ইসলামি পরিভাষায় ‘ইলহাম’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্ম ধারণা। অনেক সময় মানুষের অন্তরে হঠাৎ কোনো ভালো কাজের তাগিদ, সত্য উপলব্ধি বা সঠিক সিদ্ধান্তের অনুভূতি জাগে—এই অনুভূতিকে সাধারণভাবে ‘ইলহাম’ বলা হয়।
তবে ইসলামে ইলহাম কী, এর সীমা কোথায় এবং এটি কতটুকু গ্রহণযোগ্য—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।
আরবি শব্দ ‘ইলহাম’ এসেছে ‘লাহামা’ ধাতু থেকে। এর আভিধানিক অর্থ:
অন্তরে কিছু ঢুকিয়ে দেওয়া
হৃদয়ে কোনো বিষয় প্রোথিত করে দেওয়া
হঠাৎ অন্তরে উদিত কোনো উপলব্ধি
অর্থাৎ, ইলহাম হলো এমন একটি বিষয়, যা মানুষের অন্তরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদিত হয়, কিন্তু তা অর্জনের জন্য বাহ্যিক শিক্ষা বা প্রচেষ্টার ভূমিকা থাকে না।
কোরআনে সরাসরি “ইলহাম” শব্দটি একবার ব্যবহৃত হয়েছে, “অতঃপর আল্লাহ তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের ‘জ্ঞান দান’ করেছেন।” (সুরা শামস, আয়াত: ৮)
তাফসিরকারগণ বলেন, এখানে “জ্ঞান দান করেছেন” বলতে মানুষের অন্তরে ভালো ও মন্দের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা ঢুকিয়ে দেওয়া বোঝানো হয়েছে—যা ইলহামের মৌলিক অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইসলামে ইলহামকে ওহির সঙ্গে এক করা হয় না।
ওহি শুধু নবীদের জন্য নির্দিষ্ট
ইলহাম নবী নন—এমন মানুষের অন্তরেও হতে পারে
ইলহাম মূলত তিন ধরনের হতে পারে:
আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণকর অনুপ্রেরণা
মানুষের নিজস্ব চিন্তা ও মানসিক প্রবণতা
শয়তানের কুমন্ত্রণা
এ কারণে কেবল “ভালো লাগছে” বা “মনে হচ্ছে”—এই যুক্তিতে ইলহামকে শরিয়তের দলিল বানানো যায় না।
ইসলামি আকিদা অনুযায়ী
ইলহাম শরিয়তের উৎস নয়
কোরআন ও সুন্নাহর বিপরীত হলে কোনো ইলহাম গ্রহণযোগ্য নয়
ইলহাম কেবল ব্যক্তিগত অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণযোগ্য
ইমাম গাজালি বলেন, ইলহাম যদি কোরআন ও সুন্নাহর মানদণ্ডে সঠিক হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য; অন্যথায় তা বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে। (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন)
হাদিসে এসেছে, কিছু সাহাবির অন্তরজ্ঞান বা উপলব্ধি পরবর্তীতে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে ওমর (রা.) সম্পর্কে রাসুল (স.) বলেছেন, “তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে এমন লোক ছিলেন, যাদের অন্তরে সত্য প্রেরণা দেওয়া হতো। যদি আমার উম্মতে কেউ থাকে, তবে সে ওমর।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৮৯)
এটি প্রমাণ করে যে ইলহাম থাকতে পারে, কিন্তু তা নবুয়তের পর্যায়ের নয়।
অনেকে ইলহাম ও কাশফকে এক মনে করেন, যা সঠিক নয়।
ইলহাম: অন্তরের অনুভূতি বা অনুপ্রেরণা
কাশফ: আধ্যাত্মিক উপলব্ধির দাবি
ইসলামে দুটিই শরিয়তের অধীন; কোনোটিই স্বাধীন দলিল নয়।
ইলহাম বিষয়ে ইসলামের অবস্থান ভারসাম্যপূর্ণ,
একে পুরোপুরি অস্বীকার করা হয় না
আবার একে অন্ধভাবে অনুসরণও করা হয় না
কোরআন ও সুন্নাহর বাইরে গিয়ে ইলহামের দাবি করা হলে তা বিভ্রান্তি ও ভ্রান্ত আকিদার জন্ম দেয়।
সংক্ষেপে বলা যায়, ইলহাম হলো মানুষের অন্তরে উদিত এক ধরনের উপলব্ধি বা অনুপ্রেরণা, যা আল্লাহর পক্ষ থেকেও হতে পারে, আবার মানুষের নিজস্ব চিন্তা বা শয়তানের কুমন্ত্রণাও হতে পারে।
তাই ইসলামে ইলহামকে কখনোই শরিয়তের মূল উৎস ধরা হয়নি। কোরআন ও সুন্নাহই চূড়ান্ত মানদণ্ড; ইলহাম কেবল তার আলোকে যাচাইযোগ্য একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি মাত্র।