ইফতারির আয়োজন দেখাচ্ছেন বসনিয়ান এক নারী
ইফতারির আয়োজন দেখাচ্ছেন বসনিয়ান এক নারী

দেশে দেশে ইফতার | বসনিয়া

যে দেশে ইফতার মানে ‘সোমুন’ রুটির টান

বসিনয়া ও হার্জেগোভিনা ইউরোপের এক অদ্ভুত মায়াবী দেশ। বসন্তের শেষ বিকেলের হালকা হিমেল হাওয়ায় যখন সারায়েভো শহরের প্রাচীন পাথুরে পথগুলোয় আউড়াতে থাকে ইতিহাসের ঘ্রাণ, তখন সেখানে রমজান আসে অন্যরকম আভিজাত্য নিয়ে।

স্থানীয়রা একে ভালোবেসে ডাকেন ‘ইউরোপের জেরুজালেম’। পাহাড় ঘেরা এই উপত্যকায় ইফতার কেবল ক্ষুধার নিবৃত্তি নয়, বরং শতাব্দী প্রাচীন এক বলকান ঐতিহ্যের উৎসব।

হলুদ দুর্গের সেই সংকেত

সারায়েভোর আকাশে সূর্য যখন পাহাড়ের আড়ালে মুখ লুকায়, ঠিক তখনই শহরের ‘জলোতি তাবিয়া’ বা হলুদ দুর্গ থেকে গর্জে ওঠে একটি কামান। কয়েকশ বছরের পুরনো এই কামানের তোপধ্বনিই জানান দেয় ইফতারের সময় হয়েছে।

কামানের গোলা ছোঁড়ার পর যখন শহরের শত শত মসজিদের মিনারে সাদা বাতি জ্বলে ওঠে, তখন সারায়েভোকে মনে হয় পাহাড়ের কোলে জমানো একরাশ জোনাকি।

এই দৃশ্য দেখার জন্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পাহাড়ের ঢালে ভিড় জমান, সঙ্গে নিয়ে আসেন রঙিন ফানুস।

কামানের গোলা ছোঁড়ার দৃশ্য দেখতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পাহাড়ের ঢালে ভিড় জমান

সোমুন রুটির টান

রমজানের বসনিয়ায় সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো ‘সোমুন’। এটি এক বিশেষ ধরনের রুটি, যার ওপর ছিটানো থাকে কালোজিরা।

ইফতারের ঘণ্টাখানেক আগে সারায়েভোর আলিব্যাকোভিক বা ভাটনিকের মতো পুরনো পাড়াগুলোর বেকারিতে লম্বা লাইন পড়ে যায়। ওভেন থেকে বের হওয়া টাটকা সোমুনের সুবাস পুরো শহরের বাতাসে ভেসে বেড়ায়।

বসনিয়ানরা বলেন, এই ঘ্রাণই হলো রমজানের ঘ্রাণ।

ইফতার শুরু হয় মূলত খেজুর আর পানি দিয়ে। এরপর দস্তরখানে আসে ‘তোপা’। এটি পনির, মাখন আর ক্রিমের এক রাজকীয় মিশ্রণ। গরম সোমুন রুটি ছিঁড়ে এই গলিত পনিরে ডুবিয়ে মুখে দেওয়া বসনিয়ানদের প্রিয় রীতি।

ঐতিহ্যবাহী সোমুন রুটি

দস্তরখানের অন্যান্য পদ

খাবারের তালিকায় তুর্কি ও ইউরোপীয় ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায়। ইফতারের পাতে শুরুতেই থাকে ‘বেগোভা চোরবা’। মুরগির মাংস আর ঢেঁড়স দিয়ে তৈরি এই ঘন স্যুপটি আভিজাত্যের প্রতীক।

এরপর আসে ‘চেভাপি’—ছোট ছোট কাবাব যা সোমুন রুটির ভেতরে পেঁয়াজ আর সস দিয়ে পরিবেশন করা হয়। এছাড়া থাকে ‘ডোলমা’ (মাংসের পুর ভরা সবজি) এবং মাংস ও পনিরের নানা রকম ‘পিটা’ বা পেস্ট্রি।

সবশেষে আসে মিষ্টিমুখের পালা। আস্ত আপেল সেদ্ধ করে তার ভেতর আখরোটের পুর দিয়ে তৈরি ‘তুফাহিয়া’ কিংবা চিনির সিরায় ডুবানো বাকলাভা—এসব ছাড়া বসনিয়ানদের ইফতার পূর্ণ হয় না।

কফি ও আতিথেয়তার গল্প

ইফতারের পর সারায়েভোর ক্যাফেগুলোয় মানুষের মেলা বসে। সেখানে চলে ঐতিহ্যবাহী ‘বসনানস্কা কাফা’ বা বসনিয়ান কফি। তামা বা পিতলের তৈরি শৈল্পিক ‘জেজভা’ থেকে কাপে কফি ঢালতে ঢালতে চলে আড্ডা। 

এখানে রমজান কেবল মুসলমানদের নয়, বরং এক দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। বাড়ির দরজায় প্রতিবেশীর পাঠানো ইফতারের প্লেটগুলো মনে করিয়ে দেয় যে, ভালোবাসা ও সহমর্মিতাই এই জনপদের আসল সৌন্দর্য।

সারায়েভোর পথেঘাটে রমজানের সাজসজ্জা