মিনা, মক্কা; যেখানে এখন কোরবানি করা হয়ে থাকে
মিনা, মক্কা; যেখানে এখন কোরবানি করা হয়ে থাকে

সিরাত

ফারান উপত্যকা ও কোরবানির স্থান

তাওরাতে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে যে ইসমাইল (আ.) ফারান উপত্যকায় বসতি স্থাপন করেছিলেন। কোনো কোনো খ্রিষ্টান লেখক বলতে চান যে ফিলিস্তিনের দক্ষিণে অবস্থিত মরু এলাকার নাম ‘ফারান’। কাজেই ইসমাইল (আ.)–এর আরবে গমনের ঘটনার বাস্তবতা নেই।

কোনো কোনো গবেষক যুক্তি দেন যে ইসমাইল নয়; বরং ইসহাককে কোরবানি করা হয়েছে। ইসলামের ব্যাখ্যাকারগণ সেসবের যথোপযুক্ত উত্তর ইতিমধ্যে দিয়েছেন। ফলে এখানে শুধু ফারানের ভৌগোলিক পরিচয় ও স্মৃতি চিহ্নিতকরণ এবং নবীজির জীবনে সেসবের কতটুকু প্রভাব ছিল তা আলাপ করব।

আসুন প্রথমে ফারান উপত্যকার পরিচয় জেনে নিই:

আরবের সব ভূগোলবিদের সর্বসম্মত মতে, ‘ফারান’ হেজাজের একটি পাহাড়ের নাম। এ জন্য মক্কাভূমিকে ‘ওয়াদিয়ে-ফারান’ বা ফারান উপত্যকা বলা হয়। (মু’জামুল বুলদান)

খ্রিষ্টান লেখকগণ এ সম্পর্কে নানা প্রকার পরস্পরবিরোধী মন্তব্য করে বিষয়টিকে জটিল করে তুলেছেন। প্রসঙ্গত ইবরাহিম (আ.)–এর যুগে আরবের সীমান্ত কী ছিল, সেটা তুলে ধরা যায়।

আরবের সব ভূগোলবিদের সর্বসম্মত মতে, ‘ফারান’ হেজাজের একটি পাহাড়ের নাম। এ জন্য মক্কাভূমিকে ‘ওয়াদিয়ে-ফারান’ বা ফারান উপত্যকা বলা হয়।

ফরাসসি পণ্ডিত মঁসিয়ে লি বন তাঁর তামাদ্দুনে-আরব (La Civilisation des Arabes) গ্রন্থে লিখেছেন, ‘এ আরব উপদ্বীপের উত্তর সীমারেখা পরিষ্কার এবং সহজ নয়। এ সীমারেখাটি এভাবে টানা যেতে পারে যে ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী গাজা শহর থেকে একটি রেখা টেনে দক্ষিণ দিকে লুত সাগর বা মৃত সাগর পর্যন্ত যেতে হবে। সেখান থেকে দামেস্ক, দামেস্ক থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত এবং ফোরাত নদীর উপকূল হয়ে পারস্য উপসাগরের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে হবে। অনুরূপ সীমারেখাটিকে আরব দেশের উত্তর সীমারেখা বলা যেতে পারে।’

এ বর্ণনামতে দেখা যায় যে আরবের হেজাজ এলাকাকে ফারানের অন্তর্ভুক্ত মনে করা অযৌক্তিক নয়।

১৮৫০ সালের মক্কার একটি চিত্র

তাওরাতে ইসমাইল (আ.)-এর আবাসস্থলের বর্ণনা এভাবে দেওয়া হয়েছে, ‘আর হুয়াইলা থেকে শূর (সিরিয়া) যাওয়ার পথে মিসরের সম্মুখস্থ ভূখণ্ডে তিনি বাস করতেন।’

এ সীমা নির্ধারণীতে মিসরের সম্মুখস্থ ভূখণ্ডে আরবদেশেই হতে পারে।

যাবুর কিতাবে ৬ষ্ঠ খণ্ড ৮৪ পৃষ্ঠায় আছে, ‘বাক্কার উপত্যকা অতিক্রম করার সময় একটি কূপের কথা বলা হয়, যা বরকত ও কল্যাণের দ্বারা মাওরাকে বেষ্টন করে রেখেছে, শক্তি ও উন্নতির পথে তা দ্রুত ধাবমান।’

যাবুরের উদ্ধৃতাংশের পূর্ববতী শ্লোকে দাউদ (আ.) পবিত্র মক্কাভূমি, মাওরা যাওয়া এবং ইসমাইল (আ.)-এর কোরবান হওয়ার স্থান সম্পর্কে আগ্রহ এবং আবেগ প্রকাশ করেছেন।

পূর্ববর্তী বর্ণনাটি দেখুন, ‘দাউদ (আ.) আল্লাহর কাছে নিবেদন করলেন, ওগো সব বাহিনীর মহান প্রভু, তোমার ঘর কত মধুর, কত আনন্দময়, আমার হৃদয়মন আল্লাহর ঘর দেখতে উদ্গ্রীব। আমার মন আল্লাহর ঘরের প্রেমিক! হে প্রভু, তোমার নামে তোমার দাস যে স্থানে জান কোরবান করতে প্রস্তুত হয়েছিল, সে স্থানটি কত মহান। ওগো প্রভু, ওগো আল্লাহ, ধন্য হোক তারা, যারা সর্বদা তোমার ঘরে অবস্থান করছে। তোমার নামের পবিত্রতা ঘোষণা করছে।’

তিনটি বৈশিষ্ট্যই মক্কায় পাওয়া যাচ্ছে। কারণ, মক্কায় আল্লাহর ঘর রয়েছে, যার আরেক নাম বাক্কা এবং দাউদের বসতি ফিলিস্তিন থেকে তা দীর্ঘ ভ্রমণের দূরুত্বে অবস্থিত।

দাউদ (আ.)-এর অনুরূপ প্রার্থনার পরপরই ‘বাক্কা’ সংবলিত শ্লোকটি বিদ্যমান। এখন গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় যে দাউদ (আ.) সে স্থানেই যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছিলেন, যে স্থানের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে—আল্লাহর ঘর, স্থানটি ‘ওয়াদি-বাক্কা’, দাউদের বাসস্থান থেকে দীর্ঘ ভ্রমণ স্থান ও মাওরা নামক কোরবানির একটি স্থান থাকা।

প্রথম তিনটি বৈশিষ্ট্যই মক্কায় পাওয়া যাচ্ছে। কারণ, মক্কায় আল্লাহর ঘর রয়েছে, যার আরেক নাম বাক্কা এবং দাউদের বসতি ফিলিস্তিন থেকে তা দীর্ঘ ভ্রমণের দূরুত্বে অবস্থিত।

পবিত্র কোরআনের চারটি আয়াত পড়ুন:

১. নিশ্চয় মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা তো বাক্কায়, বরকতময় ও সৃষ্টিজগতের দিশারি হিসেবে। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৬)

২. আর তোমরা হজ ও ওমরাহ পূর্ণ করো আল্লাহর উদ্দেশে। অতঃপর যদি তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হও তাহলে সহজলভ্য হাদঈ প্রদান করো। আর তোমরা মাথা মুণ্ডন কোরো না যে পর্যন্ত হাদঈ তার স্থানে না পৌঁছে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৬)

৩. হে ইমানদারগণ, ইহরামে থাকাকালে তোমরা শিকার–জন্তু হত্যা কোরো না, তোমাদের মধ্যে কেউ ইচ্ছা করে সেটাকে হত্যা করলে যা সে হত্যা করল তার বিনিময় হচ্ছে অনুরূপ গৃহপালিত জন্তু, যার ফয়সালা করবে তোমাদের মধ্যে দুজন ন্যায়বান লোক—কাবাতে পাঠানো হাদঈরূপে এসব চতুষ্পদ জন্তুগুলোতে তোমাদের জন্য নানাবিধ উপকার রয়েছে এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত; তারপর তাদের জবাইয়ের স্থান হচ্ছে প্রাচীন ঘরটির কাছে। (সুরা হাজ্জ, আয়াত: ৩৩)

মারওয়া পাহাড়ের একটি অংশ

প্রিয় পাঠক, একটি প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে তাই না? কোথায় সে মাওরা? মক্কায় কাবার লাগোয়া কিংবা আশপাশে কোথাও কি মাওরা আছে, তাহলে?

তাওরাতে কোরবানির স্থানের নাম ‘মুরিয়া’ বলা হয়েছে। ইহুদিরা বলছে যে এটি ওই স্থান, যেখানে হাইকলে-সোলায়মানির ভিক্তি স্থাপন করা হয়েছিল। খ্রিষ্টানরা বলছে যে এটি ওই স্থানের নাম যেখানে ঈসা (আ.)-কে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল।

কিন্তু পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা এ দুটি দাবিকে ভুল প্রমাণিত করেছেন। স্যার স্ট্যানলি লিখেছেন, ‘ইবরাহিম (আ.) প্রাতঃকালেই স্বীয় তাঁবু থেকে বের হয়ে যে স্থানে গেলেন, যেখানে আল্লাহ তাঁকে কোরবানি করার আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তা ইহুদিদের দাবি মোতাবেক মুরিয়া পাহাড় ছিল না, আর খ্রিষ্টানদের ধারণা অনুযায়ী তা পবিত্র সমাধি গির্জার নিকটও স্থান নয়। খ্রিষ্টানদের এ অনুমান তুলনামূলকভাবে ইহুদিদের অনুমান অপেক্ষাও অবাস্তব। আর আরাফাতের পাহাড় (মিনা উদ্দেশ্য ছিল) সম্পর্কিত মুসলিমদের দাবি আরও বেশি অবাস্তব। খুব সম্ভব এ স্থানটি জারিজিমের পাহাড়ে অবস্থিত। কোরবানির স্থানের বৈশিষ্ট্যাবলির সঙ্গে এ স্থানটির বিশেষ সামঞ্জস্য রয়েছে।’

ওপরের বর্ণনার দ্বারা এতটুকু তো অবশ্যই প্রমাণিত হলো যে ‘মুরিয়া’-কে নির্দিষ্ট করার ব্যাপারে ইহুদি ও খ্রিষ্টান উভয়ের দাবিই ভ্রান্ত। বাকি, মুসলিমদের দাবি কী? সে দাবি কি অভ্রান্ত?

দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ায় এবং কিছু লোকের অবহেলায় শব্দের আসল রূপটি বিকৃত হয়ে গেছে কিংবা ইচ্ছাপূর্বক বিকৃত করেছে। শব্দটি ‘মুরিয়া’ হতে রূপান্তরিত হয়ে ‘মাওরা’ হয়েছে।

বস্তত তাওরাতের কোনো কোনো সংস্করণে মুরিয়ার অনুবাদ করা হয়েছে ‘উচ্চ টিলাযুক্ত স্থান’ আবার অন্য সংস্করণে ‘উচ্চভূমি’। কোনো সংস্করণে আছে ‘স্বপ্নে নির্দেশিত স্থান’। কিন্তু বিচক্ষণ ব্যক্তিরা এটিকে একটি স্থানের নামরূপেই বুঝেছেন।

অবশ্য দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ায় এবং কিছু লোকের অবহেলায় শব্দের আসল রূপটি বিকৃত হয়ে গেছে কিংবা ইচ্ছাপূর্বক বিকৃত করেছে। শব্দটি ‘মুরিয়া’ হতে রূপান্তরিত হয়ে ‘মাওরা’ হয়েছে। এরূপ হওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে হিব্রু ভাষায় শব্দ দুটির বানান প্রায় একই রকম। মাওরা যে আরবের একটি স্থান এ সম্পর্কে তাওরাতেই স্পষ্ট উক্তি বিদ্যমান রয়েছে। একটি শ্লোকে আছে—‘মাদইয়ানিদের সেনাবাহিনী উত্তরাঞ্চলের মাওরার পার্বত্য অঞ্চলে উপত্যকায় অবস্থান করছিল।’

সব ঘটনা এবং যুক্তি-প্রমাণাদির প্রতি লক্ষ করলে অবশ্যই প্রমাণিত হবে যে এ শব্দটি ‘মাওরা’ নয়; বরং ‘মারওয়া’ যা মক্কায় অবস্থিত একটি পাহাড়। উম্মু ইসমাইলের স্মৃতিবিজড়িত মারওয়া ও সাফার মাঝখানে হজ ও ওমরাহ উপলক্ষে দৌড়ানোর বিধান ইসলামে এখনো অটুট আছে।

‘নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই যে কেউ (কাবা) ঘরের হজ বা ওমরাহ সম্পন্ন করে, এ দুটির মধ্যে সাঈ করলে তার কোনো পাপ নেই। আর যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোনো সৎকাজ করবে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ উত্তম পুরস্কারদাতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৮)

মক্কার মারওয়ায় যে কোরবানির স্থান এ দাবির পক্ষে পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলো পাঠক একটু আগেই অধ্যয়ন করেছেন। হাদিসে কী আছে পাঠক জানেন?

‘আল্লাহর রাসুল (সা.) মারওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন: এটিই কোরবানির স্থান। এ ছাড়া মক্কার সব পাহাড়-পর্বত এবং গিরিপথই কোরবানির স্থান।’ (মুয়াত্তা, কিতাবুল হাজ্জ, বাবু মা যাআ ফীন নাহার ফীল হাজ্জ)

তবে নবীজি (সা.)-এর যুগে মারওয়ায় কোরবানি হতো না; বরং মিনায় কোরবানি হতো, যা মক্কা থেকে তিন মাইল দূরত্বে অবস্থিত। তথাপি তিনি মারওয়াকে কোরবানির স্থান বলেছেন।

ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক : অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়