রাজশাহী: ২০ ওভারে ১৭৪/৪। চট্টগ্রাম: ১৭.৫ ওভারে ১১১। ফল: রাজশাহী ৬৩ রানে জয়ী।
ম্যাচ শুরুর তখনো ঘণ্টা দেড়েক বাকি। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের আকাশে চক্কর দিচ্ছে হেলিকপ্টার। ধীরে ধীরে তা নেমে এল মাঠে। গ্যালারিতে বসে থাকা দর্শকদের কৌতূহলী চোখে বিস্ময়, কেউ কেউ মুহূর্তটা বন্দী করে রাখলেন মুঠোফোন ক্যামেরায়।
লাল মখমল কাপড়ে মোড়ানো বিপিএলের ট্রফি নিয়ে হেলিকপ্টার থেকে নেমে আসেন আকবর আলী ও সালমা খাতুন। বাংলাদেশের হয়ে মহাদেশীয় আর বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে অধিনায়ক হিসেবে সাফল্য আছে এই দুজনেরই। এবারের বিপিএলের ট্রফি আজ প্রথমবারের মতো সামনে এল তাঁদের হাত ধরে, ফাইনালে চট্টগ্রাম রয়্যালসকে ৬৩ রানে হারিয়ে যেটি নিয়ে রাতটাকে শিরোপা জয়ের উৎসবে রাঙিয়েছে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। এর আগে ২০২০ সালে রাজশাহী রয়্যালস বিপিএলের শিরোপা জিতেছিল। ভিন্ন নামের ফ্র্যাঞ্চাইজিতে এবার দ্বিতীয় শিরোপা পেল তারা।
আজ বিপিএল ফাইনালের দিন সকাল থেকেই মিরপুরে উৎসবের আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল। রাজশাহী আর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথোপকথন শোনা যাচ্ছিল কোথাও দাঁড়ালেই। শত মাইল পাড়ি দিয়ে ঢাকায় ফাইনাল দেখতে এসেছিলেন অনেকে। দুপুর পার হতে না হতেই দর্শকে ভরে যায় শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের গ্যালারি।
ম্যাচের ১৩ বল বাকি থাকতেই ম্যাড়ম্যাড়ে ফাইনালটা রাজশাহী বড় ব্যবধানে জিতে নিলেও ম্যাচে একেবারে প্রাণ ছিল না, তা নয়। রাজশাহীর তানজিদ হাসান সেঞ্চুরি করে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে ভেসেছেন। ২ উইকেট নিয়ে চট্টগ্রামের পেসার শরীফুল ইসলাম গড়েছেন বিপিএলের এক আসরে সর্বোচ্চ ২৬টি উইকেট নেওয়ার রেকর্ড।
তানজিদের সেঞ্চুরির সৌজন্যে আগে ব্যাট করে ১৭৪ রানের সংগ্রহ পেয়েছিল রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। তাড়া করতে নেমে চট্টগ্রাম অলআউট হয়ে গেছে ১১১ রানে। চট্টগ্রাম দলের মালিকানা বিসিবিকে নিতে হয়েছে টুর্নামেন্ট শুরুর আগের দিন। বদলে গিয়েছিল দলের কোচিং স্টাফ, প্রথম ম্যাচের একাদশে নামতে পেরেছিল মাত্র দুই বিদেশি নিয়ে। কঠিন সেই পথ পাড়ি দিয়েও তারা চলে আসে ফাইনালে। কিন্তু ফাইনালে বিবর্ণ ক্রিকেটই খেলেছে চট্টগ্রাম।
টস জিতে ফিল্ডিংয়ে নেমেই তারা পিছিয়ে গিয়েছিল অনেকটা। ক্যাচ ফসকেছে তানজিদ হাসানের। পরে তিনিই বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে বিপিএলে সর্বোচ্চ তিন সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েন। সরাসরি চুক্তিতে দলে ভেড়ানো তানজিদ আগের ১২ ম্যাচে ২৫৬ রান করেছিলেন, ফিফটি ছিল মাত্র একটি। সেই তিনিই ফাইনালে চট্টগ্রামের বিপক্ষে ৬২ বলে ৬ চার ও ৭ ছক্কায় আউট হয়েছেন ১০০ রান করে। ক্রিস গেইল আর তামিম ইকবালের পর বিপিএল ফাইনালে সেঞ্চুরি করা মাত্র তৃতীয় ব্যাটসম্যান তানজিদ।
চট্টগ্রামের ফাইনাল পর্যন্ত আসার পথে বড় শক্তি ছিলেন বোলাররা। শুরুতে তাঁরা দাপট দেখালেও উইকেট ধরে রাখে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। ১০.২ ওভারে যখন তাঁদের ওপেনিং জুটি ভাঙে, ততক্ষণে স্কোরকার্ডে রান ৮৩। ওই ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই বাকি কাজটা করেন রাজশাহীর ব্যাটসম্যানরা। টুর্নামেন্টজুড়ে ব্যাটে-বলে দুর্দান্ত পারফর্ম করা চট্টগ্রামের অধিনায়ক মেহেদী হাসান কোনো উইকেট ছাড়াই ৪ ওভারে দেন ৪৮ রান।
বড় রান তাড়ার জন্য চট্টগ্রামের দরকার ছিল ভালো শুরু। ইংল্যান্ডের উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান অ্যাডাম রসিংটন চোটে পড়ে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার পর থেকেই সেটি পাচ্ছিল না তারা। আজও একই সমস্যা ভুগিয়েছে চট্টগ্রামকে। বিনুরা ফার্নান্দোর তৃতীয় ওভারেই তিন বলের ব্যবধানে তারা হারিয়ে ফেলে ওপেনার মোহাম্মদ নাঈম আর তিনে নামা মাহমুদুল হাসানের উইকেট।
দলের রান যখন ৩৯, তখন তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে হাসান নাওয়াজও ফিরে যান। তাঁর বিদায়ের পরও চট্টগ্রাম রাজশাহীর ৪ উইকেটে করা ১৭৪ রান তাড়া করে ফেললে সেটা হতো বিস্ময়কর। ৪ ওভারে মাত্র ১৫ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিয়ে তা করতে দেননি হাসান মুরাদ। চট্টগ্রামের ব্যাটসম্যানদের কেউ লড়াইয়ের আভাসও দিতে পারেননি সেভাবে। ওপেনিংয়ে নামা মির্জা তাহির বেগ রান করেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর ৩৬ বলে ৩৯ রানের ধীরগতির ইনিংস ম্যাচের গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি।
বিপিএলের শুরু থেকেই গোছানো দল ছিল রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। স্থানীয় ক্রিকেটারদের শক্তি কাজে লাগানোর পাশাপাশি প্রয়োজনমতো বিদেশি ক্রিকেটার নিয়ে আসে তারা। এলোমেলো টুর্নামেন্টেও রাজশাহীর সবকিছু ছিল গোছানো। বিপিএল শুরুর আগের বিতর্ক, মাঝে খেলোয়াড়দের ম্যাচ বয়কটের ঘটনা আর আলোচনা-সমালোচনার বিপিএলে শেষ হাসিটা যোগ্য দল হিসেবেই হাসল রাজশাহী ওয়ারিয়র্স।
রাজশাহী ওয়ারিয়রস: ২০ ওভারে ১৭৪/৪ (তানজিদ ১০০, ফারহান ৩০, উইলিয়ামসন ২৪; মুকিদুল ২/২০, শরীফুল ২/৩৩)। চট্টগ্রাম রয়্যালস: ১৭.৫ ওভারে ১১১ (মির্জা ৩৯, আসিফ ২১, নেওয়াজ ১১; বিনুরা ৪/৯, মুরাদ ৩/১৫, নিশাম ২/২৪)। ফল: রাজশাহী ওয়ারিয়রস ৬৩ রানে জয়ী। ম্যান অব দ্য ফাইনাল: তানজিদ হাসান। ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট: শরীফুল ইসলাম।