সোনা মসজিদ মুক্তকরণ

সম্মুখসমর: ১৯৭১

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নিরীহ বাঙালি অসীম সাহসে মুখোমুখি হয়েছিল পাকিস্তানের প্রশিক্ষিত বাহিনীর বিরুদ্ধে। ছিনিয়ে এনেছিল বিজয়। বীরত্বপূর্ণ সেসব সম্মুখযুদ্ধ উজ্জ্বল হয়ে আছে স্বাধীনতার স্বপ্নে, আত্মত্যাগের মহিমায়। মুক্তিযুদ্ধের বহুল আলোচিত কয়েকটি যুদ্ধ নিয়ে প্রথম আলোর এ আয়োজন।

ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর, বীরশ্রেষ্ঠ
 ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর, বীরশ্রেষ্ঠ

সোনা মসজিদ এলাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমার [বর্তমানে জেলা] শিবগঞ্জ থানার [বর্তমানে উপজেলা] অন্তর্গত। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের প্রায় ৮ মাইল অভ্যন্তরে সোনা মসজিদের অবস্থান। এ স্থানের কাছ দিয়ে পাগলা নদীর একটি শাখা ভারত সীমান্ত ঘেঁষে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর অগ্রসর হয়ে ভারতের ভিতর চলে গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে একটি কাঁচা-পাকা সড়ক সোনা মসজিদ হয়ে সীমান্তের ওপারে মালদহে প্রবেশ করেছে। সীমান্ত থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অভিমুখী সকল যানবাহন চলাচল ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এ এলাকাটি মেহেদীপুর সাব-সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সীমান্তবর্তী এ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও স্বাধীনতাবিরোধী সকল শত্রুর বিরুদ্ধে তাদের আক্রমণ অব্যাহত রেখেছিল।

মুক্তিযোদ্ধাদের এরূপ তৎপরতা ও কার্যক্রমকে প্রতিহত করতে অক্টোবর মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সোনা মসজিদ এলাকায় নিয়মিত এবং অনিয়মিত (ইপিসিএফ ও রাজাকার) বাহিনীর সমন্বয়ে একটি সুদৃঢ় প্রতিরক্ষাব্যুহ গড়ে তোলে। তদুপরি মুক্তিযোদ্ধারা তাদের আক্রমণ অব্যাহত রাখে।

সোনা মসজিদে শক্তিশালী এবং সুবিধাজনক অবস্থানের কারণে পাকিস্তানিরা একাধিকবার মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে সমর্থ হয়। তারা সোনা মসজিদ এলাকায় নদীর পূর্ব প্রান্তে, বাঁশ, চাটাই ইত্যাদির সাহায্যে বাঙ্কার তৈরি করে প্রতিরক্ষা অবস্থান নেয়। বাঙ্কার থেকে বাঙ্কারে যোগাযোগের জন্য নদীর পাড় বরাবর প্রায় ১ মাইল দীর্ঘ সুড়ঙ্গ কেটে চলাচলের ব্যবস্থা করে এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে প্রতিরক্ষা অবস্থান সুদৃঢ় করে। পাকিস্তানীরা দূর থেকে মুক্তিবাহিনীর গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য বিভিন্ন উঁচু গাছে এবং বহুতলা ভবনে পর্যবেক্ষণ চৌকি স্থাপন করে। মুক্তিবাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণ পথে একদল মর্টার বাহিনীকেও মোতায়েন রাখে।

সে সময় ১০ নভেম্বর সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী নূর–উজ–জামান পাকিস্তানীদের সোনা মসজিদের এই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানটি দখল করে সেখান থেকে পাকিস্তানি বাহিনীকে উৎখাত করার জন্য মেজর গিয়াসকে [গিয়াস উদ্দিন। স্বাধীনতার পর ব্রিগেডিয়ার] নির্দেশ দেন। ১১ এবং ১২ নভেম্বর মেজর গিয়াস সম্পূর্ণ এলাকা পর্যবেক্ষণ করে শত্রুর প্রতিটি কোম্পানি, প্লাটুন এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের অবস্থান নির্ণয় করেন।

আক্রমণের জন্য তিনি সাত নম্বর সেক্টরের ৪টি কোম্পানিকে বাছাই করে ২টি টাস্ক ফোর্স গঠন করেন। ‘এ’ ও ‘বি’ কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত টাস্ক ফোর্সের অধিনায়ক নিয়োজিত হন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর [বীরশ্রেষ্ঠ। ১৪ ডিসেম্বর শহীদ]। ‘সি’ ও ‘ডি’ কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত টাস্ক ফোর্সের নেতৃত্বে দেওয়া হয় লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমকে। মুক্তিবাহিনীর ৩টি ৮১ মিলিমিটার মর্টার আর্টিলারি সাপোর্ট নিয়ে সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী নূর–উজ–জামান এই আক্রমণে নিজেই মোবাইল ফায়ার কন্ট্রোলারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৩ নভেম্বর সকাল ৯টায় মেজর গিয়াস কাপড়ের ওপর আঁকা মডেলে তাঁর অপারেশনাল অর্ডার দেন। ১৪ নভেম্বর ভোর রাতে শত্রু অবস্থানের ডান প্রান্ত দিয়ে মূল আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। আক্রমণের নির্দিষ্ট দিক সম্পর্কে শত্রুকে বিভ্রান্ত করার জন্য শত্রুর অবস্থানের বাম দিকে এক প্লাটুন শক্তির একটি দলের সাহায্যে আক্রমণ করা হবে। খাল অতিক্রমের জন্য দক্ষিণ দিকে খালের অপেক্ষাকৃত শীর্ণকায় দুটি স্থান নির্বাচন করা হয়।

ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বাধীন টাস্ক ফোর্সটি (‘এ’ ও ‘বি’ কোম্পানী) দক্ষিণ দিক দিয়ে খাল অতিক্রম করে শত্রুর পেছন থেকে ঘিরে উত্তর পূর্ব দিকের শত্রু অবস্থানের উপর আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের নেতৃত্বাধীন টাস্ক ফোর্স (‘সি’ ও ‘ডি’ কোম্পানি) খাল অতিক্রমে করে উত্তর দিক থেকে আক্রমণ করবে। এক প্লাটুন শক্তির একটি দল মূল আক্রমণের ১ ঘণ্টা আগে, মূল আক্রমণের দিক সম্পর্কে পাকিস্তানিদেরকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে খালের পশ্চিম পাড় থেকে পাকিস্তনি অবস্থানের বাম দিকে আক্রমণ করবে এবং আর্টিলারি দল ১৪ নভেম্বর দিবগাত রাত ৩টায় ধীর গতিতে শত্রু অবস্থানের উপর আর্টিলারি গোলাবর্ষণ শুরু করবে। আক্রমণে অংশগ্রহণকারী সকল দল ১৩ নভেম্বর দিবাগত রাত ১টায় শত্রু অবস্থান থেকে প্রায় দেড় মাইল পশ্চিমে সমবেত হবে। রাত ২টায় তারা খাল অতিক্রম শুরু করবে। এই ছিল আক্রমণ পরিকল্পনার মূল প্রতিপাদ্য।

সোনা মসজিদ যুদ্ধক্ষেত্রের নকশা

স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোদ্ধাদের দিয়ে বড় মাপের নৈশ আক্রমণ পরিকল্পনা করা অত্যন্ত দুরূহ। ১৩ নভেম্বর সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ আগে খালের পশ্চিম পাড়ে অবস্থানের নিকটবর্তী একটি দুতলা ভবন থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল নূর–উজ–জামান আর্টিলারি ফায়ারের জন্য টার্গেট রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেন। মুক্তিসেনারা যথাসময়ে সমাবেশ স্থলে সমবেত হয়। পুরো এলাকাটি যেহেতু মেজর গিয়াসের নখদর্পণে ছিল তাই তিনি নিজেই টাস্কফোর্সগুলোকে নদী অতিক্রম করার স্থানে পৌছে দিয়ে নিজে খালের পশ্চিম পাড়ে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি স্থানে অবস্থান নেন।

রাত ৩টার দিকে একটি প্লাটুন খালের পশ্চিমপাড় থেকে শত্রুর অবস্থানের ওপর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গোলাবর্ষণ শুরু করে। একই সময় আর্টিলারি আক্রমণ–পূর্ব গোলাবর্ষণ শুরু করে। কিন্তু ১ ঘণ্টা যাবত আর্টিলারি গোলাবর্ষণে পরও মেজর গিয়াস মূল দলের কোন সাড়া পাচ্ছিলেন না। অবশেষে আনুমানিক ভোর ৫টার দিকে লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করতে সমর্থ হন। ভোর ৪টার সময় তাঁর আক্রমণ সূচনা করার কথা থাকলেও দুইটি নৌকা পানিতে ডুবে যাওয়ায় তিনি দল নিয়ে আক্রমণ স্থলে পৌছতে দেরি করেন। সকাল সাড়ে ৫টায় তিনি শত্রুর ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ শুরু করেন।

মুক্তিবাহিনী ইতিপূর্বে বাম দিক দিয়ে রাত ৩টায় গুলিবর্ষণ শুরু করায় শত্রুরা ধরে নিয়েছিল—আক্রমণ বাম দিক থেকেই হবে—তাই তারা এদিক থেকে আক্রমণ প্রতিহত করার প্রস্তুতিও সম্পন্ন করে। ওদিকে সকাল ৬টায় ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। পানিতে নৌকা ডুবে ওয়ারলেসে পানি ঢুকে যাওয়ায় তিনি আগে যোগাযোগ করতে সমর্থ হননি। তিনি সাড়ে ৬টায় আক্রমণ শুরু করেন। তাঁর লক্ষ্যবস্তু ছিল পাকিস্তনিদের সদর দপ্তর।

১৪ নভেম্বর কুয়াশাচ্ছান্ন ভোর হঠাৎ ডান দিকের আক্রমণে পাকিস্তনিরা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়ে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা গুলিবর্ষণের মাধ্যমে গুলির জবাব দিতে শুরু করে। পৌনে ছটায় কাইয়ুম বাহিনী শত্রুর অবস্থানের সামনে চলে আসে এবং লড়াই করতে করতে প্রতিরক্ষা অবস্থানের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। সকাল ৭টায় তিনি তাঁর লক্ষ্যবস্তু অধিকার করতে সমর্থ হন। তবে তিনি প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হন।

তুমুল যুদ্ধের পর সকাল ৮টায় ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর পাকিস্তানী বাহিনীকে পরাস্ত করেন। যুদ্ধে একজন ক্যাপ্টেনসহ ১১জন পাকিস্তানী নিহত হয় এবং আহত অবস্থায় পাঁচজনকে বন্দী করা হয়। পক্ষান্তরে মুক্তিবাহিনীর সাতজন আহত হয়। এরূপ কৌশলগত আক্রমণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানীদের নিকট থেকে সোনা মসজিদ এলাকা মুক্তিবাহিনীর হস্তাগত হয়। (ঈষৎ পরিমার্জিত)

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ, সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর সাত, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।