কোরআন

‘বিচরণশীল পশু–পাখি তোমাদের মতোই একেকটি জাতি’

পবিত্র কোরআনের সুরা আনআমের ৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা একটি গভীর সত্য উন্মোচন করেছেন। তিনি বলেন, “পৃথিবীতে বিচরণশীল যত প্রাণি আছে আর যত পাখি ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়, তারা সবাই তোমাদের মতোই একেকটি উম্মত বা জাতি।” 

এই আয়াত আধুনিক প্রাণিবিজ্ঞান এবং ইসলামের নৈতিক দর্শনের এক অপূর্ব সমন্বয়।

সৃষ্টিগত সাদৃশ্য ও স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য

আয়াতে বর্ণিত ‘তোমাদের মতোই একেকটি জাতি’ (উম্মুন আমছালুকুম) কথাটির অর্থ হলো—সৃষ্টির মৌলিক কাঠামো ও স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণিকুলের মধ্যে গভীর মিল রয়েছে। প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্য থাকে, যা তাকে অন্য প্রজাতি থেকে পৃথক করে।

এই স্বকীয়তাকেই আল্লাহ তায়ালা 'উম্মত' হিসেবে অভিহিত করেছেন। মানুষ যেমন একটি জাতি, পিঁপড়া, মৌমাছি কিংবা আকাশের পাখিও তেমনই একেকটি সুশৃঙ্খল জাতি। (ইবনে আশুর, আত–তাহরির ওয়াত–তানভির, ৭/২২১, তিউনিসিয়া: আল-দার আল-তুনিসিয়্যাহ, ১৯৮৪)

পৃথিবীতে বিচরণশীল যত প্রাণি আছে আর যত পাখি ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়, তারা সবাই তোমাদের মতোই একেকটি উম্মত বা জাতি।
কোরআন, সুরা আনআম, আয়াত: ৩৮

এই সাদৃশ্য মূলত কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

প্রথমত, জীবনের চক্র। মানুষ যেমন জন্ম নেয়, শৈশব পার করে যৌবনে পদার্পণ করে এবং বার্ধক্য শেষে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে; প্রাণিকুলের প্রতিটি সদস্যকেও এই একই চক্রের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

দ্বিতীয়ত, জীবিকা ও জীবনযাত্রা। আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি প্রাণীর জন্য নির্দিষ্ট রিজিক ও বেঁচে থাকার পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। পাখিরা ভোরে শূন্য পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে নীড়ে ফিরে আসে—এই শৃঙ্খলা ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম মানুষের জীবন সংগ্রামের মতোই।

তাদেরও নির্দিষ্ট পরিবার বা দল থাকে, তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে এবং নিজেদের এলাকা রক্ষা করে।

পার্থক্য ও শ্রেষ্ঠত্ব

তবে এই সাদৃশ্যের অর্থ এই নয় যে প্রাণি ও মানুষ সব দিক থেকে সমান। এই সাদৃশ্য মূলত সৃষ্টিগত ও স্বভাবজাত। চিন্তাচেতনা, জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশ এবং সভ্যতার অগ্রগতির ক্ষেত্রে মানুষ অনন্য।

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বিবেক ও বুদ্ধিবৃত্তি দান করেছেন, যা অন্য প্রাণিদের দেননি। প্রাণীরা মূলত তাদের সহজাত প্রবৃত্তির ওপর ভিত্তি করে জীবন পরিচালনা করে, কিন্তু মানুষ তার অর্জিত জ্ঞান ও চিন্তার মাধ্যমে সভ্যতা গড়ে তোলে।

এই বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাতন্ত্র্যই মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীবের মর্যাদা দান করেছে।

যখন একজন মানুষ জানতে পারে যে এই তুচ্ছ প্রাণিটিও তার মতো একজন স্রষ্টার সৃষ্টি এবং তাদেরও একটি নির্দিষ্ট সামাজিক বা প্রজাতিগত পরিচয় আছে, তখন তাদের প্রতি মানুষের হৃদয়ে দয়া ও সহমর্মিতা জাগ্রত হয়।

ইসলামে প্রাণি অধিকার

পবিত্র কোরআনের এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মূলত মুসলমানদের প্রাণিকুলের প্রতি সদয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। যখন একজন মানুষ জানতে পারে যে এই তুচ্ছ প্রাণিটিও তার মতো একজন স্রষ্টার সৃষ্টি এবং তাদেরও একটি নির্দিষ্ট সামাজিক বা প্রজাতিগত পরিচয় আছে, তখন তাদের প্রতি মানুষের হৃদয়ে দয়া ও সহমর্মিতা জাগ্রত হয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে প্রাণিরা কেবল ভোগের বস্তু নয়, বরং তারা আল্লাহর সৃষ্টির এক বিশাল অংশ যাদের প্রতি মানুষের দায়িত্ব রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রাণিদের প্রতি সদয় হওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, “এক ব্যক্তি রাস্তার ওপর তৃষ্ণার্ত একটি কুকুরকে পানি পান করিয়েছিল, ফলে আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করে জান্নাত দান করেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৬৩)

অন্যদিকে, প্রাণির প্রতি নিষ্ঠুরতার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। তিনি আরও বলেন, “এক নারীকে জাহান্নামে পাঠানো হয়েছে একটি বিড়ালের কারণে। সে বিড়ালটিকে আটকে রেখেছিল, তাকে খাবারও দেয়নি আবার ছেড়েও দেয়নি যাতে সে জমিনের পোকামাকড় খেয়ে বাঁচতে পারে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩১৮)

পরকালীন জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার

সুরা আনআমের উক্ত আয়াতের শেষ অংশে বলা হয়েছে, “অতঃপর তারা সবাই তাদের প্রতিপালকের নিকট সমবেত হবে। (সুরা আনআম, আয়াত: ৩৮)

এই অংশটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি মানুষকে সতর্ক করার জন্য বলা হয়েছে। মানুষ যদি মনে করে যে প্রাণিরা অবলা এবং তাদের ওপর অত্যাচার করলে কোনো বিচার হবে না, তবে সে ভুল ভাবছে। কেয়ামতের দিন প্রাণিদেরও উপস্থিত করা হবে এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধের মীমাংসা করা হবে।

কেয়ামতের দিন অবশ্যই পাওনাদারের পাওনা আদায় করা হবে, এমনকি শিংবিহীন ছাগলকে শিংওয়ালা ছাগল থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার দেওয়া হবে।
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮২

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “কেয়ামতের দিন অবশ্যই পাওনাদারের পাওনা আদায় করা হবে, এমনকি শিংবিহীন ছাগলকে শিংওয়ালা ছাগল থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার দেওয়া হবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮২)

যদি প্রাণিদের নিজেদের মধ্যে অবিচারের বিচার আল্লাহ তাআলা করেন, তবে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হয়ে মানুষ যদি কোনো প্রাণির ওপর জুলুম করে, তবে সেই বিচারের কাঠগড়া যে আরও কঠিন হবে, তা বলাই বাহুল্য।

তাই ইসলামের বিধান অনুযায়ী, কোনো প্রাণিকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আনন্দ শিকার করা, তাদের ক্ষুধার্ত রাখা বা ক্ষমতার অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

কোরআনের এই একটি আয়াত আধুনিক প্রাণিবিজ্ঞান ও নৈতিকতার এক বিশাল দ্বার উন্মোচন করে। এটি আমাদের শেখায় যে, মানুষ হিসেবে আমাদের চারপাশের প্রাণিকুল কেবল সম্পদ নয়, বরং তারা আমাদের মতোই আল্লাহর এক একটি বিস্ময়কর সৃষ্টি।

তাদের প্রতি আমাদের ব্যবহার হতে হবে দয়া ও ইনসাফপূর্ণ। কারণ, তারা সবাই “তোমাদের মতোই একেকটি জাতি”।