামা ইবনে জায়েদ (রা.)।

নবীজি তাঁকে একটি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই বাহিনীতে বয়সে তাঁর চেয়ে অনেক বড় সাহাবিও ছিলেন। ওসামা তখন তরুণ। কিছু মানুষ তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি করলে নবীজি বললেন, ‘তোমরা যদি ওসামার নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি করো, এর আগে তাঁর পিতার নেতৃত্ব নিয়েও আপত্তি করেছিলে। আল্লাহর শপথ, সে নেতৃত্বের উপযুক্ত ছিল। আর তার পরে ওসামাও আমার কাছে প্রিয় এবং নেতৃত্বের উপযুক্ত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৩০)

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। রাসুল (সা.) নেতৃত্ব শেখানোর জন্য ওসামাকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করাননি। তাঁর যোগ্যতার ওপর আস্থা রেখে বাস্তব দায়িত্ব দিয়েছেন। কেননা দায়িত্ব পালন করতে করতেই দায়িত্বশীলতা তৈরি হয়।

৫. পাঠশালা থেকে পাঠিয়ে দিতেন জীবনের মাঠে

শিক্ষা যদি বাস্তব জীবনে প্রয়োগের সুযোগ না পায়, তাহলে তার প্রভাব সীমিত হয়ে যায়। রাসুল (সা.) তরুণদের জ্ঞান দিয়েছেন এবং সেই জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগও দিয়েছেন।

মুসআব ইবনে ওমাইর (রা.) ছিলেন তরুণ। হিজরতের আগে নবীজি তাঁকে মদিনায় পাঠিয়েছিলেন ইসলামের শিক্ষা ও দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

মদিনায় গিয়ে তিনি মানুষের কাছে ইসলাম তুলে ধরেন। তাঁর দাওয়াতের মাধ্যমে সাদ ইবনে মুয়াজ ও উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের মাধ্যমে আরও বহু মানুষ ইসলামের দিকে আসে।

তরুণকে দায়িত্ব দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার আগে তার চিন্তার ভিত শক্ত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) তাই তরুণদের সঙ্গে এমন কথাও বলতেন, যা তাদের পুরো জীবনদর্শন গড়ে দিত।

৬. ইমান ও চিন্তার ভিত শক্ত করা

তরুণকে দায়িত্ব দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার আগে তার চিন্তার ভিত শক্ত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) তাই তরুণদের সঙ্গে এমন কথাও বলতেন, যা তাদের পুরো জীবনদর্শন গড়ে দিত।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ছিলেন তখন কিশোর। এক সফরে তিনি নবীজির বাহনের পেছনে বসে ছিলেন। সেই সময় নবীজি (সা.) তাঁকে বললেন, ‘হে বৎস, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শেখাব।’

এরপর বললেন, ‘আল্লাহর হুকুমের হেফাজত করলে আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন। কিছু চাইলে আল্লাহর কাছে চাইবে। সাহায্য চাইলে আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর জেনে রাখবে, সমগ্র মানুষ তোমার উপকার করতে চাইলেও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন, তার বাইরে কিছু করতে পারবে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৬)

পরে ইবনে আব্বাস (রা.) উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমে পরিণত হন।

৭. শুধু শিষ্য নয় শিক্ষক বানাতেন

নবীজির কাছে কয়েকজন তরুণ প্রায় ২০ দিন অবস্থান করেছিলেন। তাঁরা নিজেদের পরিবারের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। এটা বুঝতে পেরে তিনি তাঁদের বাড়ি ফিরে যেতে বললেন।

কিন্তু তাঁদের যাওয়ার সময় বললেন, ‘তোমরা তোমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাও, তাদের শিক্ষা দাও এবং তাদের সৎকাজের নির্দেশ দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭২৪৬)

লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাঁরা নবীজির কাছে এসেছিলেন শিখতে। আর ফিরে গেলেন শিক্ষক হয়ে।

এটাই নবীজির দীক্ষার বড় বৈশিষ্ট্য যে মানুষকে নিজের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা নয়; তাকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে সে নিজেই অন্যদের পথ দেখাতে পারে।