ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে কিউইদের বাজি হতে পারে অফ স্পিন।
ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে কিউইদের বাজি হতে পারে অফ স্পিন।

ভারতের বিপক্ষে কি তাহলে দেখা যাবে অফ স্পিনের ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’

প্রশ্নটা সম্ভবত সবার মনেই।
২০২৬ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতের বিধ্বংসী ব্যাটিং লাইনআপকে কীভাবে থামাবে নিউজিল্যান্ড? সর্বশেষ তিন ম্যাচের দুটিতে তারা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ চারটি দলীয় স্কোরের দুটি নিজেদের নামে করে নিয়েছে। যে দানবীয় ব্যাটিং লাইনআপ এখন ২৪০–২৫০–এর নিচে থামতেই চায় না, তাদের রোখার সাধ্য কার?

উত্তরটা হয়তো তেমন কঠিন কিছু না।
আপাত–অজেয় সব শক্তিরই কোনো না কোনো দুর্বল জায়গা থাকে। মাঝেমধ্যে অতি সাধারণ কিছুই সেই শক্তির জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। টুর্নামেন্টে ভারতের ম্যাচগুলো সুক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে নিউজিল্যান্ড দলের ডেটা অ্যানালিস্টদের জন্য ভারতের সেই দুর্বল জায়গাটা খুঁজে বের করা মোটেই কঠিন হওয়ার কথা না।

ফাইনালে কিউইদের বাজি হতে পারে ক্রিকেটের এক পুরোনো শিল্প—অফ স্পিন। আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে কোল ম্যাককনকি কিংবা গ্লেন ফিলিপসদের সাধারণ ওই আঙুলের কারসাজিই হয়তো ঠিক করে দেবে উৎসবের রং নীল হবে না কালো।

যুক্তিটা আসলে খুব সরল। সঞ্জু স্যামসন দলে ঢোকার পরও ভারতের ব্যাটিং অর্ডারের প্রথম আটজনের মধ্যে পাঁচজনই বাঁহাতি। আর ক্রিকেটের আদি ব্যাকরণ বলে, বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের জন্য অফ স্পিনাররা চিরকালই এক দুশ্চিন্তার নাম। ডেটা অ্যানালিস্টরা এ তথ্য স্রেফ মাইক্রোওয়েভে গরম করে কিউই অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনারের প্লেটে সাজিয়ে দিলেই হয়! রবীচন্দ্রন অশ্বিন-পরবর্তী যুগে ক্রিকেটে ‘স্পেশালিস্ট’ অফ স্পিনার বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি হয়ে গেলেও কাজটা তো আসলে ঘরের দরজার নব ঘোরানোর মতোই সহজ! যে কেউ হাত ঘুরাতে পারে।

আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে কোল ম্যাককনকির আঙুলের কারসাজিই হয়তো ঠিক করে দেবে উৎসবের রং নীল হবে না কালো।

ক্রিকইনফোর পরিসংখ্যান বলছে, এই বিশ্বকাপে স্পিনারদের করা দুই ওভারের স্পেলগুলোর মধ্যে প্রায় ৪৬.৪৩ শতাংশই ছিল অফ স্পিন। আর এক ওভারের স্পেলের ক্ষেত্রে এই হার বেড়ে হয় ৬৩.৮৯ শতাংশ!

ভারতের বিপক্ষে সফল হতে তাই শুরু থেকেই অফ স্পিনের তাস খেলেছে দলগুলো। সালমান আগা, গেরহার্ড ইরাসমাস থেকে শুরু করে সাইম আইয়ুব, সিকান্দার রাজা কিংবা এইডেন মার্করাম—সবাই হাত ঘুরিয়েছেন। এবং সত্যিটা হলো, এই ‘পার্টটাইমার’দের বিপক্ষেই ভারতের বিপদে পড়েছে বেশি। এবারের টুর্নামেন্টে অফ স্পিনের বিপক্ষে ভারত উইকেট হারিয়েছে ১৫টি, সুপার এইটে খেলা দলগুলোর মধ্যে যা সর্বোচ্চ।  অফ স্পিনের বিপক্ষে তাদের গড় রান ১৫.৮৭,  স্ট্রাইক রেটও (১২০.২০) সুপার এইটে ওঠা দলগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন!

এই বিশ্বকাপে অফ স্পিনে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন ভারতের ওপেনার ও টি-টুয়েন্টির এক নম্বর ব্যাটসম্যান অভিষেক শর্মা।

সবচেয়ে বেশি ভুগছেন ভারতের ওপেনার ও টি-টুয়েন্টির এক নম্বর ব্যাটসম্যান অভিষেক শর্মা। টুর্নামেন্টের শুরুতে পরপর তিন ম্যাচে শূন্য রানে ফিরেছেন, যার মধ্যে দুবারই প্রথম ওভারে আউট হয়েছেন অফ স্পিনারের বলে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড যখন উইল জ্যাকসকে দিয়ে বোলিং শুরু করাল, মনে হচ্ছিল তারা স্রেফ পুরোনো চিত্রনাট্য দেখে অভিনয় করছে। অভিষেকও সেই ফাঁদে পা দিয়ে উইকেট বিলিয়ে এলেন। অফ স্পিনের বিপক্ষে তাঁর গড় মাত্র ৯.৬৭!

টুর্নামেন্টে সূর্যকুমারের স্ট্রাইক রেট ১৩৭.৫০, অফ স্পিনের বিপক্ষে যা মাত্র ১১৪.৭১!

ঈশান কিষান ভারতের হয়ে এই টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি রান (২৬৩) করলেও অফ স্পিনারদের ৪8 বল খেলে আউট হয়েছেন ৫ বার। এমনকি সূর্যকুমার যাদবের মতো বিধ্বংসী ব্যাটসম্যানও আটকে যাচ্ছেন অফ স্পিনের ওই মন্থর জালে। টুর্নামেন্টে তাঁর স্ট্রাইক রেট ১৩৭.৫০, অফ স্পিনের বিপক্ষে যা মাত্র ১১৪.৭১!

তবে এই পরিসংখ্যানই শেষ কথা নয়। ২০২৩ সাল থেকে টি-টুয়েন্টিতে অভিষেক বা তিলকের রেকর্ড অফ স্পিনের বিপক্ষে যথেষ্ট ভালো। তবে বর্তমান ফর্মটাই ভারতের জন্য দুশ্চিন্তার। আর ঠিক এ কারণেই ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে যেতে পারেন কোল ম্যাককনকি।

ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে যেতে পারেন কোল ম্যাককনকি।

৩৪ বছর বয়সী এই কিউই অলরাউন্ডারকে যখন মাইকেল ব্রেসওয়েলের বদলি হিসেবে ডাকা হলো, তখন তিনি নিউজিল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটে ৫০ ওভারের ম্যাচ খেলছিলেন। সেই ম্যাককনকি সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বিশাল চাপের ম্যাচে তাঁর অফ স্পিনে কুইন্টন ডি কক আর রায়ান রিকেলটনকে ফিরিয়ে প্রমাণ করেছেন, যেকোনো সময় তিনি ঘাতক হয়ে উঠতে পারেন।
নিউজিল্যান্ডের এই দলে ম্যাট হেনরি ও লকি ফার্গুসনদের মতো ফাস্ট বোলার আছেন। কিন্তু ভারতের বিধ্বংসী লাইন আপকে আটকাতে শেষ পর্যন্ত হয়তো অফ স্পিনের ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’–এরই শরণাপন্ন হতে হবে কিউইদের।