ইসলামি আইনশাস্ত্রের ইতিহাসে চার মাজহাবের ইমাম হলেন ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.); যারা ‘চার ইমাম’ নামে খ্যাত। তারা ছিলেন সুরুচি, পরিচ্ছন্নতা ও আভিজাত্যের অনন্য প্রতীক।
বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষের মনে আলেমদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে যে কৃচ্ছ্রসাধনের চিত্র রয়েছে, তা মূলত ইতিহাসের সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রত্যেকেই তাঁদের নিজস্ব উপায়ে সৌন্দর্য ও পোশাকের এক একটি ধারা তৈরি করেছিলেন।
ইসলামে সুন্দর পোশাক
ইসলাম ধূলিমলিন ও জীর্ণ অবয়ব ধারণ করাকে পছন্দ করে না, বরং মুমিনকে বাহ্যিক অবয়বে সুন্দর ও মজবুত অবস্থায় দেখতে চায়। কোরআনের একটি বাণীকে কেন্দ্র করে ইসলামের সৌন্দর্যতত্ত্ব গড়ে উঠেছে। আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, “হে আদম সন্তান, প্রতি নামাজের সময় তোমাদের জিনাত গ্রহণ করো।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)
পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা, উত্তম অবয়ব ধারণ করা এবং নিজের আভিজাত্য প্রকাশ করা নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।”ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.)
ফখরুদ্দিন রাজি (রহ.) লিখেছেন, এই আয়াতে ‘জিনাত’ বলতে শরীরের পরিচ্ছন্নতা, দামি পোশাক, সুগন্ধি এবং বাহনসহ সকল প্রকার নান্দনিক সৌন্দর্যকে বোঝানো হয়েছে। (ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি, মাফাতিহুল গাইব, ১৪/৫০, কায়রো, ১৯৮১ খ্রি.)
ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) পোশাকের পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যকে ইমানের অন্যতম উচ্চ স্তরে স্থান দিয়ে বলেছিলেন, “পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা, উত্তম অবয়ব ধারণ করা এবং নিজের আভিজাত্য প্রকাশ করা নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।” (কাজি আইয়াজ আল-জাহসুবি, তারতিবুল মাদারিক ওয়া তাকবিবুল মাসালিক, ১/৪২, মাককাতাবাতুল ফাদ্দালাহ, মোহাম্মাদিয়া, মরক্কো, ১৯৮৩)
চার ইমামের ব্যক্তিগত জীবনে চমৎকার পোশাক-সজ্জা গ্রহণ ও রুচির খতিয়ান তুলে ধরা হলো:
১. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)
হানাফি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আজম আবু হানিফা (মৃ. ১৫০ হি.) ছিলেন সেযুগে কুফার কাপড়ের পাইকারি বাজারের (বাজ্জাজ) একজন সফল আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী। তিনি বিশেষ ধরনের দামি রেশম ও সুতি কাপড় উৎপাদন ও বাজারজাত করতেন। ব্যবসার এই সচ্ছলতা তাঁর ব্যক্তিগত পোশাকেও ফুটে উঠেছিল।
তিনি সুগন্ধি ব্যবহারে এতটা অভ্যস্ত ছিলেন যে বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তার কোন দিক দিয়ে হেঁটে গেছেন, তা শুধু বাতাসের সুবাস শুঁকে মানুষ বলে দিতে পারত যে এইমাত্র ইমাম আবু হানিফা এই পথ অতিক্রম করেছেন। (আবু আব্দুল্লাহ সাইমারি, আখবারু আবি হানিফা ওয়া আসহাবুহু, পৃষ্ঠা: ১৪ কায়রো, ১০৪৫ খ্রি.)
বলা হয়, তিনি গভীর রাতে যখন নামাজে দাঁড়াতেন, তখনও নিজের দাড়ি আঁচড়ে দামি আতর মেখে মুসাল্লায় যেতেন।
তাঁর ছাত্র কাজি আবু মুতি বলভি বলেছেন, “আমি একবার জুমার দিন ইমাম আবু হানিফাকে একটি জুব্বা ও চাদর পরিহিত অবস্থায় দেখলাম, যার তৎকালীন বাজারমূল্য ছিল ৪০০ দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা)।”
তবে তাঁর সংগ্রহে এমন দামি চাদরও ছিল যার মূল্য ছিল ৩০ দিনার (স্বর্ণমুদ্রা)। (ইবনে হাজার হাইতামি, আল-খায়রাতুল হিসান ফি মানাকিবি আবি হানিফাতান নুমান, পৃষ্ঠা: ১২ , মাকতাবাতুস সাআদাহ, কায়রো, ১৫৬৬ খ্রি.)
বর্তমান মুদ্রা বাজারে সেকালের ৪০০ দিরহামের বর্তমান মূল্য প্রায় ৫০০ মার্কিন ডলার এবং ৩০ দিনারের মূল্য প্রায় ৫,০০০ মার্কিন ডলারের সমান।
ছাত্রদের কখনো তিনি মলিন পোশাকে দেখতে পছন্দ করতেন না। তাঁর শিক্ষা মজলিসে এক ছাত্রকে জীর্ণ পোশাকে দেখে তিনি মজলিস শেষে তাকে থাকতে বললেন। সবাই চলে গেলে চাদরের নিচ থেকে ১ হাজার দিরহাম বের করে ছেলেটিকে দিয়ে বললেন, “এটি দিয়ে তোমার পোশাক পরিবর্তন করো।”
ছেলেটি লজ্জিত হয়ে বলল, “ইমাম, আমি অভাবী নই, আমার ঘরে পর্যাপ্ত সম্পদ আছে।”
আবু হানিফা তখন রেগে গিয়ে বললেন, “তুমি কি আল্লাহর বাণী শোননি—আল্লাহ তাঁর বান্দার ওপর তাঁর নেয়ামতের প্রকাশ দেখতে পছন্দ করেন? তুমি যদি ধনী হয়েও ফকিরের বেশ ধরে থাকো, তবে তোমার চেহারা দেখে তোমার বন্ধুরা কষ্ট পাবে এবং এটাই হলো নেয়ামতের খেয়ানত।” (খতিব বাগদাদি, তারিখু বাগদাদ, ১৩/২৪, দারুল কুতুবিল ইলমিয়া, বৈরুত, ১০৭১ খ্রি.)
তাঁর শিক্ষা মজলিসে এক ছাত্রকে জীর্ণ পোশাকে দেখে তিনি মজলিস শেষে তাকে থাকতে বললেন। সবাই চলে গেলে চাদরের নিচ থেকে ১ হাজার দিরহাম বের করে ছেলেটিকে দিয়ে বললেন, “এটি দিয়ে তোমার পোশাক পরিবর্তন করো।”
২. ইমাম মালিক (রহ.)
মদিনার ইমাম, ইমাম মালিক ইবনে আনাস (মৃ. ১৭৯ হি.) ছিলেন আরবের অন্যতম অভিজাত জীবনযাপনকারী আলেম। তিনি মনে করতেন, আল্লাহর রাসুলের পবিত্র শহরের আলেমদের পোশাক এমন হতে হবে যাতে অমুসলিম ও সাধারণ মানুষ আলেমদের দেখে শ্রদ্ধা করে।
ইন্তেকালের পর তাঁর ঘর থেকে যে ব্যক্তিগত সম্পদের তালিকা (মিরাস) পাওয়া গিয়েছিল, তা দেখে সমকালীন আলেমদের চোখ কপালে ওটে। তাঁর সংগ্রহে ছিল ১০০টি চমৎকার দামী রাজকীয় পাগড়ি (আমামা) এবং প্রায় ৫০০ জোড়া উন্নত চামড়ার জুতো। (কাজি আইয়াজ, তারতিবুল মাদারিক, ২/৪৫)
তিনি কখনো সস্তা বা সাধারণ কাপড় পরতেন না; তাঁর সমস্ত পোশাক আসত মিসরের রাজকীয় সুতা এবং খোরাসানের উন্নত কটন থেকে।
তাঁর বসার ঘরটি ছিল তৎকালীন মদিনার প্রাসাদের মতো। ঘরের চারধারে দামি রেশমের গদি ও কুশন সাজানো থাকত, যেখানে মক্কার কোরাইশি নেতারা এসে বসতেন। নিজের ঘরের দরজায় বরকতের জন্য কোরআনের আয়াতের অনুকরণে ‘মাশাআল্লাহ’ (আল্লাহ যা চেয়েছেন) লিখে রাখতেন। (ইবনে আবদিল বার কুরতুবি, আল-ইনতিকা ফি ফাজায়িলিস সালাসাতিল আইম্মাতিল ফুকাহা, পৃষ্ঠা: ২০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়া, বৈরুত, ১৯৭০ খ্রি.)
তাঁর ছাত্র বিশর আল-হাফি বলেছেন, “আমি একবার ইমাম মালিকের দরবারে প্রবেশ করে দেখলাম তাঁর চাদরের মূল্যই হবে প্রায় ৫০০ দিরহাম। চাদরের ভাঁজ তাঁর চোখের ওপর এমনভাবে নেমে এসেছিল যে তাঁকে দেখতে পারস্যের রাজার মতো লাগছিল।”
তিনি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর ক্রীতদাস পেছনে পেছনে হাঁটত এবং তিনি ঘরে প্রবেশ করার পর দাসটি পরম যত্নে তাঁর চামড়ার মোজা খুলে পা পরিষ্কার করে দিত।
৩. ইমাম শাফেয়ি (রহ.)
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদ্রিস আশ-শাফেয়ি (মৃ. ২০৪ হি.) যৌবনে চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হলেও তাঁর ব্যক্তিগত রুচি ও পরিচ্ছন্নতা ছিল অত্যন্ত আধুনিক।
পোশাক-পরিচ্ছদের বিষয়ে তাঁর একটি মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব ছিল। তিনি বলতেন, “যে ব্যক্তি নিজের পোশাক পরিষ্কার রাখে, তার জীবনের দুঃখ-কষ্ট ও দুশ্চিন্তা কমে যায়; আর যে ব্যক্তি দামি সুগন্ধি ব্যবহার করে, তার মস্তিষ্কের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়।” (ইবনুল জাওজি, সিফাতুস সাফওয়াহ, ২/১২, দারুল মাদারিল ইসলামি, বৈরুত, ২০০১ খ্রি.)
তিনি মিসরের জামে আমর ইবনে আস-এ যখন পড়াতে বসতেন, তাঁর ক্রীতদাস প্রতিদিন ক্লাসের মূল স্তম্ভটিতে দামি সুগন্ধি ‘গালিয়া’ মেখে রাখত যাতে পুরো ক্লাসের পরিবেশ সুবাসিত থাকে।
তিনি বাগদাদে তাঁর ছাত্র আবু আলি আল-জাফরানির বাড়িতে মেহমান হিসেবে থাকতেন। জাফরানি প্রতিদিন তাঁর বাবুর্চি জাজিয়াকে একটি কাগজে লিখে দিতেন যে ইমামের জন্য আজ কী কী খাবার রান্না করতে হবে। তালিকায় বেশ দামী খাবার থাকত। একদিন ইমাম শাফেয়ি কৌতূহলবশত সেই ‘মেনু কার্ড’ হাতে নেন এবং নিজের কলম দিয়ে নিচে তাঁর পছন্দের আরেকটি দামী খাবারের নাম লিখে দেন।
রাতে জাফরানি দস্তরখানে নতুন খাবারটি দেখে বাবুর্চিকে জিজ্ঞেস করেন। বাবুর্চি ইমামের হাতের লেখার কাগজটি দেখায়। জাফরানি এত আনন্দিত হন যে বাবুর্চিকে আজাদ (দাসত্ব থেকে মুক্ত) করে দেন। (কাজি আইয়াজ, তারতিবুল মাদারিক, ১/৪৩)
তাঁর এই সাদাসিধা অথচ মার্জিত পোশাক দেখে বাগদাদের অমুসলিম চিকিৎসকেরাও মুগ্ধ হতেন এবং বলতেন, “ইমাম আহমাদের এই পরিচ্ছন্ন অবয়ব শুধু মুসলমানদের জন্যই নয়, পুরো মানবজাতির জন্য এক পরম আদর্শ।”
৪. ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)
চার ইমামের মধ্যে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (মৃ. ২৪১ হি.) ছিলেন সবচেয়ে দুনিয়াবিমুখ। তবে তাঁর এই সরলতায় কোনো ‘মলিনতা’ ছিল না।
তাঁর দীর্ঘ ২০ বছরের ব্যক্তিগত সহকারী আব্দুল মালিক আল-মাইমুনি বলেন, “আমি আমার পুরো জীবনে ইমাম আহমাদের চেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, সুন্দর দাড়ি ও চুল আঁচড়ানো এবং ধবধবে সাদা সুতি পোশাক পরিহিত কোনো মানুষ আর দেখিনি।” (ইবনুল জাওজি, মানাকিবু ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, কায়রো, পৃষ্ঠা: ১২০, দারুল আফাক আল-জাদিদাহ, বৈরুত, ১৯৭৯ খ্রি.)
ইমাম আহমাদ দামী রেশমের পোশাক পরতেন না বটে, তবে তিনি যে সুতি চাদর পরতেন, তা ছিল নিখুঁত ও পরিপাটি। শীতের দিনে তিনি দুটি সাধারণ জুব্বা পরতেন এবং মাথায় একটি সাধারণ টুপি নিজেই সুই-সুতা দিয়ে সেলাই করে নিতেন।
তাঁর এই সাদাসিধা অথচ মার্জিত পোশাক দেখে বাগদাদের অমুসলিম চিকিৎসকেরাও মুগ্ধ হতেন এবং বলতেন, “ইমাম আহমাদের এই পরিচ্ছন্ন অবয়ব শুধু মুসলমানদের জন্যই নয়, পুরো মানবজাতির জন্য এক পরম আদর্শ।” (ইবনুল জাওজি, মানাকিবু ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, কায়রো, পৃষ্ঠা: ১২৫)
শেষ কথা
চার ইমামের এই নান্দনিক জীবনধারা প্রমাণ করে যে ইসলামে ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে বাহ্যিক সৌন্দর্যের কোনো সংঘাত নেই। তাঁরা দেখিয়েছেন, একজন খাঁটি আল্লাহভীরু মানুষ একই সঙ্গে সমাজের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও রুচিশীল ব্যক্তি হতে পারেন।
সমকালীন সমাজ ও বর্তমান যুগের আলেমদের জন্য তাঁদের এই সৌন্দর্যের ঐতিহ্য এক পরম শিক্ষণীয় অধ্যায়, যা আমাদের জীবনকে যান্ত্রিক কদর্যতা থেকে মুক্ত করে এক সুন্দর ও সুপাট্য রূপ দিতে সাহায্য করে।
আল-জাজিরা ডট নেট অবলম্বনে