সিরাত

ইয়াফুর: এক নির্বাক প্রাণীর নবীপ্রেম

মহানবী (সা.) ছিলেন সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য মহান আল্লাহর এক বিশেষ রহমত। তাঁর অসীম মমতার ছায়া যেমন অসহায় মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে, তেমনি পশুপাখি ও নির্বাক জীবজন্তুও তাঁর সস্নেহ সান্নিধ্যে খুঁজে পেয়েছে পরম নিরাপত্তা।

নবীজির প্রতি প্রকৃতির এই অবোধ প্রাণিকুলের ভালোবাসা ছিল অত্যন্ত গভীর ও বিস্ময়কর, যা কখনো কখনো মানুষের অনুরাগকে হার মানাত।

রাজকীয় উপহার

ঐতিহাসিক হোদাইবিয়ার সন্ধির পর নবীজি (সা.) বেশ কয়েকজন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে পত্র পাঠান। তাঁদের মধ্যে মিসরের বাদশাহ মুকাওকিস অন্যতম। তাঁর কাছে সাহাবি হাতিব ইবনে আবি বালতাআ (রা.)-কে দূত হিসেবে পাঠানো হয়।

মুকাওকিস অত্যন্ত ধীমান ছিলেন এবং ইঞ্জিল কিতাবের জ্ঞান রাখতেন। তাই নবীজির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হলেও মসনদ হারানোর ভয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন।

মিসরের বাদশাহর দেওয়া ইয়াফুর গাধাটি নবীজি নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। ইয়াফুরকে দিয়ে নবীজি অনেক সময় সংবাদ আদান-প্রদানের কাজ নিতেন।

তবে নবীজির জন্য কিছু উপঢৌকন পাঠান। তাতে ছিল স্বর্ণ, মোলায়েম কাপড়, নিজস্ব খচ্চর দুলদুল এবং ‘ইয়াফুর’ নামের একটি গাধা। (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ, ১/১১৬, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ১৯৯৪ খ্রি.)

হাতিব (রা.) যখন উপহারসামগ্রী নিয়ে মদিনায় ফিরে আসেন, তখন নবীজি (সা.) মুকাওকিসের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব দেখে মন্তব্য করেছিলেন যে তাঁর রাজত্ব টিকবে না।

বিশ্বস্ত বার্তাবাহক

মিসরের বাদশাহর দেওয়া ইয়াফুর গাধাটি নবীজি নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। ইয়াফুরকে দিয়ে নবীজি অনেক সময় সংবাদ আদান-প্রদানের কাজ নিতেন। মাঝেমধ্যে তিনি বলতেন, ‘যাও, আবু বকরকে ডেকে নিয়ে এসো’।

ইয়াফুর নবীজির কথামতো তাঁর ঘরের সামনে গিয়ে ইশারা করত। ইশারা দেখে তিনি বুঝে ফেলতেন যে নবীজি তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছেন। এভাবেই ইয়াফুর অন্য সাহাবিদের কাছেও অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় হয়ে উঠেছিল।

নবীজির ইন্তেকালের পর মদিনাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। সাহাবিরা ধীরে ধীরে সেই শোক কাটিয়ে উঠলেও ইয়াফুরের শোক বুঝি কাটছিল না।

বিরহের অন্তিম পরিণতি

নবীজির ইন্তেকালের পর মদিনাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। সাহাবিরা ধীরে ধীরে সেই শোক কাটিয়ে উঠলেও ইয়াফুরের শোক বুঝি কাটছিল না।

একদিন একটি কূপের মধ্যে লাফ দিয়ে ইয়াফুর এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। (ইবনুল আসির, উসদুল গাবা, ৪/৭০৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত: ১৯৯৪ খ্রি.)

হতে পারে ইয়াফুরের এই আত্মবিসর্জন নবীজির প্রতি সৃষ্টির সেই অকৃত্রিম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

কেননা, যে ইয়াফুর একদিন নবীজির ইশারায় বার্তাবাহক হয়ে সাহাবিদের দুয়ারে দুয়ারে ছুটত, প্রিয় অভিভাবকের বিদায়ের পর তার কাছে এই পৃথিবী অর্থহীন হয়ে পড়া অসম্ভব নয়।

ইলিয়াস মশহুদ: আলেম, লেখক ও অনুবাদক