পবিত্র কোরআনের ক্ষুদ্রতম সুরাগুলোর অন্যতম সুরা কাউসার। সুরাটি মাত্র তিনটি আয়াতে এক গভীর বার্তা বহন করে। মক্কার অবিশ্বাসীদের নেতা আস ইবনে ওয়াইল নবীজি (সা.)–কে ‘আবতার’ (নির্বংশ) বলে উপহাস করেছিল।
অথচ ইতিহাসের অদ্ভুত পরিণতিতে তাঁর নাতি আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস হয়ে উঠলেন হাদিস সংকলনের পথিকৃৎ।
‘কাউসার’ শব্দটি আরবি ‘কাছরাহ’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ প্রাচুর্য বা অধিক্য। ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে কাউসার শব্দটি সীমাহীন কল্যাণ ও আধ্যাত্মিক সম্পদের প্রতীক। (তাফসির আল-কুরআন আল-আজিম, বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ২০০০, ৪/৫৫৬)
আল্লাহর রাসুল (সা.)–এর পুত্রসন্তানদের মৃত্যুর পর মক্কার কাফেররা তাঁকে ‘আবতার’ বা নির্বংশ বলে উপহাস করত। আস ইবনে ওয়াইল ছিলেন মক্কার অন্যতম প্রভাবশালী নেতা এবং ইসলামের কট্টর বিরোধী।
সে বলে বেড়াত, ‘তাকে ছেড়ে দাও, সে তো একজন নির্বংশ ব্যক্তি, যার কোনো পুত্রসন্তান নেই। সে মারা গেলে কেউ তাকে স্মরণ করবে না, সুতরাং তাঁকে নিয়ে আমাদের চিন্তার কিছু নেই।’
আবু জাহল, উকবা ইবনে আবু মুআইত এবং আবু লাহাবও একই ধরনের কটূক্তি করত। (তাফসির আল-কুরআন আল-আজিম, বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ২০০০, ৪/৫৫৭)
আস ইবনে ওয়াইলের পুত্র আমর ইবনে আস ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) হয়ে ওঠেন সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম প্রধান হাদিস বিশারদ। (জাহাবি, ১/৪১)
তিনি ৭ হিজরিতে ইসলাম গ্রহণ করেন, তাঁর পিতার এক বছর আগে। তিনি কোরআন ও তাওরাত উভয়ের পণ্ডিত ছিলেন এবং ‘কারিউল কিতাবাইন’ (দুই কিতাবের পাঠক) উপাধিতে ভূষিত হন। আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁর জ্ঞানের কারণে তাঁকে বিশেষ মর্যাদা দিতেন। (ইবনুল আসির, ৩/২৩৩)
আবদুল্লাহ ইবনে আমর আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে সরাসরি শ্রুত হাদিসগুলো লিখে রাখতেন। এই সংকলনের নাম ছিল ‘আস-সহিফা আস-সাদিকা’ অর্থাৎ ‘সত্যবাদী পাণ্ডুলিপি’।
মুজাহিদ (রহ.) বলেন, ‘আমি আবদুল্লাহ ইবনে আমরের কাছে একটি পাণ্ডুলিপি দেখে জিজ্ঞাসা করলাম এটি কী? তিনি বললেন, ‘এটি আস-সাদিকা, যাতে আমি আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে সরাসরি শ্রুত হাদিসগুলো লিখেছি—এতে আমার ও নবীর মধ্যে কোনো মাধ্যম নেই।’
এই সংকলনে প্রায় এক হাজার হাদিস ছিল। পরে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) তাঁর ‘মুসনাদে আহমাদ’ গ্রন্থে এই সম্পূর্ণ সংকলনটি অন্তর্ভুক্ত করেন ‘আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস’ অধ্যায়ে।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) তাঁর এই পাণ্ডুলিপি সর্বদা বালিশের নিচে রাখতেন এবং নিয়মিত অনুশীলন করতেন। তাঁর নাতি আমর ইবনে শুয়াইব এই সংকলন থেকে হাদিস বর্ণনা করতেন এবং মুহাদ্দিসগণ তাঁর বর্ণনার নির্ভরযোগ্যতা স্বীকার করেছেন।
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আছে যে আবু হুরাইরা (রা.) বলেছেন: ‘সাহাবিদের মধ্যে আমার চেয়ে বেশি হাদিস কেউ বর্ণনা করেনি, কেবল আবদুল্লাহ ইবনে আমর ছাড়া। কারণ, তিনি হাদিস লিখতেন, আর আমি লিখতাম না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৩)
এই স্বীকৃতি আবদুল্লাহ ইবনে আমরের হাদিস সংরক্ষণে অনন্য অবদানের প্রমাণ।
সুরা কাউসারে আল্লাহ–তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীই নির্বংশ।’ এই আয়াতের বাস্তবায়ন ইতিহাস প্রত্যক্ষ করেছে। আস ইবনে ওয়াইল, আবু জাহল, আবু লাহাব, উকবা ইবনে আবু মুআইত—যারা রাসুলকে (সা.) ‘আবতার’ বা নির্বংশ বলেছিল—তাদের কেউ আজ নিজেদের তাদের বংশধর বলে পরিচয় দিতে চায় না।
তাফসিরে তাফহিমুল কোরআনে সাইয়িদ আবুল আ’লা মওদুদী লিখেছেন: ‘তারা এত বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে যে আজ কেউ যদি তাদের বংশধরও হয়, সে জানে না যে, সে আবু জাহল, আবু লাহাব, আস ইবনে ওয়াইল বা উকবা ইবনে আবু মুআইতের বংশধর। এমনকি জানলেও সে এই পরিচয় দিতে প্রস্তুত নয়।’ (সাইয়িদ আবুল আলা মওদুদি, তাফহিমুল কুরআন, লাহোর: ইদারা তরজুমানুল কুরআন, ১৯৭২, পৃ. ৫২৭-৫২৮)
পবিত্র কোরআনে সুরা শারহে আল্লাহ–তাআলা বলেছেন: ‘আমি তোমার স্মরণকে সমুন্নত করেছি।’ (আয়াত: ৪)
তাফসিরে কাতাদা (রহ.) বলেছেন: ‘আল্লাহ তাঁর নবীর নাম দুনিয়া ও আখিরাতে সমুন্নত করেছেন। কোনো খতিব নেই, কোনো তাশাহহুদ পাঠকারী নেই, কোনো নামাজ আদায়কারী নেই, যিনি ঘোষণা করেন না: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল।’ তাবারি, জামিউল বায়ান ফি তাফসিরিল কুরআন, কায়রো: দারুল মা’আরিফ, ২৪/৪৯৫)
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন: ‘জিবরাইল আমার কাছে এসে বললেন: তোমার রব বলছেন, তুমি কি জানো আমি কীভাবে তোমার নাম সমুন্নত করেছি? আমি বললাম: আল্লাহই ভালো জানেন। তিনি বললেন: যখন আমাকে স্মরণ করা হয়, তখন তোমাকেও আমার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।’ (তাফসির আল-কুরআন আল-আজিম, বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ২০০০, ৪/৫২৭)
muhsin.du@gmail.com
মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর : খণ্ডকালীন শিক্ষক, আরবি বিভাগ, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়