ইতিহাস মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের এক বিজ্ঞানসম্মত দর্পণ। গ্রিক ও রোমানরা ইতিহাসের সূচনা করলেও মধ্যযুগে মুসলিম পণ্ডিতেরাই একে একটি পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্র এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রূপান্তর করেন। আধুনিক ইতিহাসতত্ত্বের ভিত্তি স্থাপনে মুসলমানদের অবদান অনস্বীকার্য।
মুসলিম ঐতিহাসিকেরা ইতিহাস লিখনপদ্ধতিতে দুটি প্রধান বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন।
এক. ইসনাদ বা তথ্যসূত্র যাচাই: হাদিসশাস্ত্রের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য মুসলিমরা ‘ইলমুর রিজাল’ বা বর্ণনাকারীদের জীবনী পর্যালোচনার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। কোনো ঐতিহাসিক তথ্য কে বর্ণনা করছেন, তাঁর সততা ও স্মরণশক্তি কেমন, তা যাচাই করার এই নিয়ম ইতিহাসের সত্যতা বিচারে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
দুই. কালানুক্রমিক বর্ণনা: হিজরি সনের প্রবর্তন এবং বছরওয়ারি ঘটনার নির্ভুল লিপিবন্ধন মুসলমানদের মাধ্যমেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ইমাম তাবারির ‘তারিখ’ গ্রন্থে এ পদ্ধতির শ্রেষ্ঠ প্রতিফলন দেখা যায়।
ইবনে খালদুন যে ইতিহাসদর্শন উদ্ভাবন করেছেন, তা যেকোনো যুগে যেকোনো মস্তিষ্কের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।আর্নল্ড জে টয়েনবি, লেখক: আ স্টাডি অব হিস্ট্রি
প্রাচীন ঐতিহাসিকেরা সাধারণত নিজ নিজ জাতি বা অঞ্চলের ইতিহাস লিখতেন। কিন্তু মুসলিমরাই প্রথম বিশ্ব ইতিহাসের ধারণা নিয়ে আসেন। আল-তাবারি (৮৩৯-৯২৩ খ্রি.) তাঁর বিখ্যাত তারিখুর রসুল ওয়াল মুলুক (নবী ও রাজন্যবর্গের ইতিহাস) গ্রন্থে সৃষ্টির শুরু থেকে তৎকালীন সময় পর্যন্ত ধারাবাহিক বিশ্ব ইতিহাস সংকলন করেন।
ইতিহাসবিদ পি কে হিট্টির মতে, এটি তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক দলিল। (দ্য হিস্ট্রি অব দ্য অ্যারাবস, ফিলিপ কে হিট্টি)
ইতিহাসকে নিছক বর্ণনা থেকে বের করে কার্যকারণ সম্পর্কযুক্ত একটি বিজ্ঞানে পরিণত করেন ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৪০৬ খ্রি.)। তাঁর বিশ্বখ্যাত আল-মুকাদ্দিমা গ্রন্থে ইতিহাসের দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করেন।
তিনি সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাসের সমন্বয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে একটি জাতির উত্থান ও পতন ঘটে। আবহাওয়া ও ভূগোল কীভাবে মানুষের চরিত্র ও ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করে, তা–ও তিনি প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করেন।
ঐতিহাসিক আর্নল্ড জে টয়েনবি ইবনে খালদুন সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি যে ইতিহাসদর্শন উদ্ভাবন করেছেন, তা যেকোনো যুগে যেকোনো মস্তিষ্কের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।’ (আ স্টাডি অব হিস্ট্রি, আর্নল্ড জে টয়েনবি)
ভারতবর্ষের লিখিত ইতিহাসের শুরুই হয়েছে মূলত মুসলিম ঐতিহাসিকদের হাত ধরে। সুলতানি ও মোগল আমলের অসংখ্য ফারসি ও আরবি গ্রন্থ ভারতের ইতিহাসের প্রধান উৎস।
মুসলিম ঐতিহাসিকেরা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসকেও প্রাধান্য দিয়েছেন। আল-মাসউদি, যাঁকে ‘আরবদের হেরোডোটাস’ বলা হয়। তাঁর মুরুজ উজ-জাহাব গ্রন্থে তিনি ভূগোল, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং সমাজতত্ত্বকে ইতিহাসের সঙ্গে একীভূত করেছেন।
আলবিরুনি রচিত কিতাবুল হিন্দ ভারততত্ত্বের (আইডোলজি) শ্রেষ্ঠ আকর গ্রন্থ। এতে আলবিরুনি ভারতবর্ষের ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান ও রীতিনীতি অত্যন্ত নির্মোহভাবে তুলে ধরেছেন।
ভারতবর্ষের লিখিত ইতিহাসের শুরুই হয়েছে মূলত মুসলিম ঐতিহাসিকদের হাত ধরে। সুলতানি ও মোগল আমলের অসংখ্য ফারসি ও আরবি গ্রন্থ ভারতের ইতিহাসের প্রধান উৎস।
ইতিহাসকে রূপকথা বা অতিরঞ্জন থেকে মুক্ত করে তথ্যভিত্তিক ও যৌক্তিক বিজ্ঞানে রূপান্তর করার কৃতিত্ব মুসলমানদের। আধুনিক কালের ‘র্যাঙ্কে’ বা অন্য পশ্চিমা ঐতিহাসিকদের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চার মূলে মুসলিম পণ্ডিতদের উদ্ভাবিত পদ্ধতিগুলোই কাজ করেছে।
মুসলিমদের এই নিরলস শ্রম না থাকলে মানব–ইতিহাসের এক বিশাল অংশ আজ অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকত।
ইফতেখারুল হক হাসনাইন : আলেম ও লেখক