
পাকিস্তানের রমজান মানে সামাজিক মিলনমেলা। অর্থনৈতিক সংকট থাকলেও পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের বড় মন এবং আতিথেয়তার কোনো কমতি নেই।
এখানে রাজপথের ধুলোমাখা জায়গায় বসে কোটিপতি আর রিকশাচালক একই পাতে ইফতার করেন।
ইসলামাবাদ, করাচি বা লাহোর—ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে পাকিস্তানের ব্যস্ত রাস্তাগুলো যেন নীরব হয়ে যায় এবং সেখানে সারি সারি দস্তরখান বা বেঞ্চ বিছিয়ে দেওয়া হয়। একে বলা হয় ‘আল্লাহর দস্তরখান’।
মূলত স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তি বা দাতব্য সংস্থাগুলো এর আয়োজন করে। বিশেষ করে গ্রাম থেকে আসা শ্রমিক, দরিদ্র মানুষ এবং বাড়ির বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি এক বড় ভরসা।
পাড়ার প্রতিটি মসজিদগুলো একেকটি বড় পরিবারে পরিণত হয়। এলাকাবাসীরা বাড়ি থেকে নিজেদের পছন্দের খাবার নিয়ে আসেন এবং মসজিদে বসে প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাগ করে খান।
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের পেশোয়ার শহরে রমজান রাতে এক বিচিত্র খেলা জমে ওঠে, যার নাম ‘আন্ডা যুদ্ধ’ বা ‘ডিমের লড়াই’।
সেদ্ধ করা ডিমকে উজ্জ্বল রঙে রাঙানো হয়। প্রতিযোগীরা সেই ডিম দিয়ে একে অপরের ডিমের ওপর আঘাত করে। যার ডিমটি অক্ষত থাকে, সে পরবর্তী রাউন্ডে যায়।
মূলত তারাবির পর থেকে সাহ্রি পর্যন্ত মানুষকে জাগিয়ে রাখতেই এই শতাব্দী প্রাচীন খেলার আয়োজন করা হয়। এটি এখন রমজানের এক জনপ্রিয় লোকজ ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
পাকিস্তানের ইফতার টেবিল মুখরোচক খাবারে ভরপুর থাকে:
দহি বড়া : ডাল দিয়ে তৈরি বড়া টক-মিষ্টি দই এবং মশলাদার সস দিয়ে পরিবেশন করা হয়। এটি ছাড়া পাকিস্তানি ইফতার অপূর্ণ।
ফ্রুট চাট : ফলের সালাদ, তবে এতে নুন আর চাট মশলার এক বিশেষ ব্যবহার থাকে।
তাজা দুধ ও জিলিপি : পাকিস্তানিরা সাহ্রি ও ইফতার উভয় সময়েই তাজা মহিষের দুধের ওপর নির্ভর করে। আর মিষ্টি হিসেবে মচমচে ‘জিলিপি’র কদর সবচেয়ে বেশি।
রোজ ড্রিংক: লাল রঙের ‘রুহ আফজা’ বা গোলাপের শরবত পাকিস্তানের জাতীয় ইফতার পানীয়।
পুরো পাকিস্তান জুড়ে হাজারো ধর্মীয় মাদ্রাসা বা স্কুল রয়েছে যেখানে ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুরা পড়াশোনা করে। রমজানে এই শিশুদের ইফতার ও সাহরির দায়িত্ব নেয় স্থানীয় প্রতিবেশী ও দানশীল ব্যক্তিরা।
এটি পাকিস্তানি সমাজের গভীর মমত্ববোধের পরিচয় দেয়।
সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, পাকিস্তানে মুদ্রাস্ফীতির কারণে ইফতারের খরচ ১৮% থেকে ২০% বেড়েছে। ২০২২-২৩ সাল থেকেই সবজি, চিনি আর ঘিয়ের দাম আকাশছোঁয়া।
করাচি বা লাহোরের বাজারে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস থাকলেও ইফতারের সময় তারা সবকিছু ভুলে স্রষ্টার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। পাকিস্তান সরকার রমজান উপলক্ষে গরিবদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে আটা ও তেল দেওয়ার ‘রমজান প্যাকেজ’ চালু রেখেছে।