জনগণের আমানত হিসেবে খেলাফত তাত্ত্বিক ভিত্তিকে বাস্তবে রূপ দান করেছিলেন সত্যপন্থী মুসলিম খলিফাগণ, যাদের বলা হয় খোলাফায়ে রাশেদিন। খলিফা হজরত আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলী (রা.) খেলাফতের দায়িত্বকে কোনো একচ্ছত্র ক্ষমতা হিসেবে দেখেননি; বরং একে জনগণের আমানত হিসেবে গণ্য করতেন।
তারা বিনম্রভাবে জনগণকে তাঁদের ভুল সংশোধন করে দেওয়ার আহ্বান জানাতেন এবং জনগণের তদারকি করার অধিকারকে সানন্দে গ্রহণ করতেন।
এ ব্যাপারে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান করবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে; আর তারাই সফল।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৪)
আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) খেলাফতের পদে আসীন হওয়ার পর প্রথম ভাষণে বলেন, ‘এই খেলাফত ও প্রশাসন তোমাদের। এর অধিকারী সে-ই, যাকে তোমরা নির্বাচন করেছ। জেনে রেখো, তোমাদের ছাড়া আমার কোনো হুকুম চলতে পারে না।’ (তাবারানি, তারিখুত তাবারি, ৫/৪৪৯-৪৫৭, দারুল মা’আরিফ, কায়রো: ১৯৬৭ খ্রি.)
আমি ভালো কাজ করলে তোমরা আমাকে সাহায্য করবে। বাঁকা কিছু করলে তোমরা আমাকে সোজা করে দেবে।ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)
ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) তাঁর প্রথম ভাষণে একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমি ভালো কাজ করলে তোমরা আমাকে সাহায্য করবে। বাঁকা কিছু করলে তোমরা আমাকে সোজা করে দেবে।’
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) খলিফ নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম ভাষণে বলেন, ‘আমার কাছে সর্বাধিক পছন্দনীয় ওই ব্যক্তি, যে আমার ভুল ধরিয়ে দেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার পদস্খলনের ভয় করি, যদি সে সময় তোমরা আমাকে সাহায্য না করো।’ (ত্বহা হোসাইন, আশ-শাইখান আবু বকর ওয়া ওমর, পৃ. ২৩১, দারুল মাআরিফ, কায়রো: ১৯৫৪ খ্রি.)
ইব্রাহিম ইবনে সাদ তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন; ওসমান (রা.) একবার বলেছিলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর কিতাবে প্রমাণ পাও যে তোমরা আমার পায়ে শেকল পরাতে পারো, তাহলে পরাও।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৫৩৪)
শাসকদের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার যে অধিকার ইসলাম সাধারণ নাগরিককে দিয়েছে, তা চৌদ্দ শ বছর আগে যেমন প্রাসঙ্গিক ছিল, আজও একটি ন্যায়নিষ্ঠ রাষ্ট্র বিনির্মাণে তা অপরিহার্য।
খোলাফায়ে রাশেদিনের সময় জনগণ প্রশাসনের দেখভাল ও তদারকির অধিকারী ছিল। শুধু তা-ই নয়, এর ওপর তাঁদের সর্বসম্মত ঐক্যও ছিল। আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) তাঁর খেলাফতকালে শিষ্টের লালন ও দুষ্টের দমনের প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করতেন।
একবার তিনি ভাষণে বলেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহ ধ্বংস হয়েছে কেবল নিজেদের পাপ আর অহংকারের কারণে। তাদের নেতৃস্থানীয়রা পাপ থেকে তাদের সতর্ক করেনি। তাই তোমরা তাদের মতো শাস্তি আসার পূর্বে সৎকাজে আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করো।’ (ইবনে আবি হাতিম, তাফসিরে ইবনে আবি হাতিম, ৩/১৫, মাকতাবাতু নিজার মুস্তফা আল-বাজ, সৌদি আরব: ১৯৯৭ খ্রি.)
শাসকদের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার যে অধিকার ইসলাম সাধারণ নাগরিককে দিয়েছে, তা চৌদ্দ শ বছর আগে যেমন প্রাসঙ্গিক ছিল, আজও একটি ন্যায়নিষ্ঠ রাষ্ট্র বিনির্মাণে তা অপরিহার্য।
ইলিয়াস মশহুদ : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক