তিনি নবীজির বিশেষ স্নেহধন্য সাহাবি ছিলেন। জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন ধীমান সাহাবিদের মধ্যে তাঁকে গণ্য করা হয়। তিনি হোদাইবিয়ার সন্ধির প্রাক্কালে ‘বাইয়াতে রিজওয়ানে’ও অংশগ্রহণ করেন।
শারীরিক অবয়বে তিনি দীর্ঘদেহী ছিলেন। অত্যন্ত নির্ভীক ও বিচক্ষণ এই সাহাবির প্রতি মানুষের একধরনের শ্রদ্ধামাখা ভীতি ছিল। ইয়ারমুক যুদ্ধের দিন তাঁর একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৩/২১, দারুল হাদিস, কায়রো: ২০০৬ খ্রি.)
তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘নবীজিকে কবরে দাফন করার পর তাঁর কবর থেকে সবার শেষে বেরিয়ে আসা লোকটি ছিলাম আমি। সবাই কবর থেকে বেরিয়ে আসছিল, তখন ইচ্ছা করে কবরে আমার হাতের আংটি ফেলে আসি।
এরপর আলিকে বলি, ‘আবুল হাসান, কবরে আমার আংটি পড়ে গেছে?’
তিনি বলেন, ‘কবরে নেমে নিয়ে আসুন।’ আমি তখন নিচে নেমে শেষবারের মতো নবীজির কাফন ছুঁয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি।’ (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১১/২২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত: ১৪০৭ হি.)
তাঁর নাম মুগিরা ইবনে শুবা (রা.)। উপনাম আবু ইসা, আবু আবদুল্লাহ অথবা আবু মুহাম্মাদ। সাকিফ গোত্রের সন্তান। তাঁর মা উমামা বিনতে আফকাম ছিলেন নাসর ইবনে মুয়াবিয়া গোত্রের কন্যা। পঞ্চম হিজরিতে খন্দক যুদ্ধের বছর ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সে বছরই মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন।
কৌশল অবলম্বন, উপায় উদ্ভাবন, সতর্কতা ও চাতুর্যসংক্রান্ত তাঁর বেশ কয়েকটি ঘটনা খুবই প্রসিদ্ধ।
নবীজিকে কবরে দাফন করার পর তাঁর কবর থেকে সবার শেষে বেরিয়ে আসা লোকটি ছিলাম আমি। সবাই তখন কবর থেকে বেরিয়ে আসছিল।
হজরত ওমর (রা.) মুগিরাকে বাহরাইনের কর্মকর্তা নিযুক্ত করেন। কিন্তু বাহরাইনবাসী আপত্তি করলে ওমর তাঁকে সরিয়ে নেন। এরপরও বাহরাইনবাসী এ আশঙ্কা করতে থাকেন যে ওমর আবারও তাঁকে সেখানে পাঠাতে পারেন।
তখন তাদের জনৈক নেতা লোকজনকে বলে, ‘তোমরা যদি একটা কাজ করতে পারো, তাহলে আমি ওমর কর্তৃক এখানে তাঁর পুনর্নিয়োগ আটকে দিতে পারি।’ তারা বলে, ‘বলুন, আমাদের কী করতে হবে?’
ওই নেতা বলল, ‘তোমরা ১ লাখ মুদ্রা সংগ্রহ করে আমার হাতে দাও। আমি ওগুলো নিয়ে ওমরের কাছে গিয়ে বলব, মুগিরা অবৈধ পন্থায় এই অর্থ জোগাড় করে আমার কাছে রেখেছেন।’
তারা তখন ১ লাখ মুদ্রা জমা করে তাঁর হাতে তুলে দেয়। লোকটি অর্থগুলো নিয়ে উমরের কাছে উপস্থিত হয়ে পরিকল্পিত কথাগুলো উপস্থাপন করে। (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৩/২৬, দারুল হাদিস, কায়রো: ২০০৬ খ্রি.)
ওমর তখন মুগিরাকে ডেকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। মুগিরা জবাবে বলেন, ‘আল্লাহ খলিফার কল্যাণ করুন। এখানে তো ১ লাখ নয়, বরং ২ লাখ মুদ্রা থাকার কথা!’
ওমর তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কিন্তু কোন জিনিস তোমাকে এমনটা করতে প্ররোচিত করল?’ মুগিরা স্বাভাবিক কণ্ঠে বলেন, ‘পরিবার ও প্রয়োজন।’ এবার ওমর (রা.) বাহরাইনি নেতাকে বলেন, ‘মুগিরার কথা তো শুনলে? এবার বলো, এ ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কী?’
লোকটি ভয়াবহ বিপদ আঁচ করতে পেরে বলে, ‘আল্লাহর কসম, আমি আপনার কাছে সত্য বলছি, আসলে তিনি আমার কাছে কিছুই রাখেননি।’ ওমর (রা.) বিষয়টি বুঝতে পেরে মুগিরাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি এভাবে বললে কেন?’
মুগিরা জবাব দেন, ‘আমিরুল মুমিনিন, এই অসৎ লোকটি আমার ব্যাপারে মিথ্যা বলছিল, তাই আমি চেয়েছি সে অপমানিত হোক।’ (তাবারানি, তারিখুত তাবারি, ৬/১৫০, দারুল মা’আরিফ, কায়রো: ১৯৬৭ খ্রি.)
ওমর (রা.) মুগিরাকে বাহরাইনের কর্মকর্তা নিযুক্ত করেন। কিন্তু বাহরাইনবাসী আপত্তি করলে ওমর তাঁকে সরিয়ে নেন। এরপরও বাহরাইনবাসী এ আশঙ্কা করতে থাকেন যে ওমর আবারও তাঁকে সেখানে পাঠাতে পারেন।
কাবিসা ইবনে জাবির বলেন, ‘আমি এ জন্য মুগিরার সান্নিধ্য গ্রহণ করেছি—যদি কোনো শহরে আটটি দরজা থাকে এবং কৌশল অবলম্বন ছাড়া কোনো দরজা দিয়ে বের হওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে মুগিরা আটটি দরজা দিয়েই বেরিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখেন।’ (ইবনুল আসির, উসদুল গাবা, ৪/৪০৬, দারুল ফিকর, বৈরুত: ১৪০৯ হি.)
সে–সময় রাজনৈতিক সতর্কতা ও বিচক্ষণতায় চারজন ছিলেন সবার শীর্ষে। তাঁরা হলেন: মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান, আমর ইবনুল আস, মুগিরা ইবনে শুবা (রা.) ও জিয়াদ ইবনে আবিহি। (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৩/৩০, দারুল হাদিস, কায়রো: ২০০৬ খ্রি.)
৪১ হিজরিতে মুয়াবিয়া (রা.) তাঁকে কুফার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন। (উকায়লি, খিলাফাতু মুয়াবিয়া, ৪৫, দারুল নাফাইস, বৈরুত: ২০০৫ খ্রি.)
খারিজিদের দমনে তাঁর ভূমিকা ছিল চিরস্মরণীয়। দীর্ঘ সময় পাওয়ায় কুফার জামে মসজিদের ব্যাপক সংস্কারকাজ করেন। মসজিদটিকে একসঙ্গে ৪০ হাজার মানুষের নামাজ পড়ার উপযোগী করে গড়ে তোলেন। তিনি ৪৯ হিজরি, অন্য বর্ণনায় ৫০ হিজরি পর্যন্ত কুফার গভর্নর ছিলেন।
মুগিরা ইবনে শুবার মৃত্যু সম্পর্কে জানা যায়, ৫০ হিজরিতে কুফায় যে প্লেগ মহামারি দেখা দেয়, সেই প্লেগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। (ইবনে হাজার আসকালানি, আল-ইসাবাহ, ৩/৪৫২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত: ১৪১৫ হি.)
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। তাঁর থেকে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। বহু সাহাবি ও তাবেয়ি তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৩/৩১, দারুল হাদিস, কায়রো: ২০০৬ খ্রি.)
ইলিয়াস মশহুদ: আলেম, লেখক ও অনুবাদক