প্রকৃত নিরাপত্তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তাই বিপদ থেকে বাঁচতে ইসলাম যেমন বাস্তবসম্মত সতর্কতা অবলম্বনের শিক্ষা দিয়েছে, তেমনি কোরআন-হাদিসে বর্ণিত কিছু দোয়া ও আমলের মাধ্যমে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেও উৎসাহিত করেছে।
নিজেকে নিরাপদ রাখার এমন কয়েকটি আমল হলো:
সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস—তিনটি সুরাকে একসঙ্গে ‘তিন কুল’ বলা হয়। সুরাগুলো মুমিনের আত্মিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ আমল। সুরা ইখলাসে আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা রয়েছে। আর সুরা ফালাক ও নাসে যাবতীয় অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘তুমি সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার সুরা ইখলাস ও দুই মুআওয়িজাত (ফালাক ও নাস) পাঠ করো। তা তোমার জন্য সবকিছুর বিপরীতে যথেষ্ট হবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৮২)
ঘুমানোর আগে তিন কুল পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়ার একটি বিশেষ পদ্ধতিও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, নবীজি প্রতি রাতে বিছানায় যাওয়ার সময় দুই হাত এক করে এই তিন সুরা পাঠ করে তাতে ফুঁ দিতেন। এরপর দুই হাত দিয়ে শরীরের যতটুকু সম্ভব মুছতেন। মাথা, মুখমণ্ডল ও শরীরের সামনের অংশ থেকে শুরু করতেন। এভাবে তিনবার করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০১৭)
নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে দিনের শুরু ও শেষে একটি সংক্ষিপ্ত দোয়া তিনবার পাঠ করা যায়। এতে আল্লাহর নামের বরকতে আসমান ও জমিনের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকার প্রার্থনা রয়েছে।
দোয়াটি হলো ‘বিসমিল্লাহিল্লাজি লা-ইয়াদুররু মা’আ ইসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামায়ি, ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম।’
অর্থ: আল্লাহর নামে, যাঁর নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় এই দোয়া তিনবার পাঠ করবে, কোনো কিছু তার ক্ষতি করতে পারবে না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৮৮)
ঘর থেকে বেরিয়ে মানুষ নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। তাই বাইরে যাওয়ার সময় আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাঁর সাহায্য চাওয়া উচিত।
ঘুমের ঘোরে মানুষ নিজের চারপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অসচেতন থাকে। এ সময় আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার অন্যতম আমল হলো আয়াতুল কুরসি পাঠ করা। এতে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, জ্ঞান ও সার্বভৌমত্বের বর্ণনা রয়েছে।
আবু হোরাইরা (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি তাঁকে সদকার সম্পদ পাহারা দেওয়ার সময় আয়াতুল কুরসি পাঠের পরামর্শ দেন। এতে বলা হয়, রাতভর তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক নিযুক্ত থাকবেন এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তার কাছে আসতে পারবে না।
ঘটনাটি নবীজিকে জানানো হলে তিনি জানান, লোকটি ছিল শয়তান। সে মিথ্যাবাদী হলেও তোমাকে সত্য কথা বলেছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩১১)
সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াতকে আয়াতুল কুরসি বলা হয়। ঘুমানোর আগে এ আয়াত পাঠ করা সুন্নাহসম্মত আমল।
আয়াতুল কুরসির পাশাপাশি রাতে সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠের প্রতিও মনোযোগী হওয়া উচিত। এতে ইমান, আনুগত্য, ক্ষমা প্রার্থনা ও আল্লাহর সাহায্য কামনার শিক্ষা রয়েছে।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাতে সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করবে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০০৯)
হাদিসে ‘যথেষ্ট হবে’ কথাটির ব্যাখ্যায় আলেমরা রাতের ইবাদতের জন্য যথেষ্ট হওয়া কিংবা বিভিন্ন অনিষ্ট থেকে সুরক্ষাসহ একাধিক অর্থ উল্লেখ করেছেন। (আল–আসকালানি, ফাতহুল বারি বি-শরহি সহিহিল বুখারি, ১৫/১১৩, আর-রিসালাতুল আলামিয়্যাহ, দিমাশক, ২০১৩)
ঘর থেকে বেরিয়ে মানুষ নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। তাই বাইরে যাওয়ার সময় আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাঁর সাহায্য চাওয়া উচিত।
ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া—‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।’ অর্থ: আল্লাহর নামে বের হচ্ছি। আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।
কেউ ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এ দোয়া পড়লে তাকে বিপদাপদ ও অনিষ্ট থেকে রক্ষা করা হয় এবং শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৯৫)
আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ বিপদের আশঙ্কা উপেক্ষা করা নয়। বরং যথাসম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করে আল্লাহর সাহায্য কামনা করাই তাওয়াক্কুলের শিক্ষা।
ভ্রমণে কিংবা অন্য কোনো স্থানে গিয়ে অবস্থান করার সময়ও আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম। এ ক্ষেত্রে একটি সংক্ষিপ্ত দোয়া বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে। দোয়াটি হলো ‘আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক।’ অর্থ: আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।
রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কোনো স্থানে অবতরণ করে এই দোয়া পড়বে, সে স্থান ত্যাগ করা পর্যন্ত কোনো কিছু তার ক্ষতি করতে পারবে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭০৮)
বিপদ থেকে মুক্তির পাশাপাশি নিরাপদ জীবন কামনা করাও জরুরি। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) সকাল-সন্ধ্যায় এই দোয়া পড়া কখনো ছাড়তেন না।
দোয়া: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল আফওয়া ওয়াল আফিয়াতা ফিদ্দুনইয়া ওয়াল আখিরাহ।’
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষমা ও নিরাপত্তা চাই। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৭৪)
এ দোয়ায় ‘আফিয়াত’ শব্দটি ব্যাপক অর্থ বহন করে। এর মধ্যে বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি, সুস্থতা এবং কল্যাণকর জীবন লাভের প্রার্থনা অন্তর্ভুক্ত।
মানুষের জীবনে এমন পরিস্থিতিও আসে, যখন শত্রুর অনিষ্টের আশঙ্কা দেখা দেয়। তখন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে এই দোয়া পড়া যায়,
দোয়া: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন জাহদিল বালা, ওয়া দারাকিশ শাক্বা, ওয়া সুয়িল কাজা, ওয়া শামাতাতিল আ’দা।’
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি কঠিন বিপদ, দুর্ভাগ্য, মন্দ ফয়সালা এবং শত্রুর আনন্দের কারণ হওয়া থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩৪৭)
জীবনের অনিশ্চয়তার মধ্যে এই দোয়া মুমিনকে আল্লাহর কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে এবং তাঁর সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে শেখায়।
আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ বিপদের আশঙ্কা উপেক্ষা করা নয়। বরং যথাসম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করে আল্লাহর সাহায্য কামনা করাই তাওয়াক্কুলের শিক্ষা।
অতএব, নিরাপদ চলাচল, সতর্কতা অবলম্বন, বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নিয়মিত দোয়া ও জিকিরে অভ্যস্ত হতে হবে।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা