সুন্নত

নবীজির ঘুমের পদ্ধতি

ঘুমানোর মতো প্রাত্যহিক কাজের ক্ষেত্রেও মহানবী (সা.) আমাদের চমৎকার সব দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। নবীজির ঘুমের পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, যা শারীরিক সুস্থতা ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য সহায়ক।

তিনি অতিরিক্ত ঘুমানোর পক্ষপাতি ছিলেন না, আবার শরীরের প্রয়োজনীয় বিশ্রাম থেকেও নিজেকে বঞ্চিত করতেন না।

ইমাম ইবনুল কাইয়িম এ বিষয়ে লিখেছেন, নবীজি (সা.) তখনি ঘুমাতেন যখন ঘুমের একান্ত প্রয়োজন হতো। তিনি মাটির ওপর, চাটাইয়ে কিংবা সাধারণ বিছানায়—সব অবস্থাতেই ঘুমানোর অভ্যাস রেখেছিলেন। (জাদুল মাআদ, ১/১৫৬, মুয়্যাসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ১৯৯৪)

নবীজির বিছানা

তাঁর শয্যা ছিল সাধাসিধা। আয়েশা (রা.) বলেন, “নবীজির বিছানা ছিল চামড়ার, যার ভেতরে ছিল খেজুর গাছের আঁশ।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৫৬

একবার হজরত ওমর (রা.) নবীজির পিঠে চাটাইয়ের দাগ দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। নবীজি (সা.) তাঁকে বললেন, “ওমর, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে তাদের জন্য দুনিয়া আর আমাদের জন্য আখেরাত?” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১২১২)

যেভাবে ঘুমাতেন তিনি

সময়: নবীজি (সা.) রাতের প্রথম অংশে ঘুমানোর চেষ্টা করতেন এবং শেষ অংশে ইবাদতের জন্য জেগে উঠতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৯)

অজু: ঘুমানোর আগে অজুর মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করা তাঁর স্থায়ী অভ্যাস ছিল। তিনি বলতেন, “যখন তুমি বিছানায় যাবে, তখন নামাজের অজুর মতো অজু করে নাও।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭)

পরিচ্ছন্নতা: তিনি ঘুমানোর আগে বিছানা ঝেড়ে নিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩২০)

ভঙ্গি: বিছানায় যাওয়ার পর তিনি ডান কাতে শুয়ে ডান হাত গালের নিচে রাখতেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৯৫)

চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, ডান কাতে শোয়া হৃদপিণ্ড ও পাকস্থলীর জন্য অধিক আরামদায়ক।

ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি লিখেছেন, ডান কাতে শোয়া অধিকতর উপকারী, কারণ এতে মানুষের ঘুম পাতলা হয় এবং ইবাদতের জন্য দ্রুত জাগা সহজ হয়। (ফাতহুল বারি, ১১/১১৩, দারুল মারিফাহ, বৈরুত)

ঘুমের আগের আমল

তেলাওয়াত: ঘুমের আগে তিনি সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে সারা শরীরে মুছে নিতেন। এই আমলটি তিনি তিনবার করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০১৭)

তিনি সুরা সাজদাহ, সুরা মুলক, সুরা ইসরা ও সুরা জুমার তেলাওয়াত না করে ঘুমাতেন না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৯২১)

দোয়া: তাঁর পঠিত প্রসিদ্ধ দোয়াগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো: “আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া আহ্ইয়া” (হে আল্লাহ, আপনার নামেই আমি মরি ও বাঁচি)। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭১১)

জিকির: তিনি তাসবিহে ফাতেমি (৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৪ বার আল্লাহু আকবার) পাঠ করার নির্দেশ দিতেন।

রাতে ঘুমের মধ্যে পাশ পরিবর্তনের সময়ও তিনি জিকির করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি রাতে ঘুমের মধ্যে নড়াচড়া করলে বলতেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল ওয়াহিদিল কাহ্হার...” (এক ও পরাক্রমশালী আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই)। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৫৫৩০)

জেগে কী আমল করতেন

ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর নবীজি (সা.) আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন।

বলতেন, “আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আহ্‌ইয়ানা বা’দা মা আমাতানা ওয়া–ইলাইহিন নুশূর” (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের মৃত্যুর (ঘুমের) পর পুনরায় জীবন দান করেছেন)। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩১২)

জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি মিসওয়াক করে মুখ পরিষ্কার করে নিতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫)।

নবীজির ঘুমের এই সুন্নতগুলো কেবল ধর্মীয় অনুশাসন নয়, বরং এগুলো অনুসরণ করলে মানুষের শরীর ও মনে প্রশান্তি নেমে আসে। একজন মুমিনের জন্য ঘুম কেবল বিশ্রাম নয়, সুন্নাহ অনুযায়ী হলে এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।