ইমাম আল-জুওয়াইনি তাঁর বিখ্যাত আল-গিয়াসি গ্রন্থে একটি রাষ্ট্র বা সমাজ কাঠামোর ধাপে ধাপে পতনের চিত্র এঁকেছেন এবং সেই চরম সংকটকালে ক্ষমতা কার হাতে থাকা উচিত, সে বিষয়ে তাঁর বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন।
ইমাম আল-জুওয়াইনি তাঁর গ্রন্থে একটি শূন্যতাকালীন ফিকহ (ফিকহুল ফারাগ) নামে একটি আলোচনা সামনে এনেছেন। তিনি কল্পনা করেছেন এমন এক সময়, যখন মুসলিম জাতির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব একে একে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সে–সময় কাদের ওপর কী ধরনের দায়িত্ব, তা–ও তিনি হাজির করেছেন।
তিনি ৪টি স্তরের শূন্যতার কথা বলেছেন:
তিনি এমন এক পরিস্থিতির কথা ভেবেছেন যেখানে ইসলামের শরয়ি জ্ঞান পুরোপুরি মুছে গেছে। তখন মানুষ কেবল তাদের ‘সহজাত বিবেক’ এবং ‘মানবিক নৈতিকতা’ দিয়ে সমাজ পরিচালনা করবে।
১. নেতৃত্বের শূন্যতা: যখন কোনো যোগ্য খলিফা বা শাসক থাকবে না। জুওয়াইনি বলেন, এমতাবস্থায় সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার ভার সরাসরি জনগণের ওপর এবং বিশেষ করে আলেম সমাজের ওপর বর্তায়।
২. মুজতাহিদ আলেমদের শূন্যতা: যখন নতুন সমস্যার সমাধান দেওয়ার মতো গভীর জ্ঞানসম্পন্ন (মুজতাহিদ) আলেম থাকবে না। তখন ‘মুকাল্লিদ’ বা অনুসারী আলেমরাই বিদ্যমান জ্ঞান দিয়ে পথ দেখাবেন।
৩. সাধারণ আলেমদের শূন্যতা: যখন সমাজ আলেমশূন্য হয়ে পড়বে, কেবল ‘কিতাব’ অবশিষ্ট থাকবে। জুওয়াইনির মতে, তখন সাধারণ মানুষ সরাসরি কিতাব পড়ে প্রয়োজনীয় বিধান বুঝে নিতে বাধ্য হবে।
৪. শরয়ি বিধানের বিলুপ্তি: এটি জুওয়াইনির দর্শনের সবচেয়ে চরম ও সাহসী দিক। তিনি এমন এক পরিস্থিতির কথা ভেবেছেন যেখানে ইসলামের শরয়ি জ্ঞান পুরোপুরি মুছে গেছে। তিনি বলেন, তখন মানুষ কেবল তাদের ‘সহজাত বিবেক’ (র্যাশনালিটি) এবং ‘মানবিক নৈতিকতা’ (ইউনিভার্সাল ইথিক্স) দিয়ে সমাজ পরিচালনা করবে।
জুওয়াইনি একটি নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য প্রস্তাব করেছিলেন:
সুলতান বা শাসক: তিনি হবেন ‘বাহ্যিক শক্তির’ প্রতীক। তিনি দেশ রক্ষা করবেন, টেন্ডার বা চুক্তি সামলাবেন এবং প্রশাসনিক কাজ করবেন।
আলেম শ্রেণি: তাঁরা হবেন ‘আইনি ও নৈতিক’ ক্ষমতার অধিকারী। জুওয়াইনি বলেন, “যদি সুলতান নিজে মুজতাহিদ বা পণ্ডিত না হন, তবে তাঁকে আলেমদের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে।”
তদারকির: জুওয়াইনি আলেমদের হাতে এমন এক ক্ষমতা দিতে চেয়েছিলেন, যা অনেকটা আধুনিক ‘সাংবিধানিক আদালত’-এর মতো। অর্থাৎ, সুলতান দেশ চালাবেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ শরয়ি ও নৈতিক মাপকাঠিতে ঠিক আছে কি না, তা তদারকি করবেন আলেমরা।
‘শূন্যতা তত্ত্বে’র মাধ্যমে তিনি এমন এক ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছিলেন যেখানে রাজনৈতিক শক্তি (সুলতান) এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি (আলেম) একে অপরের পরিপূরক হয়ে কাজ করবে।
জুওয়াইনি মনে করতেন, খেলাফত কেবল একটি নামের ওপর টিকে থাকা উচিত নয়। যদি খলিফা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন (যা তখন বাগদাদে ঘটছিল), তবে সেই খেলাফত কেবল একটি প্রতীক।
তিনি খেলাফতকে একটি ‘সাংবিধানিক রাজতন্ত্র’র মতো কাঠামোতে দেখতে চেয়েছিলেন, যেখানে খলিফা থাকবেন মুসলিমদের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা ও দায়িত্ব থাকবে যোগ্য সুলতান ও আলেমদের হাতে।
জুওয়াইনির ‘শূন্যতা তত্ত্বে’র মাধ্যমে আলেমদের রাজনৈতিক অভিভাবকত্বের এমন এক ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছিলেন যেখানে রাজনৈতিক শক্তি (সুলতান) এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি (আলেম) একে অপরের পরিপূরক হয়ে কাজ করবে, এমনকি খলিফা পঙ্গু হলেও সমাজ অচল হবে না।
জুওয়াইনি একজন কট্টর সুন্নি (আশআরি) আলেম হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ‘শূন্যতাকালীন ফিকহ’ বা ‘আলেমদের অভিভাবকত্ব’-এর ধারণা পরবর্তীকালে শিয়া রাজনৈতিক দর্শনেও প্রভাব ফেলেছে।
ইরানের বিপ্লবের মূল ভিত্তি ‘বেলায়েতে ফকিহ (আলেমদের শাসন)—এই ধারণার তাত্ত্বিক কাঠামো জুওয়াইনির ‘গিয়াসি’র সেই প্রস্তাবনার সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে তিনি বলেছিলেন, “যদি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, তবে দেশের আলেমরা হবেন জনগণের অভিভাবক।”
যদিও জুওয়াইনি একক ব্যক্তির বদলে আলেমদের ‘সম্মিলিত নেতৃত্বের’ কথা বলেছিলেন।
জুওয়াইনি শিখিয়েছেন যে খেলাফত কেবল একটি ‘নাম’ নয়, এটি একটি ‘কাজ’। যদি খেলাফত না থাকে, তবে বাস্তবসম্মত প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা ইসলামের বিরোধী নয়।
১৯২৪ সালে ‘খেলাফত’ বিলুপ্ত হলে মুসলিম বিশ্ব এক চরম দিশেহারা অবস্থার সম্মুখীন হয়। যদি সেই সময়ে জুওয়াইনির আল-গিয়াসি-কে গুরুত্ব সহকারে পাঠ করা হতো, তবে উম্মাহ হয়তো আরও দ্রুত একটি বিকল্প ‘সাংবিধানিক’ কাঠামোর সন্ধান পেত।
জুওয়াইনি শিখিয়েছেন যে খেলাফত কেবল একটি ‘নাম’ নয়, এটি একটি ‘কাজ’। যদি কাজের সক্ষমতা না থাকে, তবে নামের পেছনে না ছুটে বাস্তবসম্মত প্রশাসনিক কাঠামো (যেমন—ফেডারেল ব্যবস্থা বা সাংবিধানিক কাউন্সিল) তৈরি করা ইসলামি শরিয়তের বিরোধী নয়।
ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তা কোনো স্থবির বিষয় নয়। ইমাম আল-জুওয়াইনি প্রমাণ করেছেন, সংকটের সময় প্রথাগত আইনের চেয়ে ‘মাকাসিদ’ (উদ্দেশ্য) এবং ‘বাস্তবতা’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ‘সাংবিধানিক খেলাফত’ তত্ত্বটি ছিল মূলত মধ্যযুগের এক অগ্রগামী চিন্তা।
তিনি আলেমদের কেবল মসজিদে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রের ‘নীতিনির্ধারক’ ও ‘তদারককারী’ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন।