নাহিদ রানার কথায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিকতার টান আছে এখনও, আছে তাঁর সারল্যও। বেশিরভাগ প্রশ্নেরই উত্তর শেষ করে দেন অল্পতে। তবে যাঁর বলের গতিতে রীতিমতো কাঁপন ধরছে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের, তাঁর কথায় একদমই ঝাঁজ না থেকে কী পারে!
ব্যাটিংয়ে তিনি নামেন সবার শেষে। প্রতিপক্ষ বোলাররা তাঁকে কাবু করতে বাউন্সার মারেন প্রায়ই। কিন্তু নাহিদও তো বল হাতে তো চাইলেই বিধ্বস্ত করতে পারেন যে কাউকেই। সেই সতর্কবাণীটাই যেমন আজ দিয়ে রাখলেন তিনি, ‘এতটুক বলতে পারি আমাকে কেউ বাউন্সার মারলে আমি তাঁকে ছেড়ে কথা বলব না।‘
নাহিদ যে ছেড়ে কথা বলেন না, তা সবচেয়ে ভালো টের পাচ্ছেন পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরাই। মিরপুর টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে তাদের ধসিয়ে দিয়ে তাঁর ৫ উইকেট পাওয়ার স্মৃতি এখনও তরতাজা। আজও পাকিস্তানের সবচেয়ে দামি উইকেটটি তিনিই নিলেন।
বাকিদের ব্যর্থতার ভিড়ে পাকিস্তানকে প্রায় একা হাতে টানছিলেন বাবর আজম। তাঁর সঙ্গে নাহিদের লড়াইটা আকাঙ্ক্ষিত ছিল এই সিরিজ শুরুর আগে থেকেই। মিরপুর টেস্ট শুরুর দিন তিনেক আগেও পিএসএল ফাইনালে পেশোয়ার জালমিতে সতীর্থ ছিলেন তারা। দুজনের ‘শত্রু’ হওয়ার অপেক্ষা বাড়ে বাবর চোটে পড়ে প্রথম ম্যাচটা না খেলায়।
আজ তারা দুজন যখন মুখোমুখি হলেন, ওই উত্তেজনা আরও বেড়ে গিয়েছিল ম্যাচের পরিস্থিতির কারণে। পাকিস্তানের একের পর এক ব্যাটসম্যান যখন আউট হয়ে যাচ্ছেন, বাবর রান করে যাচ্ছিলেন স্বচ্ছন্দে। নাহিদ রানাকে তাই ত্রাতা হতো দলের জন্য, গত কিছুদিন তিনি যা হচ্ছেন বারবারই। কালও ব্যতিক্রম হলো না।
আগের বলটা ঘণ্টায় ১৪৭ কিলোমিটার গতিতে করে আউট হওয়ার বলটা ছাড়েন ১৩৭ কিলোমিটারে। গতির এই হেরফেরে বিভ্রান্ত বাবর বলটা তুলে দেন মিড অনে দাঁড়িয়ে থাকা মুশফিকুর রহিমের হাতে। প্রথম ইনিংসে পাকিস্তানের লিড নেওয়াটা দূরের স্বপ্ন হয়ে যায় তখনই।
টেস্টে বাবর আজমের মুখোমুখি নাহিদ হয়েছেন তিন ম্যাচে। ৩৯ বল করে তাঁকে আউটও করেছেন তিনবার। দিনশেষে নাহিদের অবশ্য দাবি বাবরের উইকেটটা তাঁর কাছে বিশেষ কিছু নয়, ‘প্রতিটা ব্যাটসম্যানকে আউট করতেই মজা লাগে। কারণ, সব উইকেটই দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আপনি একজন ব্যাটসম্যানকে (আগে) বলে আউট করতে পারবেন না।’
গতিতারকাদের আলাদা একটা আবেদন থাকে। নাহিদ রানাই সেই আবেদন আরও বেড়েছে মিরপুর টেস্টের শেষ দিনে দুর্দান্ত বোলিং করায়। বেড়েছে তারকাখ্যাতিও। তবে এসব যেন নাহিদকে স্পর্শই করে না।
প্রত্যাশার চাপ সরিয়ে তিনি উড়তে চান নিজের মতো করে, ‘আশেপাশে কী কথা, সেগুলো দেখছি না। নিজের প্রতি প্রত্যাশাও সেরকম নেই, কারণ তাতে ভালো কিছু আসে না। আমি শুধু নিজের স্কিলটা মাঠে গিয়ে দেখানোর চেষ্টা করি। দল বা অধিনায়ক আমার কাছে কী চাচ্ছে, এটার দিকেই সবসময় মনোযোগ থাকে।’ প্রত্যাশা রাখলে চাপ আরও বাড়ে বলে বিশ্বাস নাহিদের। তাঁর ভাবনাটাও তাই সহজ, ‘উপভোগ করছি এবং চেষ্টা করছি যেন দেশের জন্য ভালো কিছু করতে পারি।’
শুধু বোলিং নয়, নাহিদ আলোচনায় আছেন ফিটনেসের কারণেও। সিলেট টেস্ট শুরুর আগের দিনই মুশফিকুর রহিম এসে মুগ্ধতার কথা জানিয়ে গেছেন মাঠের বাইরের নাহিদকে নিয়ে। তিনি অবশ্য মনে করেন কাজটা করা তাঁর একরকম দায়িত্বই, ‘যেহেতু আমি ক্রিকেট বেছে নিয়েছি, তাই খেলার জন্য বাইরে যত কিছু করা লাগে…নিজেকে কখনো ফাঁকি দেই না। চেষ্টা করি ফিটনেসটা হাই লেভেলে রাখতে।’
সিলেটেও নাহিদের কাজ বাকি আছে এখনও। দ্বিতীয় ইনিংসের ৭ উইকেট হাতে রেখে বাংলাদেশ ১৫৬ রানে এগিয়ে আছে। হুট করে ধস না নামলে বড় একটা লক্ষ্যই পাকিস্তানের সামনে দেওয়ার কথা বাংলাদেশের। চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশ তাকিয়ে থাকবে নাহিদের দিকেও। আপাতত তিনি চান, আজ সারাদিন যেন বাংলাদেশ ব্যাটিং করে।
এরপর? প্রত্যাশার চাপ সরিয়ে কীভাবে প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিতে হয়, তা তো তিনি ভালোই জানেন!