ইবাদত

জামাতে নফল নামাজ: কখন পড়া যাবে, কখন নয়

আল্লাহর রাসুল (সা.) জামাতে নামাজের অসামান্য ফজিলত বর্ণনা করে একে একাকী পড়ার চেয়ে সাতাশ গুণ বেশি সওয়াবের বলে অভিহিত করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৫)

তবে প্রশ্ন জাগে, জামাতের এই ফজিলত কি কেবল ফরজ নামাজের জন্য সীমাবদ্ধ, নাকি নফল নামাজের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য?

ইসলামি শরিয়তের আলোকে নফল নামাজ জামাতে আদায়ের বিষয়টি তিনটি ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে বিভক্ত।

প্রথম পর্যায়: যে নফল নামাজ জামাতে পড়া উত্তম

শরিয়তে এমন কিছু নফল বা সুন্নাত নামাজ রয়েছে, যা জামাতে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহর রাসুল (সা.) ও তাঁর সাহাবিগণ নিয়মিত তা জামাতে আদায় করেছেন। এই নামাজগুলো হলো:

১. ঈদের নামাজ: যদিও এর বিধান নিয়ে ফকিহদের মাঝে মতভেদ আছে (ওয়াজিব নাকি সুন্নাহ), তবে এটি জামাতে আদায় করা আল্লাহর রাসুলের সর্বদা পালনীয় সুন্নত। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৮৯)

২. তারাবিহ: রমজান মাসে জামাতের সঙ্গে তারাবিহ পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা। আল্লাহর রাসুল (সা.) কয়েক রাত সাহাবিদের নিয়ে জামাতে এই নামাজ পড়েছেন এবং পরবর্তীকালে ওমর (রা.)-এর যুগে এটি পুনরায় জামাতে সুসংগঠিত হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৬১)

৩. সূর্যগ্রহণের নামাজ: সূর্যগ্রহণের সময় আল্লাহর রাসুল (সা.) সাহাবিদের নিয়ে দীর্ঘ জামাতে নামাজ পড়েছেন বলে একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস রয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৬৪)

৪. বৃষ্টির নামাজ: অনাবৃষ্টির সময় ময়দানে গিয়ে জামাতে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা সুন্নত। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৯৪)

দ্বিতীয় পর্যায়: যে নফল মাঝেধ্যে জামাতে পড়া যায়

এমন কিছু নফল নামাজ আছে যা নিয়মিত জামাতে পড়ার নিয়ম নেই, তবে বিশেষ কোনো কারণে বা পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া হঠাৎ জামাত হয়ে গেলে তা জায়েজ। নবীজির জীবন থেকে এর কিছু উদাহরণ পাওয়া যায়:

  • তিনি একবার রাতে নামাজ পড়ছিলেন, এমতাবস্থায় ইবনে আব্বাস (রা.) এসে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে জামাতে শরিক হন। একইভাবে ইবনে মাসউদ (রা.) এবং হুজাইফা (রা.)-ও তাঁর সঙ্গে নফল নামাজে শরিক হয়েছেন।

  • সাহাবি উতবান ইবনে মালেক (রা.)-এর অনুরোধে আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁর বাড়িতে গিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে জামাতে নফল নামাজ পড়েছিলেন যেন তিনি সেটিকে নামাজের স্থান বানাতে পারেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৫৮)

ফকিহগণের মতে, সাধারণ নফল নামাজ মাঝে মাঝে জামাতে পড়া জায়েজ যদি তা প্রচার-প্রসার বা ইশতিহার দিয়ে লোক জমায়েত করার মাধ্যমে না হয়। মূলত শিক্ষাদান বা বিশেষ কোনো প্রয়োজনে এমনটি করা যেতে পারে।

তৃতীয় পর্যায়: যে নফল নামাজ জামাতে পড়া বর্জনীয়

যেসব নফল নামাজের জন্য ইসলাম জামাতের বিধান রাখেনি, তা নিয়মিত জামাতের রূপ দেওয়া বা ঘটা করে ঘোষণা দিয়ে জামাতে পড়া বৈধ নয়। যেমন:

  • পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে-পরের সুন্নাতসমূহ।

  • তাহিয়াতুল মসজিদ, মসজিদে ঢুকে আদব হিসেব পড়া দুই রাকাত নামাজ।

  • ইশরাক, চাশত বা ইস্তিখারার নামাজ।

নবীজির সাধারণ হেদায়েত হলো—নফল নামাজ একাকী ঘরে পড়া। তিনি বলেছেন, “হে লোকসকল, তোমরা তোমাদের ঘরে (নফল) নামাজ পড়ো। কেননা ফরজ নামাজ ছাড়া মানুষের শ্রেষ্ঠ নামাজ হলো তা, যা সে নিজ ঘরে আদায় করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭২৯০)

নফল নামাজ একাকী পড়াই ইখলাস বা নিষ্ঠার জন্য অধিকতর সহায়ক এবং রিয়া বা লোকদেখানো মানসিকতা থেকে মুক্ত থাকার উপায়।

নফল জামাতেও কি সাতাশ গুণ সওয়াব

মুহাদ্দিস ও ফকিহদের মতে, নফল নামাজের জন্য যেসব জামাত শরিয়তসম্মত (যেমন তারাবিহ বা কুসুফ), সেই জামাতগুলোতে শরিক হলে সাধারণ জামাতের সওয়াব পাওয়ার আশা করা যায়।

তবে যেসব নফলের জন্য জামাত বৈধ নয়, সেখানে জোরপূর্বক জামাত কায়েম করলে সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।