জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দল
জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দল

‘আন্ডারডগের গল্প’ বলছে জিম্বাবুয়ে

জিম্বাবুয়ে কখনো টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতেনি, এমনকি কোনো আইসিসি টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালেও খেলেনি। খেলেছে শ্রীলঙ্কা, খেলেছে অস্ট্রেলিয়া, এমনকি ট্রফিও জিতেছে।

এবারের বিশ্বকাপের আগের দুই মাসে জিম্বাবুয়ে কোনো আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি খেলেনি। বৈশ্বিক আসরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া গিয়ে খেলেছে পাকিস্তানে, শ্রীলঙ্কা ঘরের মাঠে খেলেছে পাকিস্তান ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।

কিন্তু দশম আইসিসি টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ‘বি’ গ্রুপের খেলায় অতীত-সাফল্য না থাকা, সাম্প্রতিক সময়ে খেলার মধ্যে না থাকা জিম্বাবুয়েই হারিয়ে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া আর শ্রীলঙ্কার মতো দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে।

১৩ ফেব্রুয়ারি অস্ট্রেলিয়াকে ২৩ রানে হারানোর পর কাল কলম্বোয় স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জিম্বাবুয়ের জয় ৬ উইকেটে। ম্যাচ শেষে যে জয়ের প্রতিক্রিয়ায় অধিনায়ক সিকান্দার রাজার কণ্ঠে ছিল লক্ষ্য পূরণের আনন্দ, ‘আমার মনে হয় না কেউ আমাদের এ পর্যন্ত আসার সুযোগ করে দিয়েছে। মানুষের মন জয় করা এবং তাদের সম্মান অর্জন করতে পারা সত্যিই দারুণ ব্যাপার।’

রাজার নেতৃত্বাধীন জিম্বাবুয়ে এবারের টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচে হারেনি

জিম্বাবুয়ের জন্য ‘মন জয় করা’ বা ‘সম্মান অর্জন করাটা’ যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ, সে কথা এবারের বিশ্বকাপে একাধিকবারই বলেছেন রাজা। কেন বলেছেন, সেটা আফ্রিকান দেশটির গত কয়েক বছরের পরিস্থিতির দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। আইসিসির পূর্ণ সদস্যদেশগুলোর মধ্যে গত আট বছরে সবচেয়ে অনিশ্চয়তা ও হতাশার সময় কাটিয়েছে জিম্বাবুয়ে। ২০১৯ সালের পর ২০২৩ বিশ্বকাপে জায়গা করতে পারেনি, যে কারণে সুযোগ ছিল না ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলারও।

২০১৯ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব উতরাতে না পারার পর রীতিমতো দিশাহারা ছিল জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট। প্রয়াত কোচ হিথ স্ট্রিকসহ তাঁর পুরো কোচিং স্টাফকে বরখাস্ত করা হয়, গ্রায়েম ক্রেমার বিদেশে চাকরি করা স্ত্রীর সঙ্গে দুবাইয়ে থিতু হন, এ দিকে সরকারি হস্তক্ষেপে বোর্ডের সদস্যপদ স্থগিত করে আইসিসি।

২০২৩ বিশ্বকাপের আগে ঘুরে দাঁড়াতে চাইলেও পুনর্গঠনের পথ ছিল ধীরগতির, যেখানে বড় ভূমিকা ছিল দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশারও।

তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল ২০২৪ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না পারা। বাছাইপর্ব উতরাতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০ দলের বিশ্বকাপে আইসিসির একমাত্র পূর্ণ সদস্য দেশ হিসেবে জিম্বাবুয়েকে দর্শক হয়ে থাকতে হয়েছে। সেবার আফ্রিকান বাছাইয়ে নামিবিয়া ও উগান্ডার কাছে হারায় প্রশ্ন ওঠে, নব্বই ও পরের দশকে ক্রিকেট–বিশ্বে সমীহ জাগানো জিম্বাবুয়ে কি মহাদেশীয় ক্রিকেটেই বিলীন হতে চলেছে?

জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট মাঝে কঠিন সময় কাটিয়েছে

তবে চল্লিশের আশপাশে থাকা রাজা, ব্রেন্ডন টেলর, ত্রিশের আশপাশে থাকা রায়ান বার্ল, ব্লেসিং মুজারাবানি আর ব্রায়ান বেনেট, তাদিওয়ানাশে মারুমানিদের হার না মানা মানসিকতা আর ক্রিকেট প্রশাসকদের সুদূরপ্রসারী কিছু সিদ্ধান্ত জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে যেতে দেয়নি।

২০২৫ সালে আফ্রিকান বাছাইয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েই এবারের টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় জিম্বাবুয়ে। বিশ্বকাপের আগে দলে যোগ দেন গ্রায়েম ক্রেমারের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারও।

টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে ‘প্রত্যাশা মিটিয়ে’ ওমানকে ৮ উইকেটে উড়িয়ে দিলেও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে আশপাশে তেমন কোনো আলোচনা ছিল না। তবে কলম্বোয় তারা অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পরই রীতিমতো ঝাঁকুনি লাগে বিশ্বকাপে।

সেই জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে রাজা বলেছিলেন, ‘আইসিসির ইভেন্ট মানুষকে সব দিক থেকে বদলে দেয়, তা সে স্বীকৃতি হোক, খ্যাতি হোক, আর্থিক দিক হোক, সম্মান হোক, যেভাবেই দেখুন না কেন।’ সুপার এইট হাতছানি দেওয়া ওই সময়ে রাজা ‘আমাদের ইতিহাসে যত দূর কখনো যাইনি, তার চেয়েও আরও এগিয়ে যেতে পারব’ বলে আশাবাদও শোনান।

‘বি’ গ্রুপে সর্বোচ্চ পয়েন্ট নিয়ে সুপার এইটে উঠেছে জিম্বাবুয়ে

জিম্বাবুয়ের সেই আশা পূরণ হয় ১৭ ফেব্রুয়ারির আয়ারল্যান্ড–ম্যাচেই। ম্যাচ বলতে যা বলতে যা বোঝায়, ব্যাট–বলের সেই লড়াই অবশ্য হয়নি। বৃষ্টির কারণে একটি বলও খেলা না হয়ে ম্যাচ হয় পরিত্যক্ত, ভাগাভাগি হয় পয়েন্ট। আর এই পয়েন্ট ভাগাভাগিতেই এক ম্যাচ আগেই নিশ্চিত হয়ে যায় জিম্বাবুয়ের সুপার এইট।

তবে দলটা যে অস্ট্রেলিয়াকে ভড়কে দিয়ে আর বৃষ্টির বদান্যতায় বিশ্বকাপ খেলছে না, সেটিই তুলে ধরার মঞ্চ ছিল কালকের শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচ। কলম্বোর এই ম্যাচেই স্বাগতিকদের ৭ উইকেটে করা ১৭৮ রান রাজার দল মাত্র ৪ উইকেট হারিয়ে টপকে গেছে ৩ বল হাতে রেখেই।

অপরাজিত থেকে সুপার এইটে ভারত, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে খেলতে যাওয়া জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক এবার দিয়েছেন আরও বড় কিছুর আশায়, ‘আমরা যদি ওই তিন ম্যাচের মধ্যে দুটিতে জিততে পারি, তাহলে কে জানে কী হতে পারে। যেমন আমি বলে আসছি—সবাই আন্ডারডগের গল্প ভালোবাসে।’