আল্লাহ তাআলা তাকে এমন এক রাজত্ব দান করেছিলেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে অতুলনীয়। তবে এই বিশাল ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তাকে বিভিন্ন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
সুরা সাদ-এ আল্লাহ তাআলা সুলাইমান (আ.)-এর একটি বিশেষ পরীক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে, “আমি সুলাইমানকে পরীক্ষা করলাম এবং তার সিংহাসনের ওপর একটি দেহ রেখে দিলাম; অতঃপর সে বিনীতভাবে আমার অভিমুখী হলো।” (সুরা সাদ, আয়াত: ৩৪)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় এমন কিছু গালগল্প ও ভিত্তিহীন ইসরাইলি বর্ণনা ঢুকে পড়েছে, যা একজন মহান নবীর মর্যাদার সঙ্গে কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ নয়।
ফিতনা হলো কোনো ব্যক্তির অবস্থার এমন চরম অস্থিরতা, যার মাধ্যমে তার ধৈর্য ও দৃঢ়তার পরিমাপ প্রকাশিত হয়।
নবী সুলাইমানের সেই পরীক্ষার স্বরূপ বুঝতে হলে প্রথমে ‘ফিতনা’ শব্দের ভাষাতাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক অর্থ বোঝা জরুরি। ইবনে আশুর সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, “ফিতনা হলো কোনো ব্যক্তির অবস্থার এমন চরম অস্থিরতা, যার মাধ্যমে তার ধৈর্য ও দৃঢ়তার পরিমাপ প্রকাশিত হয়।” (আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ২৩/২৪৫, দারু তিউনিসিয়া লিন-নাশর, তিউনিস, ১৯৮৪)
সুলাইমান (আ.)-এর সিংহাসনের ওপর ‘একটি দেহ’ রাখার বিষয়টি অনেক তাফসিরকারককে বিভ্রান্ত করেছে। ফলে সেখানে স্থান পেয়েছে রূপকথা সদৃশ নানা কাহিনি। অথচ সুলাইমান (আ.)-এর সুউচ্চ মর্যাদা এসব অলীক কল্পনা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। (আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ২৩/২৪৬, দারু তিউনিসিয়া লিন-নাশর, তিউনিস, ১৯৮৪)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সবচেয়ে অদ্ভুত ও ভিত্তিহীন গল্পগুলোর একটি হলো— সুলাইমান (আ.) তার এক সন্তানকে জিন ও শয়তানের হাত থেকে বাঁচাতে মেঘের আড়ালে বা বাতাসের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু তবুও মৃত্যু থেকে তাকে রক্ষা করা যায়নি এবং সেই মৃত শিশুটিই ‘দেহ’ হিসেবে তার সিংহাসনে এসে পড়েছিল।
এই গল্পটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, বিখ্যাত কবি আল-মা’আরি তার কবিতায় মানুষের এই অলীক ধারণাকেই ছন্দবদ্ধ করেছিলেন।
আরেকটি হলো, ওহাব বিন মুনাব্বিহ থেকে বর্ণিত একটি কাহিনি যা মূলত ইহুদিদের ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’ বা ‘সফরুল মুলুক’ (রাজাবলি) থেকে সংগৃহীত। সেখানে দাবি করা হয়েছে, সুলাইমান (আ.) সিদনের রাজার কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন এবং সেই স্ত্রীর প্ররোচনায় তার প্রাসাদে মূর্তিপূজা চলত। নাউজুবিল্লাহ।
আল্লাহর শপথ, তিনি যদি ‘ইনশাআল্লাহ’ বলতেন, তবে তারা সবাই আল্লাহর পথে অশ্বারোহী হয়ে জিহাদ করত।সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮১৯
এই ধরনের বর্ণনাকে তাফসিরকারকগণ কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং এগুলোকে ‘মানুষের কল্পনাপ্রসূত বিভ্রম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এই পরীক্ষার ব্যাখ্যায় সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা হলো, রাসুল (সা.) বলেছেন, “একদা নবী সুলাইমান বললেন, আজ রাতে আমি আমার নব্বইজন স্ত্রীর কাছে যাব; তাদের প্রত্যেকেই একজন করে পুত্রসন্তান জন্ম দেবেন, যারা আল্লাহর পথে অশ্বারোহী যোদ্ধা হয়ে জিহাদ করবেন।
তখন তার সঙ্গী (ফেরেশতা) তাকে বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ’ (আল্লাহ যদি চান) বলুন। কিন্তু তিনি তা বলতে ভুলে গেলেন। ফলে মাত্র একজন স্ত্রী ব্যতীত আর কেউ সন্তানসম্ভবা হলেন না, এমনকি তিনিও একটি ‘অর্ধমানব’ (শরীরের অর্ধেক অংশ) জন্ম দিলেন। আল্লাহর শপথ, তিনি যদি ‘ইনশাআল্লাহ’ বলতেন, তবে তারা সবাই আল্লাহর পথে অশ্বারোহী হয়ে জিহাদ করত।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮১৯)
অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য মুফাসসির এই হাদিসের ‘অর্ধমানব’ বা খণ্ডিত শিশুটিকেই কোরআনে বর্ণিত ‘সিংহাসনের ওপর রাখা দেহ’ বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, অসম্পূর্ণ সন্তানটি ধাত্রী এনে তাঁর সিংহাসনের ওপর রেখেছিল। এটি ছিল তার জন্য একটি পরীক্ষা, কারণ তিনি ‘ইনশাআল্লাহ’ বলতে ভুলে গিয়েছিলেন এবং তার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়নি। (আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ২৩/২৪৭, দারু তিউনিসিয়া লিন-নাশর, তিউনিস, ১৯৮৪)
যদিও ইবনে আশুর এখানে একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন তুলেছেন যে আল্লাহর রাসুল তো এই হাদিস বর্ণনা করার সময় কোথাও বলেননি, এটি সুরা সাদ-এর ৩৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা। এমনকি ইমাম বুখারি বা ইমাম তিরমিজিও তাদের কিতাবের ‘তাফসির’ অধ্যায়ে এই হাদিসটি উল্লেখ করেননি।
তবে সবচেয়ে শক্তিশালী মত হলো, এটি তার কোনো আধ্যাত্মিক বা প্রশাসনিক পরীক্ষা ছিল, যার পর তিনি আরও বেশি করে আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়েছিলেন।
আরেকটি এর অর্থ হতে পারে, নবী সুলাইমান কঠিন কোনো রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যার ফলে তিনি চলনশক্তি হারিয়ে প্রায় মৃতদেহের মতো সিংহাসনে পড়ে ছিলেন।
অথবা এর অর্থ হতে পারে তার রাজত্বে এমন কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল যা তাকে সাময়িকভাবে ক্ষমতাহীন করে দিয়েছিল।
তবে সবচেয়ে শক্তিশালী মত হলো, এটি তার কোনো আধ্যাত্মিক বা প্রশাসনিক পরীক্ষা ছিল, যার পর তিনি আরও বেশি করে আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন, “অতঃপর সে বিনীতভাবে আমার অভিমুখী হলো।” (সুরা সাদ, আয়াত: ৩৪)
সুলাইমান (আ.)-এর এই ঘটনা থেকে আমাদের জন্য বড় শিক্ষা হলো, কোনো কাজ করার আগে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলা বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। এমনকি একজন নবীকেও আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হয়।
দ্বিতীয়ত, কোরআনের তাফসিরের ক্ষেত্রে ইসরাইলি বা ভিত্তিহীন বর্ণনা গ্রহণ করার ব্যাপারে আমাদের চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যে বর্ণনা একজন নবীর চারিত্রিক পবিত্রতাকে ক্ষুণ্ণ করে, তা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।