আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর পবিত্র সান্নিধ্যে সাহাবিরা শুধু ইবাদত বা যুদ্ধের কলাকৌশলই শেখেননি, বরং তাঁরা শিখেছিলেন জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনার এক অনন্য পাঠ। বর্তমান মুসলিম সমাজে ‘ইজতিহাদ’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা নিয়ে যে জড়তা দেখা যায়, নববী যুগের চিত্র ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
ইসলামি সভ্যতার বিস্ময়কর উত্থানের পেছনে ছিল সাহাবিদের এই বিরামহীন ইজতিহাদ বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস।
সাধারণত ইজতিহাদ বলতে ফকিহ বা আইনবিদদের আইনি গবেষণা বোঝানো হলেও, এর পরিধি আসলে অনেক বিস্তৃত। একজন মুসলিমের জন্য ইজতিহাদ হলো তার আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন এবং বিশ্বজগত বিনির্মাণে তার মেধার সর্বোচ্চ প্রয়োগ।
ফিকহি ইজতিহাদ বা আইনি গবেষণা কখনো নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতা ছিল না; বরং এটি ছিল সময়ের প্রয়োজনে ইসলামের উপযোগিতা প্রমাণের এক জীবন্ত দলিল। সাহাবিদের মানসপট তৈরি হয়েছিল কোরআন ও সুন্নাহর ছায়াতলে, যা তাঁদের চিন্তাশীলতাকে উর্বর করেছিল।
আল্লাহর রাসুল (সা.) চাইতেন তাঁর অনুসারীরা যেন স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখে। তিনি ওহিপ্রাপ্ত নবী এবং সেনাপতি হওয়া সত্ত্বেও বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাহাবিদের মতামত নিতেন। বদর যুদ্ধের বন্দিদের বিষয়ে তিনি আবু বকর ও ওমর (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এই বন্দিদের ব্যাপারে তোমাদের অভিমত কী?” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৭৬৩)
নবীজি (সা.) ইচ্ছা করলে একাই সিদ্ধান্ত দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি সাহাবিদের মেধা বিকাশের সুযোগ দিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর ওফাতের পর সাহাবিরা যেন কোনো নতুন সমস্যার সম্মুখীন হলে নববী আদর্শের আলোকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন। সাহাবিদের এই ইজতিহাদ কখনো সঠিক হতো, আবার কখনো নবীজি নিজেই তা সংশোধন করে দিতেন। এভাবেই তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা তৈরি হয়েছিল।
প্রখ্যাত আলেম ইবনে জাওজি উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই তাঁর চৌদ্দজন সাহাবি ফতোয়া প্রদানের কাজ করতেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী, ইবনে মাসউদ, মুয়াজ ইবনে জাবাল ও জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)। (কাশফুল মুশকিল মিন হাদিসিস সহিহাইন, ৩/২৩৬, দারুল কুতুবুল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৫)
সাহাবিরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সামনেই তাঁদের অভিমত ব্যক্ত করতে দ্বিধা করতেন না, তবে সেখানে আদব ও বিনয়ের কোনো ঘাটতি ছিল না। হোনাইন যুদ্ধের গনিমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) বণ্টনের সময় আবু বকর (রা.)-এর একটি সাহসী ইজতিহাদ নবীজি গ্রহণ করেছিলেন।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে জনৈক ব্যক্তির পাওনা নিয়ে আবু বকর সরাসরি বলেছিলেন যে আল্লাহর সিংহদের (সাহাবিদের) বঞ্চিত করে কোনো দুর্বল ব্যক্তিকে এই সম্পদ দেওয়া উচিত হবে না। আল্লাহর রাসুল তখন আবু বকরের এই যুক্তিপূর্ণ অবস্থানকে সমর্থন করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩১৪২)
আরেকটি চমৎকার উদাহরণ হলো আজানের প্রচলন। নামাজের সময় হওয়ার পর মানুষকে কীভাবে ডাকা হবে, তা নিয়ে সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন নবীজি। কেউ বললেন আগুন জ্বালানোর কথা, কেউ বললেন শিঙা বাজাতে, কেউবা বললেন ঘণ্টা ব্যবহারের কথা। কিন্তু এগুলো ইহুদি বা খ্রিষ্টানদের রীতির সঙ্গে মিলে যাওয়ায় আল্লাহর রাসুল তা পছন্দ করেননি।
এরপর আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ (রা.) স্বপ্নে আজানের শব্দগুলো শোনেন এবং পরদিন নবীজিকে তা জানান। ওমর (রা.)-ও একই স্বপ্ন দেখেছিলেন কিন্তু লাজবশত আগে জানাননি। নবীজি এই স্বপ্নলব্ধ ইজতিহাদকে ওহির মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানের মতোই স্বীকৃতি দিলেন এবং বিলাল (রা.)-কে আজান দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৮)
সাহাবিরা যখন আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর থেকে দূরে থাকতেন, তখন তাঁরা শরিয়তের মূল চেতনা বা ‘মাকাসিদ’ ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান করতেন। আমর ইবনে আসের (রা.) একটি ঘটনা এক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
‘জাতুস সালাসিল’ যুদ্ধের সময় এক প্রচণ্ড শীতের রাতে তাঁর স্বপ্নদোষ হয়। তিনি জানতেন যে এই হাড়কাঁপানো শীতে গোসল করলে তাঁর মৃত্যু হতে পারে। তিনি তখন তায়াম্মুম করে সাহাবিদের নিয়ে নামাজ আদায় করেন।
মদিনায় ফেরার পর ওমর (রা.) এই বিষয়ে নবীজির কাছে অভিযোগ করেন। নবীজি (সা.) যখন আমরকে জিজ্ঞেস করলেন, তখন তিনি উত্তর দিলেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমি আল্লাহর এই বাণীটি জানতাম, ‘তোমরা নিজেদের হত্যা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু’ (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯)। তাই আমি আল্লাহর দেওয়া সুযোগ গ্রহণ করেছি।”
আমরের এই প্রজ্ঞাপূর্ণ ইজতিহাদ শুনে নবীজি মুচকি হাসলেন এবং তা অনুমোদন করলেন। (ইমাম তহাবি, শারহু মুশকিলিল আসার, ১৫/৩৯১, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৯৪)
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সাহাবিরা কেবল শব্দের বাহ্যিক রূপ নয়, বরং ধর্মের অন্তর্নিহিত সহজতা ও দয়াকে বুঝতেন।
বর্তমান সময়ে অনেকে কোনো গভীর জ্ঞান ছাড়াই ইজতিহাদের দাবি করেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ইজতিহাদ করতে হলে নির্দিষ্ট কিছু সরঞ্জামের প্রয়োজন হয়।
একজন মানুষ যেমন বিদ্যুতের সার্কিট সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে ইলেকট্রিক কাজ করতে গিয়ে জীবন হারায়, তেমনি জ্ঞানহীনভাবে ধর্মীয় বিষয়ে মতামত দেওয়া পরকাল ধ্বংসের নামান্তর। যে ব্যক্তি কোরআনের সাধারণ শব্দের পার্থক্য করতে পারে না, তার পক্ষে জটিল ধর্মীয় বিষয়ে রায় দেওয়া সম্ভব নয়।
ফকিহদের মতে, একজন মুজতাহিদকে অবশ্যই:
আরবি ভাষার গভীর জ্ঞান রাখতে হবে।
কোরআনের বিধি-বিধান সম্বলিত আয়াতগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হবে।
হাদিসের ভাণ্ডার ও তার গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড জানতে হবে।
শরিয়তের মূল লক্ষ্য বা ‘মাকাসিদ’ বুঝতে হবে।
আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অনেক বড় আলেমকেও নতুন কোনো বিষয়ে হুট করে রায় দিতে বাধা দেয়। তাঁরা দীর্ঘ গবেষণা ও পূর্ববর্তী আলেমদের মতামতের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছান। এর বিপরীতে কিছু মানুষ আছেন যারা জ্ঞান ছাড়াই রক্তপাত, তাকফির (কাউকে কাফের বলা) বা ফাসেক হওয়ার রায় দিতে কুণ্ঠা করেন না। এটি একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি।
অথচ আল্লাহর রাসুল (সা.) গবেষণাকে উৎসাহিত করেছেন এই বলে যে, “বিচারক যদি ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান তবে তিনি দুটি নেকি পাবেন, আর ভুল করলেও একটি নেকি পাবেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৩৫২)
এই হাদিসটি যোগ্য গবেষকদের ভয় দূর করে তাদের গবেষণায় প্রাণিত করে।
সাহাবিদের ইজতিহাদ থেকে আমরা শিখতে পারি, ইজতিহাদ একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। আজ পৃথিবী অনেক জটিল। ব্যক্তিগত ইজতিহাদের চেয়ে এখন ‘ইজতিহাদ জামায়ি’ বা সম্মিলিত গবেষণার প্রয়োজনীয়তা বেশি।
কারণ একটি সমস্যার পেছনে এখন অনেকগুলো বিশেষায়িত জ্ঞান (যেমন, চিকিৎসা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি) জড়িত থাকে। বিশেষজ্ঞ আলেম ও বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এই ইজতিহাদ হওয়া উচিত।
সাহাবিদের সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে আমাদেরও জ্ঞানচর্চায় সাহসী হতে হবে, তবে তা হতে হবে শরিয়তের সীমারেখার ভেতরে থেকে। ইজতিহাদ ইসলামকে একটি স্থবির ধর্ম নয়, বরং একটি জীবন্ত ও চিরকালীন জীবনব্যবস্থা হিসেবে টিকিয়ে রাখে।