ব্যক্তিত্ব

কে ছিলেন ইমাম আল-মাওয়ার্দি

ইসলামি ইতিহাসের ক্লাসিক যুগের শ্রেণিবিন্যাস ও সুবিন্যস্তকরণের সময়ে যে কজন মনীষী তাঁদের মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে জ্ঞানজগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন, আবুল হাসান মাওয়ার্দি তাঁদের অন্যতম।

তিনি একাধারে একজন প্রখ্যাত ফকিহ, বিজ্ঞ বিচারক এবং দূরদর্শী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ছিলেন। ইসলামি রাজনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি বা ডকট্রিনাল কাঠামো নির্মাণে তাঁর অবদান আজও বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।

বিশেষ করে রাষ্ট্রদর্শন ও ফিকহ শাস্ত্রে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে।

জন্ম ও শিক্ষা

পুরো নাম আবুল হাসান আলি ইবনে মুহাম্মদ ইবনে হাবিব আল-মাওয়ার্দি। ৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে (৩৬৩ হিজরি) ইরাকের বসরা নগরীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাল্যকাল কাটে বসরাতেই।

এখানে আবুল কাসিম আল-সাইমারির কাছে ফিকহ শিক্ষা করেন এবং পরবর্তী সময়ে শেখ আবু হামিদ আল-ইসফায়িনির কাছে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে সফর করেন। তিনি বসরা ও বাগদাদে বহু বছর অধ্যাপনা করেছেন।

মাওয়ার্দি এমন এক সময়ে জ্ঞানচর্চা করেছেন, যখন ইসলামি জ্ঞানজগৎ বর্ণনাভিত্তিক পদ্ধতি থেকে যুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে প্রবেশ করছিল। (শিরাজি, আত-তাবাকাতুল ফুকাহা, পৃ. ১১৫-১১৬, দারুল রায়েদ আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৭০)

মাওয়ার্দি বিচার বিভাগে কাজি হিসেবে নিযুক্ত হন। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিচারকার্য পরিচালনা করে তিনি বাগদাদের প্রধান কাজির পদ অলংকৃত করেন।

কর্মজীবন ও বিচারকের দায়িত্ব

শিক্ষা সমাপ্তির পর মাওয়ার্দি বিচার বিভাগে কাজি হিসেবে নিযুক্ত হন। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিচারকার্য পরিচালনা করে তিনি বাগদাদের প্রধান কাজির পদ অলংকৃত করেন।

৪২৯ হিজরিতে খলিফা আল-কাদির যখন চারটি সুন্নি মাজহাবের জন্য প্রামাণ্য আইনগ্রন্থ রচনার উদ্যোগ নেন, তখন শাফেয়ি মাজহাবের আইনবিধি সংকলনের দায়িত্ব পড়ে মাওয়ার্দির ওপর।

অসাধারণ পারদর্শিতার জন্য তাঁকে ‘মহা বিচারপতি’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। শাফেয়ি ঘরানার আলেম হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সহিষ্ণুতার কারণে তিনি শিয়া বুওয়াইহিদ শাসকদের কাছেও সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ছিলেন।

রাষ্ট্রদর্শন ও খেলাফত-ভাবনা

মাওয়ার্দির রাজনৈতিক দর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইমামত বা খেলাফত। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-আহকামুস সুলতানিয়া’কে ইসলামি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অপরিহার্য দলিল ধরা হয়।

তিনি বিশ্বাস করতেন, নেতৃত্বের দায়িত্ব মুসলিম সমাজের ওপর ন্যস্ত এবং সর্বসম্মত ঐক্যের ভিত্তিতে নির্বাচিত নেতাই পদাধিকারবলে নবীজির খলিফা হিসেবে গণ্য হবেন।

তিনি রাষ্ট্রকে একটি শক্তির আধার হিসেবে দেখতেন, যা দ্বীন রক্ষা এবং পার্থিব শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। (কুরদি, আবকারিয়াতুল ইসলাম ফি উসুলিল হিকাম, পৃ. ৩২২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত, ২০০৩)

তিনি দেখিয়েছেন, ধর্ম এবং বিজ্ঞানের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; বরং আকল বা বুদ্ধিই সভ্যতা ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।

রচনাবলি

ইমাম মাওয়ার্দির লেখনী অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বহুমুখী। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো:

১. আল-কিতাবুল হাবি: ফিকহশাস্ত্রের একটি বিশাল বিশ্বকোষ।

২. আল-আহকামুস সুলতানিয়া: ইসলামি শাসনতান্ত্রিক আইনের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ।

৩. আদাবুদ দীন ওয়াদ দুনিয়া: সমাজ গঠন প্রক্রিয়া ও সমাজবিজ্ঞানের থিওরি নিয়ে লেখা তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ।

৪. আদাবুল ওজির: রাষ্ট্রপরিচালনায় মন্ত্রীদের ভূমিকা ও নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা।

বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান

তিনি তাঁর আদাবুদ দীন ওয়াদ দুনিয়া গ্রন্থে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন—জন্মগত বুদ্ধি এবং অর্জিত বুদ্ধি। এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, ধর্ম এবং বিজ্ঞানের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; বরং আকল বা বুদ্ধিই সভ্যতা ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।

এছাড়া তিনি ‘উমরান’ বা জনপদ বিকাশের ধারণাও দিয়েছেন, যা পরবর্তীকালে ইবনে খালদুনের বিখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বে রূপ লাভ করে।

হাদিস বর্ণনা

ইমাম মাওয়ার্দি হাসান বিন আলী আল-জাবালির সূত্রে জাফর বিন মুহাম্মদ বিন ফজলের কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন খতিব বাগদাদি। তিনি তাঁকে ‘সেকাহ’ বা নির্ভরযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন। (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৮/৬৭, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৪)

শাফেয়ি মাজহাবের অন্যতম ফকিহ হিসেবে সুলতানের দরবারেও তাঁর বিশেষ প্রভাব ছিল।

মৃত্যুশয্যায় তিনি তাঁর এক বিশ্বস্ত অনুচরকে বলেন, ‘আমার মৃত্যুর সময় যদি আমি তোমার হাত চেপে ধরি, তবে বুঝবে আমার আমল কবুল হয়নি এবং আমার সব বই দজলা নদীতে ফেলে দেবে।’

আত্মশুদ্ধির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

ইমাম মাওয়ার্দির জীবনে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যা তাঁর চারিত্রিক উচ্চতা ও ইখলাসের প্রমাণ দেয়। তাঁর কালজয়ী একটি উপদেশ হলো, ‘মানুষ রাতের কোনো এক সময়ে তার দিনের কাজগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখবে।

যদি কাজগুলো ভালো হয় তবে তা বহাল রাখবে, আর মন্দ হলে অনুশোচনা করবে এবং ভবিষ্যতে তা না করার প্রতিজ্ঞা করবে।’ (আল-মাওয়ার্দি, আদাবুদ দীন ওয়াদ দুনিয়া, পৃ. ৩৪, দারুল মিনহাজ, জেদ্দা, ২০১৩)

সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটে তাঁর গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে। ইমাম মাওয়ার্দি তাঁর জীবদ্দশায় কোনো কিতাব প্রকাশ করেননি এই ভয়ে যে তাঁর নিয়ত হয়তো পুরোপুরি খাঁটি হয়নি।

মৃত্যুশয্যায় তিনি তাঁর এক বিশ্বস্ত অনুচরকে বলেন, ‘আমার মৃত্যুর সময় যদি আমি তোমার হাত চেপে ধরি, তবে বুঝবে আমার আমল কবুল হয়নি এবং আমার সব বই দজলা নদীতে ফেলে দেবে।’

লোকটির বর্ণনা মতে, মৃত্যুর সময় তিনি তাঁর হাত প্রসারিত করে দিয়েছিলেন, যা তাঁর ইখলাসের প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এরপরই তাঁর কিতাবসমূহ প্রকাশিত হয়। (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৮/৬৬, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৪)

মৃত্যু

এই মহান চিন্তাবিদ ১০৫৮ খ্রিষ্টাব্দে (৪৫০ হিজরি) রবিউল আউয়াল মাসের শেষ দিন ইন্তেকাল করেন। পরদিন তাঁকে বাগদাদের ‘বাব আল-হারব’ কবরস্থানে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর (জাহাবি, তারিখুল ইসলাম, ৭/১৬৯, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)

  • ইলিয়াস মশহুদ: গবেষক ও প্রাবন্ধিক।