সিরাতের ভূমি ১২

‘আজয়াদ’ চারণভূমি: মহানবী (সা.) যেখানে মেষ চরাতেন

‘আমি জিয়াদে আমার পরিবারের মেষ চরাতাম।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১১৫০৮)

এটি নবীজির বাল্যকালের একটি স্মৃতি, যা তিনি মদিনায় একটি ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্মরণ করেছিলেন। এর বর্ণনাকারী আবু সাইদ খুদরি (রা.) নবীজির মক্কি জীবনে ইসলাম গ্রহণ করে ইয়েমেনে চলে যান। এরপর নবীজির মদিনায় হিজরতের সংবাদ পেয়ে মদিনার ‘ইশ বন্দর’-এর উদ্দেশে জাহাজে চড়েন।

কিন্তু উত্তাল লোহিত সাগর তাঁকে হাবশা (ইথিওপিয়া) উপকূলে নিয়ে যায়। এরপর প্রায় বছর দুয়েক হাবশায় জাফর ইবনে আবি তালিবের সঙ্গে কাটিয়ে দেন।

সপ্তম হিজরিতে খাইবার বিজয় আর হাবশার মুহাজিরদের মদিনায় আগমন ঘটে। দুটির খুশির সংবাদের কোনটিতে নবীজি বেশি আনন্দ প্রকাশ করবেন, তা বুঝতে পারছিলেন না। আবু সাইদ খুদরি ছিলেন হাবশাফেরত মুহাজিরদের কাফেলায়।

এবার মূল ঘটনাটি শোনা যাক।

নবী মুসা প্রেরিত হয়েছেন, তিনি ছিলেন তাঁর পরিবারের ছাগলের রাখাল; আমিও প্রেরিত হয়েছি, আমিও আমার পরিবারের ছাগল চরাতাম জিয়াদে।
মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১১৫০৮

আবু সাইদ বলেন, উট ও ছাগলের মালিকেরা নবীজির সামনে নিজ নিজ গর্ব প্রকাশ করছিলেন। মহানবী (সা.) বলেন, ‘গর্ব ও অহংকার উটের মালিকদের এবং প্রশান্তি ও উচ্চ মর্যাদা ছাগলের মালিকদের।’

তিনি আরও বলেন, ‘নবী মুসা প্রেরিত হয়েছেন, তিনি ছিলেন তাঁর পরিবারের ছাগলের রাখাল; আমিও প্রেরিত হয়েছি, আমিও আমার পরিবারের ছাগল চরাতাম জিয়াদে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১১৫০৮)

আবু হোরাইরা (রা.) বলেন, নবীজি বলেছেন, ‘আল্লাহ এমন কোনো নবী পাঠাননি, যিনি মেষ চরাননি।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনিও কি?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিও মক্কার কারারিতে মেষ চরাতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২৬২)

বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, সাহাবিরা নবীজির রাখালজীবনের এই নির্দিষ্ট দিকটি সম্পর্কে আগে থেকে অবহিত ছিলেন না। উদ্ধৃতিতে ‘কারারিত’ শব্দটি ‘কিরাত’ শব্দের বহুবচন। হাদিসবেত্তারা শব্দটির দুটি অর্থ নিয়েছেন।

এক. এটি মুদ্রার নাম। নবীজি মুদ্রার বিনিময়ে মক্কাবাসীদের ছাগল-ভেড়া চরাতেন। দুই. এটি মক্কার একটি স্থানের নাম।

সহিহ বুখারির বিখ্যাত ভাষ্যকার মুস্তফা আল-বুগা এটিকে মক্কা-সংলগ্ন ‘জিয়াদ’ স্থান বলে আখ্যা দিয়েছেন। (মুস্তফা আল-বুগা, তালিকুল বুখারি, ২/৭৮৯, দার ইবনে কাসির, দামেস্ক, ১৯৯৩)

নবীজি (সা.) কোথায় মেষ চরাতেন, তা আরেকটি সুখপাঠ্য হাদিস থেকে জানা যায়। আসুন, সেই বাল্যস্মৃতি নবীজির মুখ থেকেই শোনা যাক।

আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেন, আমি আল্লাহর রাসুলকে বলতে শুনেছি, ‘জাহিলি যুগের লোকজন যেসব নিন্দনীয় কাজের ইচ্ছা পোষণ করত, আমি কখনো সেরকম কাজের ইচ্ছা পোষণ করিনি; তবে সারা জীবনে দুবার তার ব্যতিক্রম ঘটেছে এবং উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহ আমাকে হেফাজত করেছেন।

‘এক রাতে মক্কার উঁচু এলাকায় আমার সঙ্গে ছিল এক কোরাইশ যুবক; সেখানে সে তার পরিবারের মেষ চরাতো। আমি তাকে বললাম, “আমার মেষগুলোর দিকে একটু দৃষ্টি রেখো; আজকের রাতটি আমি মক্কায় অন্যান্য যুবকের ন্যায় (আড্ডা ও গল্পগুজবে) কাটিয়ে দেব।” সে বলল, “আচ্ছা।”

এক রাতে মক্কার উঁচু এলাকায় আমার সঙ্গে ছিল এক কোরাইশ যুবক; সেখানে সে তার পরিবারের মেষ চরাতো। আমি তাকে বললাম, “আমার মেষগুলোর দিকে একটু দৃষ্টি রেখো; আজকের রাতটি আমি মক্কায় অন্যান্য যুবকের ন্যায় (আড্ডা ও গল্পগুজবে) কাটিয়ে দেব।

তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে মক্কার সবচেয়ে নিকটবর্তী গৃহের কাছে আসতেই গান, দফ ও মাজামিরের (বাঁশিসদৃশ বাদ্যযন্ত্র) আওয়াজ আমার কানে আসে। আমি জিজ্ঞেস করি, “এখানে কী হচ্ছে?” তারা বলল, “অমুকের সঙ্গে অমুকের বিয়ে; এক কোরাইশ যুবক আরেক কোরাইশ নারীকে বিয়ে করেছে।”

গান ও বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজে আমার মনোযোগ ব্যাহত হয় এবং দুচোখে ঘুম চলে আসে। সকালবেলা সূর্যের উত্তাপে আমার ঘুম ভাঙে। অতঃপর আমি ফিরে আসি। সে আমাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি (সেখানে) কী করেছ?” আমি তাকে অবহিত করি।

১৭৮০ সনে আজয়াদের ‘বুলবুল’ পাহাড়ের ওপর নির্মিত হয়েছিল ‘আজয়াদ কেল্লা’

তারপর আরেক রাতে আমি তাকে একই কথা বলি। সে রাজি হয়। আমি বেরিয়ে গিয়ে আগের মতোই আওয়াজ শুনতে পাই। কী হচ্ছে জানতে চাইলে আগের মতোই জবাব দেওয়া হলো। সেই আওয়াজে আমার মনোযোগ ব্যাহত হয় এবং দুচোখে ঘুম চলে আসে। সকালবেলা সূর্যের পরশে আমার ঘুম ভাঙে।

‘অতঃপর আমি আমার সঙ্গীর নিকট ফিরে আসি। সে আমাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কী করেছ?” আমি বললাম, “কিছুই করিনি।” মহানবী (সা.) বলেন, আল্লাহর শপথ, এরপর আমি এমন কোনো মন্দ কাজের ইচ্ছাও পোষণ করিনি, যা জাহিলি যুগের লোকেরা করত; পরিশেষে আল্লাহ আমাকে নবুয়ত দিয়ে সম্মানিত করেছেন।’ (আবু নুয়াইম আল-ইসবাহানি, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ১/১৬৫, দারুন নাফায়িস, বৈরুত, ১৯৮৬)

নবীজির এই স্মৃতিচারণা থেকেও বোঝা যায়, তাঁর রাখালজীবন কেটেছে ‘আলা মক্কা’ (উঁচু মক্কা) ও ‘আসফাল মক্কার’ (নিচু মক্কা) সংযোগস্থলে। জিয়াদের ভূখণ্ডই যে সেই স্থান, এতে আর সন্দেহ কী! কারণ, ‘জিয়াদ’ হলো মক্কার উঁচু ভূমি ও নিচু ভূমির সংযোগস্থল।

তিনি যখন যুবক, কোরাইশরা তখন কাবা সংস্কার করে। সেই স্মৃতি বলতে গিয়ে তিনি অন্তত দুবার যে ‘আজয়াদ’-এর কথা বলেছেন, তা-ই মূলত ‘জিয়াদ’।

কাবা পুনর্নির্মাণের সেই স্মৃতিটি এ রকম।

‘কাবা ভাঙতে গিয়ে আচমকা তাদের চোখে পড়ে, কাবার দেয়ালের ওপর একটি সাপ বসে আছে; মনে হয় খুঁটির একটি টুকরো পড়ে আছে। সাপটির পিঠের রং কালো, আর পেটের রং সাদা। ভাঙার উদ্দেশে কিংবা পাথর সরানোর জন্য কেউ কাবার কাছে গেলেই সাপটি মুখ হাঁ করে তার দিকে ছুটে আসে।

আল্লাহর শপথ, এরপর আমি এমন কোনো মন্দ কাজের ইচ্ছাও পোষণ করিনি, যা জাহিলি যুগের লোকেরা করত; পরিশেষে আল্লাহ আমাকে নবুয়ত দিয়ে সম্মানিত করেছেন।
দালাইলুন নুবুওয়াহ, ১/১৬৫

কোরাইশরা মাকামে ইবরাহিমে সমবেত হয় এবং আল্লার নিকট আর্তনাদ করে বলে, “হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের কেন ভয় দেখাচ্ছ? আমরা তো তোমার ঘরকে মহিমান্বিত করতে চাচ্ছি। তুমি যদি তাতে সন্তুষ্ট থাকো (তাহলে তোমার ইচ্ছাই কার্যকর হোক); অন্যথায় উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করো।”

তারপর তারা আকাশে একটি আওয়াজ শুনতে পায়। সেদিকে তাকাতেই দেখে—একটি পাখি, যার পিঠের রং কালো, পেট ও দুপায়ের রং সাদা, আকারে মানুষের চেয়ে বৃহৎ। পাখিটি এসে তার থাবা বসিয়ে দেয় সাপের মাথায়। তারপর তার লেজ হ্যাঁচড়ে আজয়াদের দিকে নিয়ে যায়। এরপর কোরাইশরা কাবা ভেঙে ফেলে এবং কাঁধে করে উপত্যকার পাথর নিয়ে এসে তা নির্মাণ করতে শুরু করে। এভাবে তারা কাবাকে বিশ গজ উঁচু করে।’

মহানবী (সা.) আজয়াদ থেকে পাথর বহন করে নিয়ে আসেন। পরনে এক নিমরা (সেলাই করা বস্ত্র) থাকায় কাজে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছিল, তাই তিনি এটি কাঁধের ওপর রেখে দেন। নিমরাটি ছোট হওয়ায় তাঁর দেহের গোপনীয় অংশ প্রকাশ হয়ে পড়ে। আর অমনি আওয়াজ আসে—‘মুহাম্মদ, তোমার গোপনীয় অংশ ঢেকে রাখো।’ এরপর তাঁকে আর কখনো নগ্ন দেখা যায়নি।

মনে করা হয়, কাবার পুনর্নির্মাণ ও নবীজির ওপর ওহি নাজিলের মধ্যে ব্যবধান ছিল পাঁচ বছর। আর মদিনায় হিজরত ও কাবা পুনর্নির্মাণের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ছিল পনেরো বছরের। (নুরুদ্দিন আল-হাইসামি, মাজমাউজ জাওয়াইদ, ৩/২৮৯, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৮)

মহানবী (সা.) আজয়াদ থেকে পাথর বহন করে নিয়ে আসেন। পরনে এক নিমরা (সেলাই করা বস্ত্র) থাকায় কাজে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছিল, তাই তিনি এটি কাঁধের ওপর রেখে দেন। নিমরাটি ছোট হওয়ায় তাঁর দেহের গোপনীয় অংশ প্রকাশ হয়ে পড়ে।

এই ঘটনা থেকেও বোঝা যায় ‘জিয়াদ’ বা ‘আজয়াদ’ কাবার সন্নিকটের এলাকা। বস্তুত শব্দ দুটি একই মূলবর্ণ ‘জাইদ’ থেকে উৎসারিত—যার অর্থ উত্তম কিংবা সর্বোত্তম। তবে এই স্থানের নাম ‘জিয়াদ’ কেন হলো?

ইকরামা ইবনে খালিদ আল-মাখজুমি বলেন, নবীজির আবির্ভাবের দিনগুলোতে কোরাইশের কিছু লোক সমুদ্রবক্ষে আরোহণ করে। তীব্র বায়ু তাদের সামুদ্রিক দ্বীপের কোনো একটিতে নিক্ষেপ করে। সেখানে এক ব্যক্তি তাদের জিজ্ঞেস করে, ‘তোমরা কারা?’ তারা বলে, ‘কোরাইশদের লোকজন।’ সে বলে, ‘কোরাইশ কারা?’ তারা বলে, ‘হারামের অধিবাসী, অমুকের অধিবাসী।’

তখন সে চিনতে পেরে বলে, ‘আমরা তার অধিবাসী, তোমরা নও!’ লোকটি ছিল জুরহুম বংশের। সে বলে, ‘তোমরা কি জানো, কী কারণে একে “আজয়াদ” বলা হয়? আমাদের ঘোড়াগুলো উত্তম ছিল—যা সেখানে চারণ করত।’

‘তারা তাকে বলল, ‘আমাদের মাঝে এক ব্যক্তির আবির্ভাব হয়েছে, সে নিজেকে নবী মনে করে।’ তারা তাঁর বিষয়টি উল্লেখ করে। লোকটি বলল, ‘তাঁর অনুসরণ করো; যদি আমার অবস্থা এটা না হতো যাতে আমি আছি, তবে আমি তাঁর সঙ্গে অবশ্যই মিলিত হতাম।’ (ইবনে হাজার আল-আসকালানি, আল-মাতালিবুল আলিয়া, হাদিস: ৩৮৫৭)

নবী ইসমাইলের সময় বনু জুরহুম এই স্থানে তাদের ঘোড়া ও অন্যান্য প্রাণী চরাতো। এভাবে স্থানটি ‘খাইলুল জিয়াদ’ (উত্তম ঘোড়াদের স্থান) নামেও পরিচিতি পায়। ফলে প্রাচীন কবিতা ও গদ্যসাহিত্যে এই ভূমির ব্যাপক উল্লেখ পাওয়া যায়।

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে দেখা যায়, নবীজি জিবরাইলকে তাঁর স্বীয় আকৃতিতে দুবার দেখেছেন। প্রথমবার মক্কার আজয়াদে আর দ্বিতীয়বার সিদরাতুল মুনতাহায়; তাঁর ছিল ছয় শ ডানা। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩২৭৮)

ইবনে মাসউদের বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে বোঝা যায় যে, প্রথমবারের দেখাটি নবীজির ইচ্ছায়ই হয়েছিল (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৩৮৫৪)। বুখারির বর্ণনায় জিবরাইল দিগন্তজুড়ে হাজির হয়েছিলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪)।

মহানবী (সা.) গোপনে ইসলাম প্রচারকালীন এসব এলাকা চষে বেড়াতেন। আয়েশা বিনতে সাদ তাঁর পিতা থেকে শুনেছেন, ‘আমার নিকট সংবাদ পৌঁছাল যে মুহাম্মদ গোপনে ইসলামের দিকে ডাকছেন। আমি আজয়াদ উপত্যকায় তাঁর সঙ্গে মিলিত হলাম; তিনি সবে আসর নামাজ শেষ করেছেন।

‘আমি বললাম: “কিসের দিকে আপনি ডাকছেন?” তিনি বললেন: “তুমি সাক্ষ্য দেবে—আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর রাসুল।” আমি কালিমা পড়ে নিলাম।’ (ইবনে আবিদ দুনিয়া, আল-মানামাত, ১/৭৫, মুআসসাসাতুল কুতুব আস-সাকাফিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৩)

আজয়াদের ইতিহাস আর স্মৃতি শেষ হওয়ার নয়। হারামের ইতিহাসের সঙ্গে যে ভূমি জড়িয়ে, তার স্মৃতি কি আর এত স্বল্প হতে পারে? এখানে স্মৃতি আছে সাহাবিদের, তাবেয়িদের। আছে পুরোনো অতীতের কথা, নিকট অতীতের কথাও।

ঐতিহাসিকেরা আজয়াদকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছিলেন। একটি ‘আজয়াদ আল-কবির’ বা বিস্তৃত আজয়াদ, আরেকটি ‘আজয়াদ আস-সাগির’ বা ছোট্ট আজয়াদ। বর্তমানে ‘আজয়াদ আস-সাগির’ স্থানটি ‘আজয়াদ আস-সাদ’ হিসেবে পরিচিত।

এটি পবিত্র হারামের ‘বাবু আজয়াদ’ থেকে শুরু হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে একটু মোড় নিয়ে ‘জাবালু খানদামা’ পর্যন্ত বিস্তৃত—যেখানে ‘আবু ইউসুফ পাড়া’ শুরু হয়েছে। বর্তমানে ‘আজয়াদ আস-সাদ’-কে আজিজিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করে যানবাহন এবং পথচারীদের জন্য একাধিক টানেল নির্মাণ করা হয়েছে।

অনাগত দিনের জন্য ‘আজয়াদ’ কি কোনো পয়গাম ধরে রেখেছে? একটি হাদিসের পাঠ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা যায়, ‘মক্কার আজয়াদের পাড়ার একটি পাথরের নিচ থেকে হজের দিনগুলোতে “দাব্বাতুল আরদ” বের হবে।

আজয়াদের বিখ্যাত ভবনগুলোর মাঝে ‘আল-কাজা ওয়াল মাহকামা আশ-শারইয়্যাহ ওয়া কিতাবাতুল আদল’, মাবনা আল-হামিদিয়া, মাবনা আওকাফ মালিক আবদুল আজিজ, ফুন্দুক মিসর, ফুন্দুক আজয়াদ মাকারিম এখনো সুরম্য অট্টালিকা আর স্থাপত্যসৌন্দর্যের মিনার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এখন আর নেই ‘ফোর্ট্রেস অব আজয়াদ।

বেদুইন ও শত্রুদের থেকে কাবাকে সুরক্ষা দিতে অটোমান আমলে ১৭৮০ সনে আজয়াদের ‘বুলবুল’ পাহাড়ের ওপর নির্মিত হয়েছিল ‘আজয়াদ কেল্লা’। ‘হারা আজয়াদ’ নামীয় নান্দনিক স্থাপত্যের এই ঐতিহ্য ২০০২ সনে বিরান হয়ে যায়। সেই স্থানে সৌদি রাজকীয় ফরমানে বাইতুল্লাহর হাজিদের জন্য গড়ে ওঠে ‘মক্কা ক্লক টাওয়ার কমপ্লেক্স’। এ এলাকায় ‘আজয়াদ হসপিটাল’ও ছিল, যা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয় ২০০৯ সালে। সময়ের বিবর্তনে কত কিছুই না বদলে যায়!

অনাগত দিনের জন্য ‘আজয়াদ’ কি কোনো পয়গাম ধরে রেখেছে? একটি হাদিসের পাঠ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা যায়। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আল-আস বলেন, ‘মক্কার আজয়াদের পাড়ার একটি পাথরের নিচ থেকে হজের দিনগুলোতে “দাব্বাতুল আরদ” (কিয়ামতের আগে জমিন থেকে উত্থিত প্রাণী) বের হবে।... (দীর্ঘ হাদিসের শেষে)... আমি ইচ্ছা করলে, সেই স্থানটিতে আমার পা রাখতে পারি—যেখান থেকে তা বেরিয়ে আসবে।’ (আসরাতুস সা‘আহ ওয়া জিহাবিল আখবার, খণ্ড/পৃষ্ঠা: ২৪/১০)

এতক্ষণ আমরা যে ভূখণ্ডের ইতিহাস পাঠ করলাম, সেখান থেকেই উদ্ভূত সেই প্রাণীটি বের হবে—যা মানুষের সঙ্গে কথা বলবে। পবিত্র কোরআনেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বর্ণনা এসেছে, ‘যখন ঘোষিত শাস্তি ওদের নিকট আসবে, তখন আমি ভূগর্ভ হতে এক প্রাণী বের করব, যা মানুষের সঙ্গে কথা বলবে। বস্তুত ওরা আমার নিদর্শনে ছিল অবিশ্বাসী।’ (সুরা নামল, আয়াত: ৮২)

আমরা কি সেই প্রাণীকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারব, ‘আমি মুমিন’? হে আল্লাহ, আমাদের প্রতি কৃপা করুন। আমাদের যে বিষয়ে ক্ষমতা নেই, সেই পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়া থেকে আপনার সমীপে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

  • ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক: অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়