
‘ভোজ্যতেলে ভিটামিন–এ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অস্বচ্ছ ফুড গ্রেড প্যাকেজিং’ শীর্ষক গোলটেবিলের আয়োজক ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলো।
আইন ও বিধিমালা বলছে, বাজারে ভোজ্যতেল খোলা বিক্রি করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। রাসায়নিক দ্রব্য বাজারজাত করার জন্য তৈরি করা ড্রামগুলোতেই বেশির ভাগ ভোজ্যতেল রাখা হচ্ছে। এসব ড্রাম খাদ্যমানসম্পন্ন বা ফুড গ্রেড নয়। ফলে মানুষের মধ্যে ক্যানসারসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
এ ছাড়া আলো প্রবেশ করে এমন স্বচ্ছ প্যাকেজিংয়ের ফলে ভোজ্যতেলের অণুপুষ্টি ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে। তাই আলো প্রতিরোধী অস্বচ্ছ প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার জরুরি। খোলা তেল বিক্রি বন্ধ করতে হবে, সেই সঙ্গে অস্বচ্ছ ও ফুড গ্রেড প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকি সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
‘ভোজ্যতেলে ভিটামিন–এ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অস্বচ্ছ ফুড গ্রেড প্যাকেজিং’ শিরোনামে এক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা এ কথা বলেছেন। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এ বৈঠকের আয়োজন করে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ এবং প্রথম আলো।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক বলেন, ফুড গ্রেড প্যাকেজিংয়ের বিষয়টি জনগণের কাছে বোধগম্য করে উপস্থাপন করতে হবে। ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি হলে পুরো জাতিকে তার জন্য খেসারত দিতে হয়। উৎপাদক থেকে ভোক্তা—সবার দায়িত্ব ভোজ্যতেলের মান অক্ষুণ্ন এবং অটুট রাখা।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সেবাষ্টিন রেমা বলেন, অনেকেই ভাবেন তেলের মধ্যে আবার ভিটামিন ‘এ’ কেন থাকতে হবে। এ জন্য বাজারের খোলা তেল নিয়ে অনেকেই আপত্তি করেন না। তাই জনগণকে সচেতন করার বিকল্প নেই।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (পরিকল্পনা) সুলতান আলম বলেন, ‘ভোজ্যতেল ভিটামিন “এ” সমৃদ্ধ’—এ বিষয়টি অনেকাংশে সফল হয়েছে। তবে এই তেল ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে কেন নিরাপদ থাকছে না, খোলাবাজারে তেল কেন বিক্রি হচ্ছে—এসব নিয়ে আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী। তিনি বলেন, শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও এমন ধারণা আছে যে স্বচ্ছ বোতলে স্বচ্ছ তেল মানেই তা ভালো। এমন ধারণা পাল্টাতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তিনি বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে তেল কম খাওয়ার পরামর্শ দেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মুশতাক হাসান মুহ. ইফতিখার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, স্বচ্ছ প্যাকেজিং আলো প্রতিরোধ করতে পারে না, ভিটামিন ‘এ’ নষ্ট হয়। তেলের স্বাদ, গন্ধ ও গুণগত মান খারাপ করে। নন-ফুড গ্রেড ড্রাম ব্যবহারে মনোমার, ভারী ধাতু, থ্যালেট, সলভেন্ট, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও কার্সিনোজেনিক যৌগ তেলে মিশে যায়। এতে ক্যানসার, হরমোনসংক্রান্ত সমস্যা, লিভার-কিডনির ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ভোজ্যতেলের সঠিক প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে হবে। কোনো তেলে ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া না গেলে মূল অপরাধীকে চিহ্নিত করতে হবে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বারবার একই তেল ব্যবহারের কারণে ক্যানসারসহ কী কী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে তা তুলে ধরেন। তিনি ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’র মাত্রা যাতে ঠিক থাকে, তা যাতে কারও জন্য ঝুঁকির কারণ না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান সোহেল রেজা চৌধুরী রোগ প্রতিরোধে তেল কম খাওয়াসহ খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের তাগিদ দেন। তিনি তেলে ভিটামিন ‘ডি’ও যুক্ত করা জরুরি বলে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির যুগ্ম মহাসচিব ফিরোজ আলম সুমন বলেন, শুধু কারওয়ান বাজারে গেলেই সবাই বুঝতে পারবেন ভোজ্যতেলের বাজারের আসল চিত্র। খোলা ড্রামে এক তেলের কথা বলে অন্য তেল বিক্রি করা হচ্ছে। তিনি মনে করেন, রেস্তোরাঁয় গিয়ে জরিমানা না করে মিলমালিকদের জরিমানা করতে হবে।
মেঘনা গ্রুপের সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক কুতুবুল আলম বলেন, ‘আমরা শতভাগ তেল বোতলজাত বা প্যাকেজিং করার জন্য প্রস্তুত রয়েছি, যন্ত্রপাতি কিনে বসে আছি। কিন্তু বাজারে চাহিদা না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না।’
টাঙ্গাইলে অবস্থিত মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশন সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক রোকেয়া বেগম ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত করা এক জরিপের তথ্য উল্লেখ করে বলেন, তেলে ভিটামিন ‘এ’ আছে কি নেই, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বা ধারণা কম। তেলের অস্বচ্ছ প্যাকেজিং জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের সহকারী অধ্যাপক মো. নাজমুস সাকিব বলেন, ভোজ্যতেলের মান ঠিক রাখা এবং সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা ও আলো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করে। বাজার থেকে খোলা তেল তুলে দিলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের সহযোগী বিজ্ঞানী গুলশান আরা তাঁদের করা এক গবেষণার কথা উল্লেখ করে জানান, প্যাকেটজাত ভোজ্যতেলে যে মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ থাকার কথা, ৬০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে তা পাওয়া গেছে। সহজলভ্য বলেই গ্রাম ও শহরের মানুষ এখনো খোলা তেল কিনছেন।
লার্জ স্কেল ফুড ফর্টিফিকেশন অ্যান্ড ভ্যালু চেইন, গেইনের পোর্টফোলিও লিড ড. আশেক মাহফুজ খোলা তেল বাজারে বিক্রি বন্ধে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
আলোচনায় আরও অংশ নেন এফপিএমইউর খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের সাবেক মহাপরিচালক শহীদুজ্জামান ফারুকী, বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্সের সাবেক সভাপতি এ এস এম কামাল উদ্দিন, টেকনোসার্ভের ফুড ফর্টিফিকেশন কনসালট্যান্ট মেহেদী হাসান, বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কে এম ইকবাল হোসেন, বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (হালাল সার্টিফিকেশন) এস এম আবু সাঈদ, কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ।
গোলটেবিল বৈঠকের সঞ্চালক ছিলেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।