প্রতিষ্ঠানের কর্মী কি ‘রিসোর্স’ না ‘আমানত’

অনেক সময় দেখা যায়, একটা প্রতিষ্ঠানের মালিক মুসলিম, কর্মীদের ৯০ শতাংশ মুসলিম; তবু সেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধের কোনো ছাপ থাকে না। কেন?

হতে পারে অফিসে নামাজঘর আছে, আজান শোনা যায়, অনুষ্ঠানে কোরআন তেলাওয়াত হয়। কিন্তু একটু গভীরে দেখলেই বোঝা যায়, সময়ের বিন্যাস, ভাষা, ব্যবস্থাপনার রীতি, সাফল্যের সংজ্ঞা—সবকিছুই ধার করা এমন এক মডেল থেকে, যা বানিয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিশ্বদৃষ্টির মানুষ।

কোনো ব্যবস্থাপনা কাঠামোই আসলে নিরপেক্ষ নয়—প্রতিটির পেছনে তার নির্মাতার একটা বিশ্বাস লুকিয়ে থাকে। সেই বিশ্বাস কি মানুষকে আল্লাহর সম্মানিত বান্দা ভাবে, নাকি স্প্রেডশিটের একটা ‘রিসোর্স’? এই প্রশ্নটা না করলে যা থাকে, তা একটা ধর্মহীন কাঠামো—যার ওপর শুধু কিছু ধর্মীয় প্রতীক জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

এটা কীভাবে হলো, তার একটা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাও আছে। ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের শেষ দিকে ইউরোপকে ধরার তাড়নায় মুসলিম সমাজ ধীরে ধীরে আল্লাহ–ভরসা আর অল্পেতুষ্টির মতো গুণকে ‘অলসতা’ ভাবতে শুরু করে, আর উৎপাদনশীলতাকেই নতুন মানদণ্ড করে তোলে। (মেলিস হাফেজ, ইনভেন্টিং লেজিনেস, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২১)

সেই ধারা আজও চলছে—মুসলিম বিশ্বের অনেক নেতাই পাশ্চাত্যের বিজনেস স্কুলে পড়ে এসে নিউইয়র্কে যা কার্যকর, তা-ই কোনো ফিল্টার ছাড়া নিজের প্রতিষ্ঠানে বসিয়ে দিচ্ছেন।

সমস্যাটা এই নয় যে আমরা পশ্চিম থেকে শিখেছি। সমস্যা হলো, শেখার সময় নিজেদের ফিল্টারটাই ব্যবহার করিনি।

রিসোর্স নয়, আমানত

এখানেই আসল প্রশ্নটা—আমরা কর্মীকে কী ভাবি? ‘হিউম্যান রিসোর্স’ শব্দটা আমরা অবলীলায় ব্যবহার করি। কিন্তু যে মানুষকে আল্লাহ নিজের রুহ ফুঁকে সম্মানিত করেছেন, তাকে আমরা নামিয়ে আনি একটা রিসোর্সে।

কর্মীকে রিসোর্স না ভেবে আল্লাহর দেওয়া আমানত ভাবলে নিয়োগ, ছাঁটাই আর সুযোগ-সুবিধার পুরো নীতিই বদলে যায়। প্রতিষ্ঠান তখন শুধু মুনাফার জায়গা থাকে না, হয়ে ওঠে মানুষের রিজিক উপার্জনের একটা মাধ্যম, যার হিসাব একদিন দিতে হবে।

জ্ঞান অবশ্যই অন্য সংস্কৃতি থেকে নেওয়া যায়, তবে ইসলামি ঐতিহ্যে প্রজ্ঞাকে মুমিনের হারানো সম্পদ বলা হয়েছে, যেখানেই পাওয়া যাক তা গ্রহণ করার কথা বলা আছে।

সুতরাং সমস্যাটা এই নয় যে আমরা পশ্চিম থেকে শিখেছি। সমস্যা হলো, শেখার সময় নিজেদের ফিল্টারটাই ব্যবহার করিনি। সোনালি যুগের মুসলিম মনীষীরা গ্রিক জ্ঞান অনুবাদ করেননি স্রেফ—তাকে বিশ্লেষণ করে তাওহিদি কাঠামোয় নতুন রূপ দিয়েছিলেন।

আমাদের সকাল ৯টা-৫টার কর্মঘণ্টাও তো একটা শিল্পবিপ্লব-যুগের ইউরোপীয় মডেল; অথচ একজন মুসলিমের দিন তো ঘোরে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে ঘিরে।

আমাদের সকাল ৯টা-৫টার কর্মঘণ্টাও তো একটা শিল্পবিপ্লব-যুগের ইউরোপীয় মডেল; অথচ একজন মুসলিমের দিন তো ঘোরে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে ঘিরে।

কাঠামোটা বাস্তবে কেমন হতে পারে

কয়েকটা দিক দিয়ে শুরু করা যায়:

  • কর্মঘণ্টা যেন নামাজের সময়কে বিঘ্নিত না করে

  • মুনাফার চেয়ে বারাকাহকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া

  • নেতৃত্বকে শাসনের বদলে সেবা ভাবা

  • কর্মীর আত্মিক যত্নকে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অংশ করা

  • গ্রাহকের সঙ্গে কৌশল নয়, সততা দিয়ে কথা বলা

এর কোনোটাই অসম্ভব নয়—দরকার শুধু সচেতন একটা সিদ্ধান্ত যে আমরা আর কারও মডেল ধার করব না, নিজেদের বিশ্বাস থেকেই গড়ব।

এই বদলটা একা কোনো প্রতিষ্ঠান বা পরামর্শকের কাজ নয়। আলেম, গবেষক, উদ্যোক্তা আর তরুণ শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে বসে ভাবতে হবে।

ব্যবসা, অর্থ আর সময়কে আল্লাহকেন্দ্রিক করে সাজালে একটা প্রতিষ্ঠান দুনিয়াতেও সফল হয়, পরকালেও মিজানের পাল্লা ভারী করে। আল্লাহ আমাদের এই পথে চলার তাওফিক দিন।