ইহসান শব্দটির সাধারণ অর্থ ‘দয়া’ বা ‘উপকার’ মনে হলেও এর ব্যাপ্তি অনেক গভীর। এর প্রকৃত অর্থ হলো, যেকোনো কাজে পরম উৎকর্ষ অর্জন করা, আচরণে নিখুঁত সৌন্দর্যের ছোঁয়া দেওয়া এবং হৃদয়ের সমস্ত উষ্ণতা উজাড় করে সৃষ্টির পাশে দাঁড়ানো।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “সাত আকাশ, পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সবকিছুই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে; এমন কিছু নেই যা তাঁর প্রশংসাসহ পবিত্রতা পাঠ করে না, কিন্তু তোমরা তাদের স্তুতিগান উপলব্ধি করতে পারো না।” (সুরা ইসরা, আয়াত: ৪৪)
মানুষ যখন হৃদয়ের চোখ দিয়ে এই সত্য অনুধাবন করে, তখন চারপাশের কোনো কিছুকেই আর তুচ্ছ বা অপ্রয়োজনীয় মনে হয় না।
জড় পদার্থের সঙ্গেও যে মানুষের আত্মিক ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে, তার সবচেয়ে অনুপম দৃষ্টান্ত মেলে রাসুলের জীবনে। তিনি সাহাবিদের বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই মক্কার এমন একটি পাথরকে আমি চিনি, নবুয়ত পাওয়ার আগে থেকেই যে আমাকে সালাম দিত; আমি আজও সেই পাথরটিকে চিনতে পারি।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৭৭)
গবেষক মুহাম্মদ আস-সুওয়াইয়ানি এক চমৎকার উপলব্ধি তুলে ধরে লিখেছেন, “আমাদের চারপাশের এই নীরব নিসর্গের মধ্যেও অনন্ত প্রার্থনা ও সুর ধ্বনিত হচ্ছে; কিন্তু তা আবিষ্কার করতে প্রয়োজন এক সংবেদনশীল হৃদয় ও মন। আল্লাহ কি সেই পাথরকে মানুষের ভাষা দিয়েছিলেন যার ফলে সে মুহাম্মদকে সম্বোধন করেছিল, নাকি তিনি মুহাম্মদকে এমন গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছিলেন যার ফলে তিনি পাথরের ভাষা বুঝতে পেরেছিলেন? যেভাবেই হোক, সেই সালামের মধ্য দিয়েই রচিত হয়েছিল মুহাম্মদ ও মক্কার প্রকৃতির মাঝে ভালোবাসার এক অবিনাশী উপাখ্যান।” (আস-সুওয়াইয়ানি, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ কামা জা–আত ফিল আহাদিসিস সহিহাহ, পৃষ্ঠা: ৫৩, মাকতাবাতুল উবাইকান, রিয়াদ, ২০০৪)
আল্লাহ যখন মানুষকে জীবন, আলো, বাতাস আর রিজিক দান করেন, তখন তিনি কোনো কার্পণ্য করেন না। কোনো বিনিময়ের শর্ত ছাড়াই তিনি বান্দার ওপর করুণার বারিধারা বর্ষণ করেন।
সৃষ্টির সঙ্গে মানুষের আচরণের মূল চালিকাশক্তি কী হবে, তা কোরআনে মাত্র কয়েকটি শব্দের নির্দেশনায় বেঁধে দেওয়া হয়েছে, “আর তুমি মানুষের প্রতি তেমন সুন্দর আচরণ করো, যেমন সুন্দর আচরণ আল্লাহ তোমার প্রতি করেছেন।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৭)
আল্লাহ যখন মানুষকে জীবন, আলো, বাতাস আর রিজিক দান করেন, তখন তিনি কোনো কার্পণ্য করেন না। কোনো বিনিময়ের শর্ত ছাড়াই তিনি বান্দার ওপর করুণার বারিধারা বর্ষণ করেন। একজন বিশ্বাসী মানুষের দায়িত্ব হলো, আল্লাহর সেই অবারিত দানের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে সৃষ্টির কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়া।
এই দান কেবল অর্থ বিলানোর মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। কাজে সততা ও নিখুঁত দক্ষতার পরিচয় দেওয়াও ইহসান, কারও চোখের জল মোছানোও ইহসান, এমনকি কাউকে আশ্বস্ত করে একমুঠো মিষ্টি হাসি উপহার দেওয়াও ইহসানের অংশ।
মানুষের বাইরে থাকা অন্য প্রাণীদের প্রতি দায়িত্ববোধ ইসলামে কোনো কাগুজে নীতিকথা নয়; বরং তা আদালতের আইনি কাঠামোর অংশ। মধ্যযুগের মুসলিম ফকিহগণ তাঁদের ফিকহগ্রন্থগুলোর ‘কিতাবুন নাফাকাত’ (ভরণপোষণ অধ্যায়)-এ এমন কিছু বিস্ময়কর নীতিমালা লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
সেখানে একজন মানুষের ওপর তার পোষা কুকুর, বিড়াল, পাখি এমনকি বাড়ির আঙিনার বৃক্ষরাজির যত্ন ও খরচের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইসলামি চিন্তাবিদ ইউসুফ আল-কারজাভি লিখেছেন, “ইসলামের ফিকহশাস্ত্রে পশুপাখি ও উদ্ভিদের অধিকার নিয়ে যে সুবিস্তৃত বিধান দেওয়া হয়েছে, তার পেছনে কোনো বাণিজ্যিক লাভ বা পার্থিব স্বার্থ কাজ করেনি; বরং এটি পরিচালিত হয়েছে এক বিশুদ্ধ নৈতিক প্রেরণা দ্বারা, যার মূল কথাই হলো যেকোনো জীবন্ত প্রাণের ওপর থেকে কষ্ট, অন্যায় ও ক্ষতি দূর করা।” (আল-কারজাভি, রিয়ায়াতুল বিআহ ফি শারিয়াতিল ইসলাম, পৃষ্ঠা: ১৩১, দারুশ শুরুক, কায়রো, ২০০১)
এমনকি পশুর জীবনের অবসান ঘটানোর মুহূর্তেও রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ের ওপর সর্বোত্তম সুন্দর আচরণ (ইহসান) আবশ্যক করেছেন; অতএব যখন তোমরা কোনো পশুকে জবাই করবে, তখনো সুন্দর পন্থায় জবাই করো। তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার ছুরি ধারালো করে নেয় এবং জবাইকৃত পশুকে দ্রুত কষ্টমুক্ত করে স্বস্তি দেয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৫৫)
খাদ্যের প্রয়োজনেও যেখানে প্রাণীর বেদনাবোধের প্রতি এমন সজাগ দৃষ্টি রাখা হয়, সেখানে প্রকৃতির ওপর নির্বিচার অত্যাচার ইসলামের চোখে কত বড় অপরাধ—তা সহজেই অনুমেয়।
সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের মেলামেশায় ইহসান এক জাদুকরি পরশপাথর। এটি কেবল নিজের অধিকার আদায়ের মানসিকতা ভেঙে অন্যকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করে। কোরআনের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায় ইহসানের বহুমাত্রিক রূপ:
ইহসান হলো, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত পালন করবে যেন তুমি তাঁকে নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছ; আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে নিশ্চিত জানবে যে তিনি তোমাকে দেখছেন।সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮
মা-বাবার সেবা: মা-বাবার সামনে নিজের অহংকার বিসর্জন দিয়ে বিনম্রতার ডানা মেলে ধরা হলো ইহসানের প্রথম ধাপ। (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৩–২৪)
সহনশীলতা: জীবনের কঠিন সময়ে ভেঙে না পড়ে অবিচল থাকা হলো ইহসান; কারণ আল্লাহ মুহসিন বা সুন্দর মনের মানুষদের প্রতিদান কখনো নষ্ট করেন না। (সুরা হুদ, আয়াত: ১১৫)
ক্ষমা ও উদারতা: প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মানুষের ভুলত্রুটিকে ক্ষমা করে উদার চিত্তে তা ভুলে যাওয়া ইহসানের এক অনন্য স্তর। (সুরা মায়িদাহ, আয়াত: ১৩)
দুর্বলের পাশে দাঁড়ানো: নিজের পরিবারের পাশাপাশি এতিম, মিসকিন, নিকট ও দূরবর্তী প্রতিবেশী, পথচারী এবং গৃহকর্মীর মুখে অন্ন তুলে দেওয়া এবং তাঁদের সম্মান রক্ষা করা ইমানের দাবি। (সুরা নিসা, আয়াত: ৩৬)
নবীজির হাদিসে ইহসানের আত্মিক সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “ইহসান হলো, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত পালন করবে যেন তুমি তাঁকে নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছ; আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে নিশ্চিত জানবে যে তিনি তোমাকে দেখছেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮)
এই অনুভূতি যখন মানুষের মনে স্থায়ী রূপ নেয়, তখন তার জীবন থেকে সকল দ্বিমুখী চরিত্র ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। সে তখন লোকদেখানো কোনো ফাঁকিবাজির আশ্রয় নেয় না।
চিন্তাবিদ মুহাম্মদ কুতুব এমন আত্মশুদ্ধি অর্জনকারী মানুষদের বর্ণনা দিয়ে লিখেছিলেন, “তাদের কারও মুখোমুখি হওয়া মাত্রই আপনি তীব্রভাবে অনুভব করবেন যে আপনি একজন সত্যিকারের ‘মানুষ’-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন—যাঁকে আল্লাহ গভীর ভালোবাসায় সম্মানিত করেছেন। এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যাঁর কাছে গেলে মন শান্ত হয়, যাঁর লেনদেন ও আচরণে স্বচ্ছতার স্বস্তি পাওয়া যায়। আপনি তাঁকে ভালো না বেসে পারবেন না; এমনকি তাঁর চিন্তাধারা বা কাজের সঙ্গে আপনার মতের অমিল থাকলেও আপনি তাঁকে ভালোবাসতে বাধ্য হবেন। কারণ তাঁর অন্তরে জ্বলছে ঐশ্বরিক আলোর এক পবিত্র ফুলকি; আর আপনার হৃদয় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চাইবে।” (মুহাম্মদ কুতুব, ক্বাবাসাতুন মিনার রাসুল, পৃষ্ঠা: ৯৪, দারুশ শুরুক, কায়রো, ২০০৩)
যারা নিজেদের আত্মাকে এই সৌন্দর্যে সাজিয়ে তোলে, কোরআন তাদের জন্য এক পরম অভয়ের ঘোষণা দেয়, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন যারা খোদাভীতি অবলম্বন করে এবং যারা সুন্দরতম আচরণের অধিকারী” (সুরা নাহল, আয়াত: ১২৮)