৪০ বছরে ১৪ জন।
বাংলাদেশ প্রথম ওয়ানডে খেলে ১৯৮৬ সালে। অর্থাৎ, এই ৪০ বছরে ১৪ জন ক্রিকেটার বাংলাদেশের হয়ে ১০০ ওয়ানডে খেলেছেন। লিটন দাস তাতে সর্বশেষ সংযোজন। মিরপুরে গতকাল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচটি ছিল লিটনের ক্যারিয়ারে শততম ওয়ানডে।
১০০ ম্যাচে ৯৯ ইনিংসে ৩০.০৭ গড় ও ৮৫.৬৯ স্ট্রাইক রেটে ৫টি সেঞ্চুরি, ১২ ফিফটিসহ ২৭০৭ রান—এই হলো লিটনের ওয়ানডে ক্যারিয়ার। সংখ্যাগুলোয় তাকিয়ে আনন্দের চেয়ে আফসোসই হয় বেশি। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে লিটনের অভিষেক। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, উইকেটকিপার–ব্যাটসম্যান হিসেবে শুধু মুশফিকুর রহিমের দীর্ঘমেয়াদি বিকল্পই নয়, বাংলাদেশের ব্যাটিংকেও অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেবেন লিটন।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক, ঘটে আরেক। চোখজুড়ানো ব্যাটিংয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লিটন ধারাবাহিক হতে না পারায় তাঁর নামের সঙ্গে ‘মোনালিসা ব্যাটিং’—কথাটা এখন অনেকেই ব্যাঙ্গাত্মক অর্থে ব্যবহার করেন। যদিও বাংলাদেশের বেশ কিছু জয়েও দারুণ অবদান আছে লিটনের। কিন্তু লিটনকে নিয়ে প্রত্যাশার পারদ যতটা উঁচুতে, সে অনুযায়ী পারফরম্যান্স না হওয়ায় আসলে সমর্থকদের হতাশাই ছড়ায় বেশি। লিটন এসব অম্ল–মধুর অভিজ্ঞতা নিয়ে শততম ওয়ানডে খেলে ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে?
বাংলাদেশের হয়ে ১০০ ওয়ানডে খেলা ১৪ ক্রিকেটারের মধ্যে অন্তত ৬ জনকে বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যানের কাতারে রাখা যায়—তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান, মাহমুদউল্লাহ, মোহাম্মদ আশরাফুল ও হাবিবুল বাশার। সাকিব অলরাউন্ডার হলেও এবং নিচে ব্যাট করলেও ওয়ানডেতে তাঁর রান ৭ হাজারের বেশি এবং এই সংস্করণে তৃতীয় সর্বোচ্চ রানও করেছেন বাংলাদেশের হয়ে। তাই শুধু বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যানদের কাতারেও তাঁর নামটা থাকে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বর্তমান ওয়ানডে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজও ন্যূনতম ১০০ ওয়ানডে খেললেও বেশির ভাগ সময় নিচের দিকে ব্যাট করেছেন। সাকিব, তামিম, মুশফিক কিংবা হাবিবুলের মতো ক্যারিয়ারে বেশির ভাগ সময় ওপরে (১ থেকে ৫) ব্যাট করেননি। আরও একটি বিষয়, লিটন তাঁর ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ১ থেকে ৫ নম্বর পজিশনে ব্যাট করেছেন—এই পাঁচ পজিশনে ব্যাট করে ন্যূনতম ১০০ ওয়ানডে খেলার অভিজ্ঞতা লিটনের আগে আছে শুধু মুশফিক, তামিম, সাকিব ও আশরাফুলের।
ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তামিমের এই সংস্করণে শততম ওয়ানডে শেষে রানসংখ্যা ছিল ২৯০৩, ব্যাটিং গড় ২৯.০৩ এবং সেঞ্চুরি ৩টি। শততম ওয়ানডে শেষে সাকিবের রানসংখ্যা ছিল ২৭৫০, গড় ৩৪.৮১ এবং সেঞ্চুরি ৫টি। শততম ওয়ানডে শেষে মুশফিকের রানসংখ্যা ছিল ১৯৬৫, ব্যাটিং গড় ২৬.২ এবং সেঞ্চুরি ১টি।
মাহমুদউল্লাহর শততম ওয়ানডে শেষে রানসংখ্যা ছিল ১৯০৬, ব্যাটিং গড় ৩১.৭৬ এবং সেঞ্চুরি ছিল না। বাংলাদেশের বর্তমান ব্যাটিং কোচ আশরাফুলের শততম ওয়ানডে শেষে রানসংখ্যা ছিল ১৮৫৩, ব্যাটিং গড় ২২.০৫ এবং সেঞ্চুরি ১টি। জাতীয় দলের বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারের শততম ওয়ানডে শেষে রানসংখ্যা ছিল ২০২০, ব্যাটিং গড় ২২.৪৪, সেঞ্চুরি নেই।
অর্থাৎ, শততম ওয়ানডে শেষে লিটন যেখানে দাঁড়িয়ে, বাংলাদেশি মানদণ্ডে সেই জায়গা আসলে অতটা খারাপও নয়। শততম ওয়ানডে শেষে রান ও ব্যাটিং গড় বিবেচনায় শুধু সাকিবই লিটনের চেয়ে এগিয়ে। ওই পথ পর্যন্ত সেঞ্চুরিসংখ্যায় দুজনে আবার সমান।
লিটন ১০০ ওয়ানডের মধ্যে উইকেটকিপার হিসেবে ২০ ম্যাচ খেলেছেন, বাকি ৮০ ম্যাচ খেলেছেন শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে। মজার বিষয়, উইকেটকিপার হিসেবে খেলে বাড়তি চাপ নিয়ে লিটনের ব্যাটিং গড় তাঁর ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলার ব্যাটিং গড় থেকে ভালো। উইকেটকিপার হিসেবে ২০ ইনিংসে ৩৭.৩৮ গড়ে ৬৭৩ রান করেছেন লিটন; সেঞ্চুরি ৩টি, স্ট্রাইক রেট ৮৯.৪৯। ব্যাটসম্যান হিসেবে ৮০ ম্যাচের মধ্যে ৭৯ ইনিংসে ২৮.২৫ গড়ে ২০৩৪ রান করেছেন লিটন, স্ট্রাইক রেট ৮৪.৫।
চাইলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে লিটনের এ পর্যন্ত পারফরম্যান্স যাচাই করে দেখা যায়। ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রান ও সেঞ্চুরি করা শচীন টেন্ডুলকারের ১০০ ম্যাচ শেষে রান ছিল ৩১৪৬, গড় ৩৬.৫৮ এবং সেঞ্চুরি ৪টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান করা বিরাট কোহলির ১০০ ম্যাচ শেষে রান ছিল ৪১০৭, গড় ৪৮.৮৯ এবং সেঞ্চুরি ১৩টি। এই সংস্করণে তৃতীয় সর্বোচ্চ রান করা কুমার সাঙ্গাকারার শততম ম্যাচ শেষে রান ছিল ২৩৮৩, গড় ২৯.৭৮, সেঞ্চুরি ৩টি।
চতুর্থ সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক রিকি পন্টিংয়ের শততম ম্যাচ শেষে রানসংখ্যা ছিল ৩৫৩৪, গড় ৪০.১৫ এবং সেঞ্চুরি ৬টি। পাঁচে থাকা সনাৎ জয়াসুরিয়ার শততম ম্যাচ শেষে রান ছিল ১৭৮২, গড় ১৯.৫৮ এবং সেঞ্চুরি ১টি।
অর্থাৎ, বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের মানদণ্ডে লিটন শততম ওয়ানডে শেষে প্রত্যাশিত জায়গাতেই দাঁড়িয়ে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বেশ পিছিয়ে। সে কারণেই লিটনকে নিয়ে আক্ষেপটাও বেশি। কারণ, তাঁর সামর্থ্য আন্তর্জাতিক মানের, কিন্তু পারফরম্যান্স বাংলাদেশি মানের।