‘জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূল: ২০৩০–এর পথে অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে
‘জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূল: ২০৩০–এর পথে অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে

গোলটেবিল বৈঠক

টিকায় নির্মূল হবে জরায়ুমুখ ক্যানসার

ওজিএসবি ও প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এমন অভিমত দেন।

দেশে প্রতি‍বছর নতুন করে জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত হন ৯ হাজারের বেশি নারী। নতুন–পুরোনো মিলিয়ে প্রতিবছর জরায়ুমুখ ক্যানসারে মৃত্যু হয় প্রায় ছয় হাজার নারীর। অথচ এইচপিভি (হিউম্যান পেপিলোমা ভাইরাস) টিকা দেওয়ার মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। আর আক্রান্ত হলেও শুরুতে শনাক্ত করে দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া যায়। এ জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে স্ক্রিনিং করাতে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শুধু কিশোরী নয়, বিবাহিত নারীদেরও এইচপিভি টিকা দেওয়া দরকার।

স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সংগঠন অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) ও প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এ কথাগুলো উঠে আসে। ‘জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূল: ২০৩০–এর পথে অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে বৈঠকটি গতকাল বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বৈজ্ঞানিক অংশীদার ছিল ইনসেপ্‌টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

বিশেষজ্ঞরা জানান, স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে কোনো নারী জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত কি না, তা আগে থেকেই শনাক্ত করা সম্ভব। সরকারিভাবে ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সী মাত্র ২১ শতাংশ নারীকে গত ১২ বছরে স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা গেছে। বাল্যবিবাহের মাধ্যমে কম বয়সে যৌন সম্পর্কে যুক্ত হওয়া, কম বয়সে বেশি সন্তান জন্ম দেওয়া, অপরিচ্ছন্ন থাকা, যেসব নারী ও পুরুষের একাধিক যৌনসঙ্গী থাকে (পুরুষদের একাধিক যৌনসঙ্গী থাকলে তাঁর মাধ্যমে তাঁর স্ত্রী বা নারীসঙ্গী আক্রান্ত হতে পারেন)—তাঁরা জরায়ুমুখ ক্যানসারের ঝুঁকিতে থাকেন। আর জরায়ুমুখ ক্যানসারের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব, সহবাসের পর রক্তক্ষরণ হওয়া, অনিয়মিত মাসিক, রজঃনিবৃত্তির পর আবার রক্ত যাওয়া ইত্যাদি।

বৈঠকে বলা হয়, জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০-৭০-৯০ সংখ্যাটিকে অনুসরণ করে লক্ষ্য অর্জন করতে বলেছে। অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী কিশোরীদের ৯০ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা, ৩০ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারীদের ৭০ শতাংশকে স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা এবং ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের প্রতিরোধ ও ক্যানসার–পূর্ববর্তী চিকিৎসাব্যবস্থা নেওয়া।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব (জনস্বাস্থ্য অধিশাখা) মো. শিব্বির আহমেদ ওসমানী বলেন, সরকার ২০২৩ সাল থেকে ১০ বছর বয়সী কিশোরীদের জন্য এইচপিভি টিকা বিনা মূল্যে দিচ্ছে। ২০২৫ সাল থেকে এই টিকা রুটিন কাজে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এবার এইচপিভি টিকার আওতায় এসেছে প্রায় ৮৯ ভাগ কিশোরী। সচেতনতা ও স্ক্রিনিং ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

ওজিএসবির সভাপতি অধ্যাপক ফিরোজা বেগম বলেন, যে গোষ্ঠীগুলো জরায়ুমুখ ক্যানসারের ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের টার্গেট করে ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করতে হবে। ভায়া বা ভিআইএ টেস্ট, প্যাপ স্মেয়ার ও এইচপিভি–ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে স্ক্রিনিং করা যায়। এইচপিভি–ডিএনএ সবচেয়ে কার্যকর হলেও এই পরীক্ষা দরিদ্রদের জন্য ব্যয়বহুল (আড়াই হাজার টাকা, সরকারি হাসপাতালে)। ডব্লিউএইচও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য ভিআইএ স্ক্রিনিং সুপারিশ করেছে।

জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য উল্লেখ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ বিভাগের (এনসিডি) সাবেক লাইন পরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে জরায়ুমুখ ক্যানসারের কোনো উপসর্গ থাকে না। ফলে এইচপিভি টিকার মাধ্যমে এই ক্যানসার প্রতিরোধ করতে হবে।

ওজিএসবির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারা বেগম বলেন, স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে শুরুতেই শনাক্ত করে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিলে এই রোগ থেকে সুস্থ হওয়া সম্ভব।

কিশোরীদের পাশাপাশি বিবাহিত নারীদেরও এইচপিভি টিকা দিয়ে প্রতিরোধব্যবস্থা নেওয়া যায় বলে মন্তব্য করেন জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) বাংলাদেশ কার্যালয়ের যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ আবু সাইদ মোহাম্মদ হাসান। তিনি বলেন, স্ক্রিনিং কমিউনিটি পর্যায়ে নারীদের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে হবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) গাইনি অনকোলজি বিভাগের অধ্যাপক আশরাফুন্নেসা বলেন, এইচপিভি পজিটিভ রোগীদের ৫০ শতাংশই জরায়ুমুখ ক্যানসার হয়েছে কি না, জানতে স্ক্রিনিংয়ে আসছেন না। তাঁদের স্ক্রিনিংয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

জিওএসবির সভাপতি ইলেক্ট অধ্যাপক ফরহাত হোসেন বলেন, লক্ষ্য অর্জনের জন্য ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত একটি কর্মপরিকল্পনা করে কাজ করা প্রয়োজন সরকারের। কোভিড ১৯–এর জন্য পিসিআর যন্ত্র কেনা রয়েছে সরকারের, সেগুলোকে এইচপিভি–ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করলে পরীক্ষা বাবদ খরচ কমে আসবে।

একবার স্ক্রিনিং করা হলেও ঝুঁকি এড়াতে পাঁচ বছর পর পর স্ক্রিনিং করতে হবে বলে জানান ওজিএসবির মহাসচিব অধ্যাপক মুসাররাত সুলতানা।

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের গাইনি অনকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক রোকেয়া আনোয়ার বলেন, স্ক্রিনিং খুবই সহজ পরীক্ষা। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা যেন তাঁর মা, বোন, স্ত্রী ও মেয়েকে স্ক্রিনিং করতে পাঠান।

একই হাসপাতালের একই বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক রেহেনা পারভীন বলেন, এইচপিভি সংক্রমণ হলেও বিবাহিত নারীদের টিকা দেওয়া যেতে পারে। এতে করে পুনরায় সংক্রমণ হবে না।

একই হাসপাতালের একই বিভাগের অধ্যাপক সাহানা পারভীন বলেন, জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব—এই বার্তা বেশি করে ছড়িয়ে দিতে পারলে স্ক্রিনিং বাড়বে।

এইচপিভি টিকা নিয়ে কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) গাইনি অনকোলজি বিভাগের চেয়ার‍ম্যান অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস জোনাকী। তিনি বলেন, সচেতনতা বাড়াতে মাদ্রাসার শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের গাইনি অনকোলজি বিভাগের পরামর্শক মির্জা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা আশাবাদী সবার সম্মিলিত চেষ্টায় ২০৩০ সালের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যানসার মোকাবিলায় প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।’

গোলটেবিল বৈঠকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ইনসেপ্‌টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক ফারহানা লাইজু। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।