
ভারতের রমজান হলো বিচিত্র মশলার ঘ্রাণ আর মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার এক সংমিশ্রণ। এখানে রমজান হাজার বছরের লালিত এক সামাজিক উৎসব।
দিল্লির জামা মসজিদ থেকে শুরু করে হায়দরাবাদের চারমিনার কিংবা কলকাতার নাখোদা মসজিদ—প্রতিটি অলিগলি এই মাসে এক অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্যে জেগে ওঠে।
ভারতের রমজানে যেমন আছে আধ্যাত্মিক গভীরতা, তেমনি আছে রসনাবিলাসের এক বিশাল সমারোহ।
সাধারণত সারা বিশ্বের মুসলিমরা খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার শুরু করেন। কিন্তু ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে এক অদ্ভুত ও প্রাচীন রীতি প্রচলিত আছে—লবণ দিয়ে ইফতার করা।
অনেক ভারতীয় মুসলিম বিশ্বাস করেন, দীর্ঘ উপবাসের পর এক চিমটি লবণ মুখে দিয়ে রোজা ভাঙা শরীরের জন্য উপকারী।
লবণের সেই সামান্য স্বাদের পরই শুরু হয় মূল ইফতারের মহোৎসব। এছাড়া পুরো রমজান মাস জুড়ে মাথায় ‘টুপি’ পরে থাকা এখানকার মুসলিমদের এক চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য।
ভারতীয় ইফতারের টেবিল অসম্পূর্ণ থেকে যায় যদি সেখানে এক গ্লাস ‘রুহ আফজা’ না থাকে। গোলাপের নির্যাস থেকে তৈরি এই মায়াবী লাল পানীয়টি এখানকার ইফতারের সমার্থক।
এর সঙ্গে থাকে ‘পাকোড়া’—পেঁয়াজ, মরিচ আর নানা সবজি বেসনে ডুবিয়ে মুচমুচে করে ভাজা এই পদটি ছাড়া ভারতীয়দের ইফতার জমে না।
খাবারের মূল পদে থাকে ‘ঘুগনি’ (মটর বা ছোলার ডাল দিয়ে তৈরি পদ) এবং দক্ষিণ ভারতে জনপ্রিয় ‘গঞ্জি’ বা এক ধরনের পুষ্টিকর জাউ। মিষ্টির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ‘সুজি’র হালুয়া এবং দুধ-সেমাইয়ের বাহারি আয়োজন।
কোথাও ডাল ও পুরি দিয়ে ইফতার করারও প্রচলন দেখা যায়
ভারতের রমজানের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এখানকার ‘ইফতার পার্টি’। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সব ধর্মের মানুষ এই ইফতারে শামিল হন। মন্দিরের প্রাঙ্গণে কিংবা চার্চের চত্বরেও মাঝেমধ্যে ইফতারের আয়োজন করা হয়।
হিন্দু, শিখ বা খ্রিষ্টান প্রতিবেশীরা তাদের মুসলিম বন্ধুদের জন্য ইফতারের ডালা সাজিয়ে নিয়ে আসেন।
রাজধানী দিল্লির ঐতিহাসিক জামা মসজিদের চত্বরে ইফতারের দৃশ্য এক কথায় জাদুকরী। হাজার হাজার মানুষ যখন সারিবদ্ধভাবে বসে আজানের অপেক্ষা করেন, তখন ভিন্ন পরিবেশ তৈরি হয়।
ভারতের মুসলিমরা শবে কদর বা ২৭ রমজানকে ঈদের মতোই গুরুত্ব দিয়ে পালন করেন। এদিন শিশুরা নতুন পোশাক পরে মসজিদে যায় এবং সবার মাঝে মিষ্টি বিতরণ করা হয়।
তবে এই সুন্দর আমেজের মাঝেও মাঝেমধ্যে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা বা বঞ্চনার মেঘ কালো ছায়া ফেলে। বিশেষ করে কিছু এলাকায় উগ্রপন্থার আস্ফালন মুসলিমদের উৎসবের আনন্দে বিঘ্ন ঘটায়।
তা সত্ত্বেও ভারতের ২০ কোটি মুসলিম তাদের ঐতিহ্য ও আভিজাত্য দিয়ে প্রতি বছর রমজানকে এক রঙিন উৎসবে পরিণত করেন।