যেকোনো সমাজে অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলা কেবল আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে না, বরং সমাজের স্থিতিশীলতা ও সংহতিকে সমূলে বিনাশ করে। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন সমাজের বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরাও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন।
এই ভয়াবহতার কারণেই পবিত্র কোরআন ফেতনাকে হত্যার চেয়েও জঘন্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বলা হয়েছে, “ফেতনা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হত্যা অপেক্ষা অধিকতর মারাত্মক।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯১) “এবং ফেতনা হত্যা অপেক্ষা বড় অপরাধ।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৭)
ফিতনার এই ভয়াবহতা কেবল সাময়িক ক্ষতির কারণে নয়, বরং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং সমাজ বিধ্বংসী ফলাফলের কারণে। আর এই ফিতনার অন্যতম প্রধান উৎস হলো ‘জাহেলি আসাবিয়্যাত’ বা অন্ধ গোত্রীয় আভিজাত্য ও সাম্প্রদায়িকতা।
বংশমর্যাদা, বর্ণবাদ কিংবা উগ্র জাতীয়তাবাদের এই বিষবাষ্প যখন সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, তখন পারস্পরিক ঘৃণা, নিন্দা এবং সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।
যখন একটি জাতি তার শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হিসেবে বংশ বা বর্ণকে বাদ দিয়ে ‘তাকওয়া’ বা নৈতিকতাকে গ্রহণ করে, তখন সেখানে সাম্প্রদায়িক ফেতনার কোনো স্থান থাকে না।
পবিত্র কোরআন এই সমস্যার এক আমূল ও বৈপ্লবিক চিকিৎসা পেশ করেছে। বিশেষ করে ‘সুরা হুজুরাত’ এই বিষয়ের এক পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপত্র। ছোট এই সুরাটিতে সমাজ সংস্কারের যে নীতিমালা বর্ণিত হয়েছে, তা যদি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও সামাজিক সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তবে যেকোনো সমাজ একটি সুদৃঢ় ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ কাঠামো লাভ করতে পারে।
কোরআনের আলোকে জাহেলি সাম্প্রদায়িকতা দূরীকরণের প্রধান ধাপগুলো আলোচনা করা হলো:
জাহেলি যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল গোত্রীয় প্রথা বা মনগড়া খেয়ালখুশিকে সত্যের মানদণ্ড মনে করা। কোরআন প্রথমেই এই মানসিকতা ভাঙার নির্দেশ দিয়েছে, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রণী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় করো।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১)
আল্লাহ ও রাসুলের বিধানের ওপর নিজের মতামত বা গোত্রীয় প্রথাকে প্রাধান্য দেওয়া মূলত বিশৃঙ্খলার দ্বার উন্মোচন করা। এর বিপরীতে জাহেলি বিধানের অন্ধ অনুসরণকে কোরআন কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছে। (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৫০)
যদি কোনো পক্ষ সীমালঙ্ঘন করে তবে তাকে ন্যায়ের পথে ফিরিয়ে আনার জন্য সম্মিলিত শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা গোত্রীয় সংঘাতের প্রধান জ্বালানি হলো মিথ্যা সংবাদ বা গুজব। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এটি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
কোরআন এই সামাজিক ব্যাধির প্রতিকার হিসেবে একটি বৈশ্বিক মূলনীতি দিয়েছে, “হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করো; যেন তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে না হয়।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৬)
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আয়াত কেবল ফাসেক নয়, বরং যেকোনো স্পর্শকাতর সংবাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও যাচাইয়ের মূলনীতি শেখায়। (ইবনুল আরাবি, আহকামুল কুরআন, ৪/১৭১২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)
যদি সমাজে কোনো পক্ষ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে, তবে অন্যদের দায়িত্ব হলো হাত গুটিয়ে বসে না থেকে ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে মীমাংসা করা।
কোরআন বলছে, “যদি মুমিনদের দুই দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৯)
এখানে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যদি কোনো পক্ষ সীমালঙ্ঘন করে তবে তাকে ন্যায়ের পথে ফিরিয়ে আনার জন্য সম্মিলিত শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল একটি পক্ষকে বিজয়ী করা নয়, বরং সমাজে ‘ন্যায়বিচার’ বা ‘আদল’ প্রতিষ্ঠার কৌশল।
কোরআন বংশীয় বা বর্ণগত আভিজাত্যের বদলে ইমানি ভ্রাতৃত্বকে শ্রেষ্ঠ বন্ধন হিসেবে ঘোষণা করেছে।
“নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই; সুতরাং তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপস-মীমাংসা করো।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১০)
এই পবিত্র বন্ধন যত শক্তিশালী হবে, সাম্প্রদায়িকতার দেয়াল তত দ্রুত ভেঙে পড়বে।
সাম্প্রদায়িকতার সূচনা হয় উপহাস ও তুচ্ছজ্ঞান থেকে। সুরা হুজুরাতের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তিনটি সুনির্দিষ্ট কাজ নিষিদ্ধ করেছেন:
উপহাস করা: কাউকে ছোট মনে করে বিদ্রূপ করা।
দোষারোপ: অন্যের ত্রুটি অন্বেষণ করা।
মন্দ নামে ডাকা: কাউকে এমন উপাধি দেওয়া যা তাকে অপমানিত করে।
কোরআন এখানে ‘নিজেদের লোককে’ (অ্যানফুসাকুম) দোষারোপ না করার কথা বলে বোঝাতে চেয়েছে যে, অন্য মুমিনকে কষ্ট দেওয়া মানে নিজেকেই কষ্ট দেওয়া। (তাফসিরে ইবনে কাসির, ৭/৩৭৬, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১৯৯৮)
কোনো আরবের ওপর অনারবের, কিংবা অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; নেই কালোর ওপর সাদার কিংবা সাদার ওপর কালোর কোনো মর্যাদা—কেবল আল্লাহভীতি ছাড়া।মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৪৮৯
প্রকাশ্য আচরণের পাশাপাশি মানসিক ব্যাধিগুলোও সাম্প্রদায়িক ফিতনার কারণ হয়। কোরআন বলছে, “হে মুমিনগণ, তোমরা অধিকাংশ অনুমান (কুধারণা) থেকে দূরে থাকো; কারণ কিছু কিছু অনুমান পাপ। আর তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না এবং কেউ যেন কারো গিবত না করে।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)
এখানে গিবত বা পরনিন্দাকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো বীভৎস উপমায় তুলে ধরা হয়েছে, যাতে মানুষ এই নোংরা অভ্যাস থেকে ফিরে আসে।
সবশেষে, কোরআন সাম্প্রদায়িকতার শিকড় উৎপাটন করেছে মানুষের আদি পরিচয় মনে করিয়ে দিয়ে, “হে মানুষ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি (খোদাভীরু)।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)
এই একটি আয়াত বিশ্বজুড়ে প্রচলিত সকল বর্ণবাদ ও বংশীয় শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বিদায় হজের ভাষণেও এই মূলনীতি ঘোষণা করে বলেছিলেন, “হে লোকসকল, নিশ্চয়ই তোমাদের রব একজন, তোমাদের পিতাও একজন। কোনো আরবের ওপর অনারবের, কিংবা অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; নেই কালোর ওপর সাদার কিংবা সাদার ওপর কালোর কোনো মর্যাদা—কেবল তাকওয়া (আল্লাহভীতি) ছাড়া।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৪৮৯)
কোরআনের এই সমাধানগুলো কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের অপরিহার্য ভিত্তি।
যখন একটি জাতি তার শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হিসেবে বংশ বা বর্ণকে বাদ দিয়ে ‘তাকওয়া’ বা নৈতিকতাকে গ্রহণ করে, তখন সেখানে সাম্প্রদায়িক ফেতনার কোনো স্থান থাকে না। আধুনিক বিশ্বের অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে কোরআনের এই কালজয়ী সমাজতাত্ত্বিক দর্শন চর্চার কোনো বিকল্প নেই।