
মানবজাতির ইতিহাসে ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাসের এক অনন্য প্রতীক হলেন আইয়ুব (আ.)। পবিত্র কোরআনে তাঁর জীবনকে ধৈর্যশীলতার উপমা হিসেবে পেশ করা হয়েছে। চরম দুর্যোগে কীভাবে ইমানের ওপর অবিচল থাকতে হয়, তার এক বাস্তব পাঠ দিয়ে গেছেন তিনি পৃথিবীকে।
ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে, তিনি ছিলেন নবী ইব্রাহিমের বংশধর এবং নবী ইসহাকের পৌত্র। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১/২২০, দারু হিজর, কায়রো, ১৯৯৭)
হজরত আইয়ুব (আ.) বর্তমান সিরিয়ার বাসান অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যেমন ছিলেন পরম ধার্মিক, তেমনি আল্লাহ তাঁকে দান করেছিলেন অগাধ ধন-সম্পদ, বিশাল গবাদি পশুর খামার এবং বহু সন্তান-সন্ততি।
কিন্তু এই প্রাচুর্য তাঁকে কখনো অহংকারী করেনি; বরং তিনি সর্বদা আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। তাঁর এই ঐকান্তিক আনুগত্য শয়তান ইবলিশের হিংসার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন।
অসুস্থতার কারণে আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশী সবাই তাঁকে ত্যাগ করে চলে যায়। এমনকি তাঁকে জনবসতি থেকে দূরে এক নির্জন স্থানে ফেলে আসা হয়।
নবী আইয়ুবের পরীক্ষা শুরু হয় তাঁর ধন-সম্পদ হারানোর মাধ্যমে। একের পর এক দুর্যোগে তাঁর সমস্ত গবাদি পশু মারা যায় এবং শস্যক্ষেত ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু এই বিশাল ক্ষতির মুখেও আইয়ুব (আ.) বিচলিত হননি। তিনি শুধু বললেন, “আল্লাহই দিয়েছিলেন এবং তিনিই নিয়ে নিয়েছেন।”
এর পরপর তাঁর ওপর নেমে আসে আরও বিপর্যয়। এক প্রবল ঝড়ে তাঁর ঘর ভেঙে পড়ে এবং তাঁর সকল সন্তান মারা যান। এমন শোচনীয় পরিস্থিতিতেও তিনি সিজদাবনত হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন এবং বলেন, “নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৬)
সম্পদ ও সন্তান হারানোর পর তাঁর শরীরে কঠিন রোগ বাসা বাঁধে। সারা শরীরে এমন ক্ষত তৈরি হয় যে লোকজন তাঁর কাছে আসতে ভয় পেত। দীর্ঘ আঠারো বছর তিনি এই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন বলে কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়। অসুস্থতার কারণে আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশী সবাই তাঁকে ত্যাগ করে চলে যায়। এমনকি তাঁকে জনবসতি থেকে দূরে এক নির্জন স্থানে ফেলে আসা হয়।
স্মরণ করো আইয়ুবের কথা, যখন সে তার পালনকর্তাকে ডেকে বলেছিল—আমি কষ্টে পড়েছি, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।কোরআন, সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৩
এই চরম দুর্দিনেও তাঁর স্ত্রী রহমত বিনতে এফরাঈম (যিনি ছিলেন নবী ইউসুফের নাতনি) তাঁকে ছেড়ে যাননি। তিনি দিনমজুরের কাজ করে স্বামীর সেবা ও খাদ্যের যোগান দিতেন। শয়তান বারবার নবীর মনে কুমন্ত্রণা দেওয়ার চেষ্টা করত যেন তিনি আল্লাহর প্রতি অভিযোগ করেন, কিন্তু তিনি সর্বদা জিকিরে মশগুল থাকতেন।
পবিত্র কোরআনে তাঁর এই অবস্থার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, “স্মরণ করো আইয়ুবের কথা, যখন সে তার পালনকর্তাকে ডেকে বলেছিল—আমি কষ্টে পড়েছি, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।” (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৩)
দীর্ঘ বছরের অসম্ভব কষ্ট সহ্য করার পর যখন তাঁর ধৈর্য ও একাগ্রতা পূর্ণতায় পৌঁছাল, তখন আল্লাহ–তাআলা তাঁর প্রার্থনা কবুল করলেন। তাঁকে নির্দেশ দিলেন, “তুমি তোমার পা দিয়ে ভূমিতে আঘাত করো; এই তো গোসলের জন্য শীতল পানি ও পানীয়।” (সুরা সাদ, আয়াত: ৪২)
আল্লাহর নির্দেশে তিনি সেই ঝরনার পানিতে গোসল করলেন এবং তা পান করলেন। তাঁর শরীরের সমস্ত রোগ ব্যাধি দূর হয়ে গেল এবং তিনি পূর্বের মতো সুস্থ ও সুদর্শন হয়ে উঠলেন।
আল্লাহ–তাআলা শুধু তাঁর স্বাস্থ্যই ফিরিয়ে দেননি, বরং তাঁর সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততিও দ্বিগুণ করে ফিরিয়ে দিলেন। তাঁর হারানো জীবনের সমস্ত সুখ আল্লাহ পুনরায় দান করলেন।
তাঁর এই অসামান্য ধৈর্যের প্রশংসা করে আল্লাহ বলেন, “আমি তাকে ধৈর্যশীল পেয়েছি। কতই না চমৎকার বান্দা সে! নিশ্চয়ই সে ছিল আল্লাহ অভিমুখী।” (সুরা সাদ, আয়াত: ৪৪)
তিনি প্রায় ২২০ বছর জীবিত ছিলেন এবং সিরিয়ার সেই বাসান অঞ্চলেই তাঁকে দাফন করা হয়।
নবী আইয়ুবের জীবন আমাদের শেখায়, মানুষের জীবনে বিপদ-আপদ সর্বদা তার পাপের কারণে আসে না; বরং কখনো কখনো এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ইমানের পরীক্ষাস্বরূপ আসে। বিশেষ করে কঠিন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বা নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষের জন্য তাঁর জীবন এক বিরাট সান্ত্বনা।
মহানবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “মানুষের মধ্যে নবীরাই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন, তারপর যারা তাদের নিকটবর্তী (নেককার) তারা।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৯৮)
আইয়ুব (আ.) প্রমাণ করেছেন যে, পার্থিব সম্পদ বা সুস্বাস্থ্য জীবনের সব নয়; বরং যেকোনো পরিস্থিতিতে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকাই হলো প্রকৃত মুমিনের পরিচয়।
তিনি প্রায় ২২০ বছর জীবিত ছিলেন এবং সিরিয়ার সেই বাসান অঞ্চলেই তাঁকে দাফন করা হয়।