সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল
সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল

বিশ্বকাপ না খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি মূলত আমারই ছিল: আসিফ নজরুল

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কট করেছিল বাংলাদেশ। বিশ্বকাপে খেলতে না যাওয়ার সেই সিদ্ধান্তটি তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলেরই ছিল। তিনি নিজেও আগে একাধিকবার এ কথা বলেছেন। এ ঘটনা নিয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের পর আসিফ নজরুল আবার সেই সিদ্ধান্তের দায় নিয়ে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে পুরো ঘটনাটির তদন্ত এবং তা প্রকাশ করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক এই উপদেষ্টা।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার কারণ উদ্‌ঘাটনে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। আজ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সেই তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন কমিটির প্রধান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এ কে এম ওয়ালী উল্লাহ। কমিটির অপর দুই সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও বিসিবির বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর।

সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল


২২ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বয়কট করার দায় কার, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য লিখিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে সরকারের কার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপ খেলতে যায়নি, সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে জানানো হয় যে সিদ্ধান্তটি ছিল অধ্যাপক আসিফ নজরুলের।

প্রতিবেদনের ১৯ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত কোনো একজন ব্যক্তির নেওয়া উচিত নয়। তবে এই ‘একজন ব্যক্তি’ কে, লিখিত প্রতিবেদনে তা পরিষ্কার করা না হলেও সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর বলেন, ‘এই একজন’ বলতে তারা তখনকার ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকেই বুঝিয়েছেন। বিশ্বকাপে না খেলার পেছনে মূল দায় কার, এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়ালী উল্লাহ বলেন, ‘এটা সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল। এর বাইরে আর কী বলব!’


তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, ‘ভারতে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি তখনকার ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে মূলত আমারই ছিল। আমি নিজেই এ কথা একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছি। তাই এত দিন পর ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিষয়টি ঘটা করে তদন্ত করে তা প্রকাশের কী এমন কারণ ঘটল বুঝলাম না।’
সিদ্ধান্তের পটভূমি তুলে ধরে আসিফ নজরুল লেখেন, ‘ঘটনার সূত্রপাত উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের চাপের মুখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে অপমানজনকভাবে বাদ দেওয়া থেকে। এর পরপরই আমরা নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা এবং বাংলাদেশের প্রতি অবমাননার প্রতিবাদে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার বিষয়ে অনীহা জানাই।’


নিজের আশঙ্কার পক্ষে আইসিসির প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও লেখেন, ‘আমাদের আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না, আইসিসির প্রথম রিপোর্টেই তার স্বীকৃতি ছিল। সেখানে ভারতে নিরাপত্তা-আশঙ্কার তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল, বিশ্বকাপের দলে মোস্তাফিজ থাকলে, বাংলাদেশের সমর্থকরা মুক্তভাবে ঘোরাফেরা করলে এবং বাংলাদেশে নির্বাচন এগিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে। বিবিসি বাংলা ওই রিপোর্টের হুবহু বাংলা অনুবাদও প্রকাশ করেছিল। এই পরিস্থিতিতে আমরা ভারতে খেলতে যাব কেন?’


অন্য কোনো ভেন্যুতে খেলার চেষ্টার কথা উল্লেখ করে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো ভেন্যুতে বিশ্বকাপ খেলার জন্য বহু চেষ্টা করেছি। কোনো কোনো দেশ থেকে সমর্থনও পেয়েছিলাম। কিন্তু হয়তো আইসিসির নেতৃত্বে ভারতীয়দের আধিপত্যে থাকার কারণে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদেরকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।’


সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনের যুক্তি তুলে ধরে তিনি লেখেন, ‘আমার সিদ্ধান্তের পেছনে তিনটি বিষয় ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার, দেশের মর্যাদা, আমাদের ক্রিকেটার-সাংবাদিক-সমর্থকদের নিরাপত্তা এবং আগামী নির্বাচনের আগে দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা। সে সময় বলা হয়েছিল, বিশ্বকাপ না খেললে বিদেশি দলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের খেলা বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের নানা উদ্যোগে সেই আশঙ্কাও শেষ পর্যন্ত দূর হয়েছিল।’


নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তকে সঠিক দাবি করে আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। একটি ছোট দেশ বলে কেউ আমাদের ইচ্ছেমতো অপমান করবে, আর আমরা সবসময় তা মুখ বুঝে মেনে নেব এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। আমি সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সাথে বন্ধুত্বে বিশ্বাসী, মাথা নত করে সব মেনে নেয়াতে না।’