ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সশস্ত্র সংঘাত বদর যুদ্ধ যেমন একটি সামরিক মোকাবিলা ছিল, তেমনি এটি ছিল সত্য-মিথ্যার চূড়ান্ত পার্থক্যকারী লড়াই।
হিজরতের পর থেকেই মক্কার কোরাইশরা মুসলমানদের ওপর অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে আসছিল। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে সিরিয়া থেকে মক্কামুখী একটি বাণিজ্যিক কাফেলা আক্রান্ত হতে পারে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে মক্কায় যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে।
যদিও কাফেলাটি নিরাপদে ফিরে গিয়েছিল; কিন্তু আবু জাহলের একগুঁয়েমি ও দাম্ভিকতায় কুরাইশরা মদিনা আক্রমণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি।
১৭ রমজান, ২ হিজরি (১৩ মার্চ, ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ) বদর প্রান্তরে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। একদিকে ছিল আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত প্রায় ১ হাজার কোরাইশ সৈন্য, অন্যদিকে মাত্র ৩১৩ জন সঙ্গী নিয়ে ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান মুসলিম বাহিনী।
আরবের রীতি অনুযায়ী প্রথমে একক লড়াই এবং পরে মূল যুদ্ধ শুরু হয়। সংখ্যাগত বিশাল কমতি থাকা সত্ত্বেও মুসলমানদের কৌশলগত অবস্থান এবং আল্লাহর গায়েবি সাহায্যে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। কুরাইশরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে।
এই ঐতিহাসিক যুদ্ধক্ষেত্রে ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর ভূমিকা ছিল বহুমাত্রিক।
যুদ্ধ যখন আসন্ন, তখন মহানবী (সা.) সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শসভায় বসেন। সভায় প্রথমেই বলিষ্ঠ ও সুন্দর পরামর্শ পেশ করেন আবু বকর (রা.)। যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আবু বকরের প্রজ্ঞার ওপর আস্থা রাখতেন নবীজি এবং তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৫২)
শত্রুপক্ষের অবস্থা জানতে নবীজি (সা.) যখন গোপনে বের হন, তখন আবু বকর (রা.) তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তাঁরা বদর কূপের আশপাশে এক বৃদ্ধের সাক্ষাৎ পান। কৌশলে তাঁর কাছ থেকে কোরাইশ বাহিনীর অবস্থান ও গতিবিধি জেনে নেন।
তথ্য সংগ্রহের এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে আবু বকর ছিলেন রাসুলের প্রধান সহযোগী। (আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ইবনে হিশাম)
যুদ্ধের সময় রণক্ষেত্রের একটি উঁচু টিলার ওপর রাসুল (সা.)-এর জন্য একটি শামিয়ানা তৈরি করা হয়েছিল, যেখান থেকে পুরো মাঠ দেখা যেত। এর ভেতরে আবু বকর (রা.) রাসুলের সঙ্গে ছিলেন।
আলি (রা.) পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন, ‘আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাহাদুর ছিলেন আবু বকর। বদর যুদ্ধে রাসুলের পাশে কে থাকবেন প্রশ্ন উঠলে আবু বকরই তরবারি হাতে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে যান। যে-ই রাসুলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তিনি তাকে আক্রমণ করে হটিয়ে দিচ্ছিলেন।’ (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া)
রণক্ষেত্রে রাসুল (সা.) যখন দুহাত তুলে আল্লাহর কাছে বিজয়ের প্রার্থনা করছিলেন, তখন ব্যাকুলতায় তাঁর কাঁধ থেকে চাদর পড়ে যায়।
আবু বকর (রা.) তখন চাদরটি তুলে দিয়ে পরম মমতায় বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, যথেষ্ট হয়েছে। আল্লাহ অবশ্যই তাঁর অঙ্গীকার পূরণ করবেন।’ তখন আল্লাহ সুরা আনফালের ৯ নম্বর আয়াত নাজিল করে সাহায্যের সুসংবাদ দেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৭৬৩)
শামিয়ানার নিচে থাকা অবস্থায় রাসুল (সা.)-এর সামান্য তন্দ্রামতো এলে তিনি জেগে উঠে বলেন, ‘আবু বকর! আনন্দিত হও, আল্লাহর সাহায্য এসে গেছে। এই তো জিবরাইল (আ.) তাঁর ঘোড়ার লাগাম ধরে ধূলি উড়িয়ে এগিয়ে আসছেন।’
এরপর নবীজি তেলাওয়াত করতে করতে বেরিয়ে আসেন—‘এই দল তো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পিঠ প্রদর্শন করবে।’ (সুরা কামার, আয়াত: ৪৫)
বদর যুদ্ধে আবু বকর (রা.)-এর আদর্শিক দৃঢ়তা ছিল অতুলনীয়। তাঁর পুত্র আবদুর রহমান (তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি) কোরাইশদের পক্ষে লড়াই করতে এসেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর একদিন আবদুর রহমান তাঁর পিতাকে বলেছিলেন, ‘বাবা, বদরের দিন আপনি আমার টার্গেটে ছিলেন, কিন্তু পিতা হিসেবে আমি সরে গিয়েছিলাম।’
আবু বকর (রা.) তখন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘কিন্তু তুমি যদি সেদিন আমার সামনে পড়তে, তবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমি তোমাকে ছাড় দিতাম না।’ (তারিখুল খুলাফা, সুয়ুতি)
যুদ্ধ শেষে বন্দিদের বিষয়ে পরামর্শ চাওয়া হলে আবু বকর (রা.) মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এরা আমাদেরই বংশের লোক। আমার মত হলো, আপনি মুক্তিপণের বিনিময়ে এদের ছেড়ে দিন।
এতে আমরা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হব এবং ভবিষ্যতে হয়তো আল্লাহ তাদের হেদায়েত দেবেন।’ রাসুল (সা.) তাঁর এই নরম ও মানবিক মতটিই গ্রহণ করেছিলেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৭৬৩)
বদর যুদ্ধে আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর এই ভূমিকা প্রমাণ করে যে তিনি কেবল রাসুলের অন্তরঙ্গ বন্ধুই ছিলেন না, বরং ইসলামের সংকটকালে তিনি ছিলেন এক নির্ভীক যোদ্ধা ও বিচক্ষণ ঢাল।
ইলিয়াস মশহুদ : লেখক ও অনুবাদক