পাথেয়

কোরআন পাঠের গুরুত্বপূর্ণ ৬ আদব

মহান আল্লাহর কালাম পবিত্র কোরআন, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এ ব্যাপারে আল্লাহ নিজেই চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা যদি এ (কোরআন) সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহে থাকো, যা আমি আমার বান্দার ওপর অবতীর্ণ করেছি, তাহলে এর মতো একটি সুরা রচনা করে নিয়ে এসো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৩)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে নবী আপনি বলুন, এই কোরআনের অনুরূপ তৈরি করতে যদি সমস্ত মানুষ ও জিন একত্র হয় এবং তারা পরস্পর সাহায্যকারী হয়, তবু তারা কখনো এর অনুরূপ রচনা করে আনতে পারবে না।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৮৮)

পবিত্র কোরআন মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি আয়াত হেদায়েত, রহমত ও কল্যাণে পরিপূর্ণ। তাই কোরআন তিলাওয়াত করা যেমন ইবাদত, তেমনি এর যথাযথ আদব রক্ষা করাও একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এমন ছয়টি আদব নিম্নরূপ—

১. খালেস নিয়ত

নিয়তকে খালেস করার অর্থ হলো একনিষ্ঠভাবে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কোরআন তিলাওয়াত করা। ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত এটি। একনিষ্ঠতা ছাড়া আল্লাহ–তাআলা কোনো ইবাদতই কবুল করেন না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তাদের শুধু একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে আদেশ করা হয়েছে।’ (সুরা বাইয়্যিনা, আয়াত: ৫)

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কোরআন তিলাওয়াত করো এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করো ওই সম্প্রদায়ের আগমনের পূর্বে, যারা কোরআন তিরের মতো সোজা করে (দ্রুত) পড়বে এবং এর দ্বারা দুনিয়ার প্রতিদান প্রত্যাশা করবে, আখেরাতের প্রতিদান প্রত্যাশা করবে না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৮৩০)

২. অজুসহ তিলাওয়াত

 অপবিত্র অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত করা নাজায়েজ। তবে অজু ছাড়া তিলাওয়াত করা জায়েজ হলেও অজুসহ তিলাওয়াত করা আদবের অন্তর্ভুক্ত। তাই যথাসম্ভব অজু অবস্থায় তিলাওয়াত করা উচিত। এতে কোরআনের প্রতি সম্মান ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

৩. উপস্থিত মন

তিলাওয়াতের সময় পূর্ণ মনোযোগ কোরআনের প্রতি নিবদ্ধ রাখা উচিত। যা পড়বে, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করবে এবং সম্ভব হলে আয়াতের অর্থ বোঝার চেষ্টা করবে। মনোযোগ নষ্ট হয় কিংবা মন অন্যদিকে চলে যায়—এমন জনসমাগমে বসে কোরআন পাঠ করা উচিত নয়। তেমনি নাপাক ও দুর্গন্ধযুক্ত স্থান, যেমন প্রস্রাব-পায়খানার আশপাশ বা যেখানে দুর্গন্ধ আসে, সেখানে বসেও তিলাওয়াত করা অনুচিত।

৪. আউজুবিল্লাহ পড়া

তিলাওয়াত শুরু করার পূর্বে ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজিম’ পড়ে নেওয়া আবশ্যক। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘যখন তুমি কোরআন পাঠ করবে, তখন (আউজু বিল্লাহ–এর মাধ্যমে) বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইবে।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৯৮)

৫. সুন্দর কণ্ঠ

যথাসম্ভব সুন্দর কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত করা উত্তম। হজরত জুবায়ের ইবনে মুতইম (রা.) বলেন, ‘আমি মহানবী (সা.)–কে মাগরিব নামাজে সুরা তুর পড়তে শুনেছি, এত সুন্দর কণ্ঠ ও কোরআন পাঠ আমি আর কারও থেকে শুনিনি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৬৫)

৬. ধীরস্থিরভাবে তিলাওয়াত

প্রতিটি আয়াত আলাদা আলাদা করে ধীরস্থিরভাবে তিলাওয়াত করা কোরআন পাঠের গুরুত্বপূর্ণ আদব। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর তুমি কোরআনকে ধীরস্থিরভাবে (তারতিলের সঙ্গে) তিলাওয়াত করো।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ০৪)

হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.)-কে নবীজির কোরআন পাঠ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘তার পাঠ ছিল দীর্ঘ আকারের। তিনি টেনে টেনে পড়তেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৪৬)

অন্য হাদিসে এসেছে, হজরত উম্মে সালমা (রা.)-কে নবীজির কোরআন পাঠ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘তিনি একটি একটি আয়াত করে আলাদাভাবে পড়তেন।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৯২৭)

আল্লাহ–তাআলা আমাদের সবাইকে পরিপূর্ণ আদবের সঙ্গে কোরআন পাঠ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ