ইমাম আহমাদ তখন বেশ বুড়িয়ে গেছেন। বয়সের ভারে শরীরটা নুইয়ে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর ইলমের তৃষ্ণা তখনো মেটেনি। তাই তিনি এই বয়সেও বেরিয়ে পড়লেন এক দীর্ঘ সফরে। সফর যখন শেষ পর্যায়ে, তখন পথিমধ্যে এক অচিন শহরে এসে যাত্রাবিরতি করলেন।
ততদিনে ইমামের সুখ্যাতি মুসলিম বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর নাম শোনেনি এমন মানুষ মেলা ভার।
অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এই অচেনা শহরে তাঁকে চেনে এমন একটা মানুষও পাওয়া গেল না। ইমামও চাইলেন না নিজের পরিচয় দিয়ে কারও বিশেষ সমাদর লাভ করতে। যশ-খ্যাতির আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন তিনি।
রাত যখন ঘনিয়ে এলো, ইমাম ভাবলেন আজকের রাতটা এই তল্লাটে কোথাও কাটিয়ে দেবেন। ফজরের নামাজ শেষে নতুন উদ্যমে পথচলা শুরু করবেন। কিন্তু এই অন্ধকার রাতে, সম্পূর্ণ অপরিচিত এক শহরে কে দেবে তাঁকে আশ্রয়?
ঠিক করলেন, রাতটা মসজিদে কাটাবেন। ইবাদত-বন্দেগিতে সময়টুকু পার করে দিলে অন্তত মাথার ওপর একটা ছাদ তো পাওয়া যাবে।
মসজিদে ইশার নামাজ শেষ হলো। একে একে সব মুসল্লি চলে গেলেন। যখন পুরো মসজিদ জনশূন্য হয়ে এলো, তখন মসজিদের পাহারাদার এসে ইমামকে ধমকে উঠল। কর্কশ স্বরে বলল, ‘এই যে মুরুব্বি, উঠে পড়ুন। এখানে রাতে থাকা যাবে না।’
তাঁর এই আমলটি দেখে ইমাম আহমাদ খানিকটা বিস্মিত হলেন। কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিছু মনে না করলে একটা কথা জানতে পারি?’
ইমাম নিজের অপারগতার কথা জানিয়ে বললেন, ‘বাবা, আমি একজন মুসাফির মানুষ। বাইরে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।’
কিন্তু পাহারাদারের মন গলল না। সে একপ্রকার জোর করেই তাঁকে বাইরে বের করে দিল। রাতের অন্ধকারে পথের ধুলোয় দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি।
রাস্তার ওপাশেই এক রুটিওয়ালার দোকান। লোকটি অনেকক্ষণ ধরে এই দৃশ্য খেয়াল করছিলেন। একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষকে এভাবে রাতের অন্ধকারে বের করে দেওয়া হচ্ছে দেখে খুব মায়া হলো তার। দ্রুত এগিয়ে এসে ইমামের সামনে দাঁড়ালেন। বিনীত স্বরে বললেন, ‘আমি কি আপনাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?’
ইমাম লোকটিকে নিজের সফর এবং রাত যাপনের সমস্যার কথা খুলে বললেন। রুটিওয়ালা বলল, ‘আপনি যদি চান, তবে আজকের রাতটা আমার এই ছোট ঘরে মেহমান হয়ে থাকতে পারেন। আমি রাত জেগে রুটি বানাই, আপনার কোনো অসুবিধা হবে না।’
ইমাম রাজি হলেন।
রুটিওয়ালার ঘরে গিয়ে ইমাম এক অদ্ভুত বিষয় খেয়াল করলেন। লোকটি যখন আটা মাখছে, রুটি বেলছে কিংবা চুলার তাপে রুটি সেঁকছে—প্রতিটা মুহূর্তেই তাঁর ঠোঁটদুটো নড়ছে। বিড়বিড় করে অবিরত ইস্তিগফার পাঠ করছেন। কাজের ফাঁকে এক মুহূর্তের জন্যও থামছে না তাঁর জিকির।
তাঁর এই আমলটি দেখে ইমাম আহমাদ খানিকটা বিস্মিত হলেন। কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিছু মনে না করলে একটা কথা জানতে পারি?’
রুটিওয়ালা বললেন, ‘জি, অবশ্যই বলুন।’
ইমাম বললেন, ‘লক্ষ্য করছি, আপনি কাজের প্রতিটি মুহূর্তে ইস্তিগফার পাঠ করছেন। নিঃসন্দেহে এটি অতি উত্তম আমল। এই আমলের উসিলায় আপনি মহান আল্লাহর কাছ থেকে বিশেষ কোনো ফল পেয়েছেন কি না?’
রুটিওয়ালার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘আমি এই জমানার শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের নাম অনেক শুনেছি। তাঁকে এক নজর দেখার বড্ড স্বাদ জাগে মনে।
রুটিওয়ালা বললেন, ‘এই ইস্তিগফারের বদৌলতে আল্লাহ–তাআলা আমার জীবনের প্রতিটি দোয়া কবুল করেছেন। আমি যখনই যা চেয়েছি, তিনি আমাকে ফিরিয়ে দেননি। কেবল একটি দোয়া ছাড়া!’
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন ইমাম। তিনি চোখের সামনে এমন একজন মানুষকে দেখছেন, যার প্রতিটি আর্জি আসমানের মালিক মঞ্জুর করেছেন! তিনি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার সেই দোয়াটি কী, যা আল্লাহ এখনো কবুল করেননি?’
রুটিওয়ালার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘আমি এই জমানার শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের নাম অনেক শুনেছি। তাঁকে এক নজর দেখার বড্ড স্বাদ জাগে মনে। দিনরাত আল্লাহর কাছে বলি—হে আল্লাহ, মরার আগে একবার অন্তত সেই মহামানবের সাহচর্য আমাকে পাইয়ে দিয়ো। এই দোয়াটাই কেবল এখনো কবুল হয়নি। আমি এখনো ইমাম আহমাদের দেখা পেলাম না!’
একথা শুনে ইমামের দুচোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল। তিনি শিউরে উঠলেন মহান প্রতিপালকের সূক্ষ্ম পরিকল্পনার কথা ভেবে। আল্লাহ–তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দার কতই না কাছে! তিনি বুঝতে পারলেন, এই রুটিওয়ালার ইস্তিগফারের টানেই আল্লাহ তাঁকে এই অচিন শহরে এনেছেন এবং এই ঘরের দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছেন।
আসলে আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চাইলে তিনি তাঁর বান্দার আর্জি অপূর্ণ রাখেন না, কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
তিনি লোকটির কাছে গিয়ে পরম মমতায় তাঁর হাত দুটো ধরে বললেন, ‘ভাই, আজ থেকে আপনার আর কোনো অপূর্ণতা রইল না। আল্লাহ আপনার সেই শেষ দোয়াটিও কবুল করে নিয়েছেন। আপনার সামনে এখন যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তিনিই সেই নগণ্য বান্দা আহমাদ ইবনে হাম্বল!’
(সূত্র: আত-তাদাবি বিল ইস্তিগফার, হাসান ইবনে আহমাদ ইবনে হাসান হুম্মাম, পৃষ্ঠা : ৫০)
মুজিব হাসান : গদ্যকার ও ভাষা সম্পাদক